চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার সলিমপুর ইউনিয়নের ৭ ও ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের যোগাযোগের প্রধান ভরসা সোনাইছড়ি সড়কটি দীর্ঘদিন ধরে চরম অবহেলা ও সংস্কারহীন অবস্থায় পড়ে রয়েছে। উপকূলীয় ও ঘনবসতিপূর্ণ এই অঞ্চলের প্রায় ৫০ হাজার মানুষের নিত্যদিনের যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম এই সড়কটি। তবে সড়কের অধিকাংশ অংশের পিচ ও ইট-মাটি উঠে গিয়ে পুরো পথজুড়ে ছোট-বড় অজস্র বিপজ্জনক খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টি হলে বা সাধারণ চলাচলেই রাস্তাটির বেহাল অবস্থা স্থানীয় অধিবাসীদের জীবনে এক চরম অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, সোনাইছড়ি সড়কের কাদা ও গর্তে ভরা অংশগুলোতে হাঁটাচলা করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। স্থানীয় যুবকদের নিজস্ব উদ্যোগে ইটের সুরকি ও খোয়া এনে গর্ত গুলো ভরাট করে সড়কটি সাময়িকভাবে চলাচলের উপযোগী করার চেষ্টা চালালেও কিন্তু ভারী যানবাহন চলাচল ও কাদার কারণে সেই চেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হচ্ছে। সামান্য বৃষ্টি হলেই রাস্তার বড় বড় গর্তে পানি জমে পাশের ড্রেন ও রাস্তা একাকার হয়ে যায়। ফলে সড়কটিতে যাতায়াত করতে গিয়ে প্রায় প্রতিদিনই রিকশা, সিএনজি অটোরিকশা উল্টে গিয়ে শিশু, শিক্ষার্থী ও প্রবীণ নাগরিক মারাত্মক দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন।
রাস্তার এই করুণ অবস্থার কারণে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন এলাকার কোমলমতি শিক্ষার্থী, বয়োবৃদ্ধ ও অসুস্থ রোগীরা। স্থানভিত্তিক বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকরা জানান, প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার সময় শিক্ষার্থীরা কাদা-পানিতে পিছলে পড়ে জামাকাপড় ও বই খাতা নষ্ট করছে, যার ফলে তাদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক কাজ করে। অন্যদিকে, জরাজীর্ণ রাস্তার কারণে এলাকার প্রবীণ মানুষেরা ঠিকমতো মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায় করতে পারছেন না। কোনো পরিবারে গর্ভবতী নারী বা আকস্মিক কোনো অসুস্থ রোগী থাকলে তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার মতো ন্যূনতম যানবাহন চলাচলের পরিবেশও এই সড়কের অবশিষ্ট নেই।
যানবাহন চলাচলের ক্ষেত্রে দেখা দিয়েছে তীব্র সংকট ও পরিবহন নৈরাজ্য। স্থানীয় সিএনজি অটোরিকশা ও রিকশাচালকেরা এই ভাঙাচোরা সড়কে ট্রিপ নিতে চান না। চালকদের মতে, খানাখন্দে ভরা এ রাস্তায় গাড়ি চালালে প্রতি সপ্তাহেই বিভিন্ন পার্টস ভেঙে যায় ও যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়ে যায়, যা তাদের আয়ের বড় অংশ মেরামতেই শেষ করে দেয়। বাধ্য হয়ে কোনো চালক যাত্রী বহন করতে রাজি হলেও তারা নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে দ্বিগুণ বা তিনগুণ অতিরিক্ত টাকা দাবি করছেন। এতে কর্মজীবী মানুষ ও সাধারণ যাত্রীদের দৈনন্দিন যাতায়াত খরচ অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেড়ে গেছে।
সড়কের এই দুর্দশা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো. গোলাম কিবরিয়া বলেন, প্রতিদিন এই রাস্তা দিয়ে হাজার হাজার মানুষকে ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করতে হয়। সামান্য বৃষ্টি হলেই গর্তে পানি জমে রাস্তা আর ড্রান এক হয়ে যায়। প্রবীণ মানুষেরা তো দূরের কথা, সুস্থ-সবল মানুষও এই রাস্তায় হেঁটে যেতে গিয়ে আছাড় খান।
