বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার সান্তাহারে পরিবেশগত ছাড়পত্র নবায়ন না করা, শর্ত ভঙ্গ এবং তরল বর্জ্য পরিশোধনাগার (ইটিপি) ছাড়াই অটোমেটিক চালকল পরিচালনার অভিযোগে ১৩টি চালকলকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। দৈনিক সময়ের আলোসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর সরেজমিনে তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠানকে সাত দিনের মধ্যে জবাব দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শোকজ পাওয়া চালকলগুলোর মধ্যে রয়েছে বুশরা, সালমান, বৈশাখী, সুন্দরী, মৌ, ইছামতী ও রহমানসহ ১৩টি অটোমেটিক চালকল। পরিবেশ অধিদপ্তরের বগুড়া কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মাহথীর বিন মোহাম্মদ এ নোটিশ দেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সন্তোষজনক জবাব দিতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে প্রচলিত পরিবেশ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
এর আগে গত ৩০ সেপ্টেম্বর ও ১ অক্টোবর ‘আদমদীঘিতে বর্জ্য পরিশোধনাগার (ইটিপি) ছাড়াই চলছে চালকল, দূষিত হচ্ছে খাল-ফসলি জমি’ শিরোনামে দৈনিক সময়ের আলোসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ৪ অক্টোবর সরেজমিনে পরিদর্শন করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তদন্ত শেষে ৭ অক্টোবর উপজেলার ১৩টি চালকলকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সান্তাহার এলাকার কয়েকটি অটোরাইস মিলের সিদ্ধ ও ধোয়া শাখা থেকে নির্গত দুর্গন্ধযুক্ত তরল বর্জ্য সরাসরি খাল, জলাশয় ও ফসলি জমিতে ফেলা হচ্ছে। এতে কৃষিজমি, পানির উৎস ও জলজ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ইটিপি স্থাপনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে এর কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যায়নি বলে অভিযোগ তাঁদের।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বুশরা অটো রাইস মিলের বর্জ্যপানি রেলওয়ের জায়গা দিয়ে ফসলি জমির পাশ ঘেঁষে ইরামতি খালে পড়ছে। অন্যদিকে সালমান ও বৈশাখীসহ কয়েকটি অটোরাইস মিলের বর্জ্যপানি নালা দিয়ে ফসলি জমি পেরিয়ে খাড়িতে গিয়ে পড়ছে। অন্যান্য কয়েকটি চালকলের বিরুদ্ধেও একইভাবে অপরিশোধিত বর্জ্যপানি পরিবেশে ফেলার অভিযোগ রয়েছে।
পানির নমুনা পরীক্ষায় দূষণের চিত্র
মিলের বর্জ্যপানি ও খালের পানির নমুনা সংগ্রহ করে সান্তাহার মৎস্য গবেষণাগারে পরীক্ষা করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, মিলের পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের (ডিও) মাত্রা পাওয়া গেছে প্রতি লিটারে ১ দশমিক ৪ মিলিগ্রাম এবং খালের পানিতে ১ দশমিক ২ মিলিগ্রাম।
পরীক্ষায় মিলের পানির পিএইচ পাওয়া গেছে ৭ দশমিক ৩ এবং খালের পানির ৬ দশমিক ৮। অন্যদিকে, অ্যামোনিয়ার মাত্রা মিলের পানিতে ১০ মিলিগ্রামের বেশি এবং খালের পানিতে ১২ মিলিগ্রামের বেশি পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া অ্যালকালিনিটির মাত্রা মিলের পানিতে ০ দশমিক ৩ মিলিগ্রাম এবং খালের পানিতে শূন্য পাওয়া গেছে বলে পরীক্ষার তথ্যে জানানো হয়েছে।
স্থানীয় সচেতন বাসিন্দারা বলছেন, শুধু শোকজের মধ্যে কার্যক্রম সীমাবদ্ধ না রেখে নিয়মিত তদারকি ও পরিবেশদূষণ রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। তাঁদের দাবি, দূষণ অব্যাহত থাকলে কৃষি, মাছচাষ ও জলজ পরিবেশের ক্ষতি আরও বাড়বে।
এদিকে, জনস্বার্থে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে গত ৭ অক্টোবর বগুড়া জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন সচেতন এলাকাবাসী। তবে অভিযোগের পর কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা জানা যায়নি।
উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক আবুল বাসার জানান, মিলারদের পাক্ষিক ছাঁটাই ক্ষমতা অনুযায়ী ধান-চালের মজুদ এবং পরিবেশ, ফায়ার, বয়লার ও বিএসটিআইয়ের লাইসেন্স হালনাগাদ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনা না মানলে বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর সতর্কতা অবলম্বন করা হবে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মাহথীর বিন মোহাম্মদ বলেন, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় ১৩টি চালকলকে শোকজ করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সন্তোষজনক জবাব না পেলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে প্রচলিত পরিবেশ আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, পরিবেশদূষণের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের পাশাপাশি নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করা হবে, যাতে অপরিশোধিত বর্জ্যপানি খাল, জলাশয় ও ফসলি জমিতে ফেলা বন্ধ হয়।
সময়ের আলো/এনএন