সড়কের তীব্র দুর্ভোগের কথা জানিয়ে স্থানীয় গৃহিণী রোকেয়া বেগম বলেন, বাচ্চাদের স্কুলে পাঠালে সারাক্ষণ দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। রাস্তা ভাঙা হওয়ায় কোনো সিএনজি বা রিকশা আসতে চায় না, আসলেও দ্বিগুণ ভাড়া দাবি করে। জরুরি কোনো রোগী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা আমাদের এই সড়কে নেই।
অন্যদিকে স্থানীয় সিএনজি অটোরিকশা চালক মো. করিম বলেন, সোনাইছড়ি সড়কে গাড়ি চালানো মানেই গাড়ির বারোটা বাজা। প্রতি সপ্তাহেই পার্টস নষ্ট হয়, যার কারণে আমরা এই রাস্তায় ট্রিপ নিতে চাই না। প্রশাসন যদি দ্রত রাস্তাটা ঠিক না করে, তবে আমাদের আয়-রোজি বন্ধ হওয়ার জোগাড়।
সড়কের করুণ দশা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে স্থানীয় লতিফপুর আলহাজব আব্দুল জলিল উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোহাম্মদ জানে আলম বলেন, স্কুলের ছোট ছোট কোমলমতি শিক্ষার্থীরা যখন এই জরাজীর্ণ সড়ক দিয়ে যাতায়াত করে, তখন সারাক্ষণ দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। সামান্য বৃষ্টি হলেই রাস্তার গর্তগুলো কাদাপানিতে এক হয়ে যায়। প্রায়ই দেখি শিক্ষার্থীরা কাদা-পানিতে পিছলে পড়ে জামাকাপড় ও বইখাতা নষ্ট করছে। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক এতদিন ধরে সংস্কারহীন পড়ে থাকা অত্যন্ত দুঃখজনক।
সড়কের কারণে দৈনন্দিন কর্মস্থলে যাতায়াতের ভোগান্তি তুলে ধরে এক বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তা মো. রিদোয়ান জানান, কাজের প্রয়োজনে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে অফিসে পৌঁছাতে হয়। কিন্তু এই সোনাইছড়ি সড়কের যে অবস্থা, তাতে ভাঙাচোরা রাস্তায় নিয়মিত যাতায়াত করায় শারীরিক অসুস্থতার পাশাপাশি মানসিকভাবেও চরম হেনস্তার শিকার হতে হয় ।
ভোগান্তির কথা জানিয়ে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা শওকত মামুন বলেন, জরুরি কাজের জন্য কোথাও বের হতে গেলে রাস্তার কারণেই সময়মতো পৌঁছানো যায় না। একটু বৃষ্টি হলেই গাড়ি তো দূরের কথা, হেঁটে চলাই অসম্ভব হয়ে পড়ে। অবহেলার কারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের এমন অবস্থা হতে পারে, তা ভাবা যায় না। এই দুর্ভোগের কারণে পুরো এলাকার স্বাভাবিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে সড়কটি সংস্কারের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ না থাকায় এলাকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনযাত্রার এক ধরনের স্থবিরতা নেমে এসেছে। ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী ও কৃষকরা সময়মতো পণ্য ও সেবা পৌঁছে দিতে পারছেন না। এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে এবং অবহেলিত ৫০ হাজার অধিবাসীদের স্বাভাবিক যাতায়াত নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসন, সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের আশু টেকসই হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন সচেতন এলাকাবাসী। তারা দ্রুততম সময়ের মধ্যে জনগুরুত্বপূর্ণ সোনাইছড়ি সড়কটি মানসম্মত এবং স্থায়ীরূপে পুনঃসংস্কার করার জোরালো দাবি জানিয়েছেন।
সময়ের আলো/আতা