চরমপন্থী নেতা নাসিম খুন : নেপথ্যে আড়াই দশকের রক্তক্ষয়ী অপরাধ

খুলনা ব্যুরো

সারাদেশ

নব্বইয়ের দশকের প্রারম্ভে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ত্রাস সৃষ্টি করা চরমপন্থী রাজনীতির হাতেখড়ি। এরপর একে একে অগণিত হত্যা, অস্ত্রাবাজি আর আন্ডারগ্রাউন্ডের অন্ধকার জগতে

2026-10-17T21:18:57+00:00
2026-10-17T21:19:10+00:00
 
  শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬,
১ কার্তিক ১৪৩৩
শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
সারাদেশ
চরমপন্থী নেতা নাসিম খুন : নেপথ্যে আড়াই দশকের রক্তক্ষয়ী অপরাধ
খুলনা ব্যুরো
প্রকাশ: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ৯:১৮ পিএম  আপডেট: ১৭.১০.২০২৬ ৯:১৯ পিএম
নাসিমুল গণি। ছবি : সংগৃহীত
নব্বইয়ের দশকের প্রারম্ভে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ত্রাস সৃষ্টি করা চরমপন্থী রাজনীতির হাতেখড়ি। এরপর একে একে অগণিত হত্যা, অস্ত্রাবাজি আর আন্ডারগ্রাউন্ডের অন্ধকার জগতে নিজস্ব সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা। একপর্যায়ে চরমপন্থী দল 'জনযুদ্ধ'র আঞ্চলিক শীর্ষ নেতা হিসেবে পরিচিতি পাওয়া সেই কুখ্যাত সন্ত্রাসী নাসিমুল গণি ওরফে নাসিম (৫৪) শেষ পর্যন্ত প্রতিপক্ষের গুলিতেই প্রাণ হারালেন। একাধিক হত্যা মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামি হওয়ার পরও দীর্ঘ আত্মগোপন ও রহস্যজনক জামিনে মুক্ত থাকা এই চরমপন্থী নেতাকে দিনদুপুরে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।

চলতি বছরের ৪ অক্টোবর দিঘলিয়ার ফরমাইশখানা এলাকায় নিজ বাড়ির সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে এ নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আন্ডারগ্রাউন্ডের সাবেক এই ক্যাডার বাড়ির সামনে অবস্থানকালে একটি ভ্যানে করে আসা দুই অস্ত্রধারী দুর্বৃত্ত তাকে লক্ষ্য করে একের পর এক গুলি চালিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায়। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

এ ঘটনার বিষয়ে অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৯২ সালে ফুলতলার শীর্ষ চরমপন্থী নেতা শিমুলের হাত ধরে পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন নাসিম। পরবর্তীতে কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ-মেহেরপুর ও খুলনা অঞ্চলে তান্ডব চালানো ‘দাদা তপন’, হিটলার ও রমেশদের সাথে মিলে একের পর এক হত্যাকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন তিনি। নব্বইয়ের দশকে খাতায়-কলমে চরমপন্থী দলে নাম লেখালেও নাসিম আলোচনায় আসেন ১৯৯৭ সালে। ওই বছর শিমুল, হিটলার ও দাদা তপনের সাথে সরাসরি অংশ নিয়ে ফুলতলার ইউপি চেয়ারম্যান ‘ছোট কাসেম’ হত্যায় অংশ নেন তিনি।

এরপর শুরু হয় তার একের পর এক রক্তক্ষয়ী অপরাধের ইতিহাস— 

১৯৯৯ : খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পেছনে গণেশকে নৃশংসভাবে জবাই করে হত্যা। একই বছর পাবলা ৬ নম্বর ওয়ার্ডের হাসান তরফদারকে হত্যা।

২০০১ : খুলনার আলোচিত জননেতা এস এম এ রব হত্যা মামলার প্রধান আসামি হিসেবে নাসিমের নাম উঠে আসে।

২০০২ : নগরীর বয়রা এলাকায় হাশেম, শাহজাহান ও বাপ্পি হত্যাসহ একাধিক রক্তক্ষয়ী সংঘাতের নায়ক ছিলেন এই নাসিম।

পরবর্তীতে রাজনৈতিক দৃশ্যপট ও আন্ডারগ্রাউন্ডের পরিবর্তনের সাথে সাথে ২০১০ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে ক্রসফায়ারে মারা যান ‘দাদা তপন’। ২০১১ সালে ঢাকায় মৃত্যু হয় হিটলারের।

দলের পুরনো সহযোগীদের মৃত্যুর পর নাসিম নিজের একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করেন। ২০১৫ সালে নগরীর দৌলতপুরে ফিল্মি কায়দায় মোটরসাইকেলে এসে প্রাইভেটকারের ভেতরে থাকা ‘হজী শহীদ’কে সরাসরি গুলি করে হত্যা করেন নাসিম নিজে। এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের পর সারা অঞ্চলে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং নাসিম পুরোপুরি আত্মগোপনে চলে যান।

আন্ডারগ্রাউন্ডে থেকে তিনি নিজেই একটি নিজস্ব সন্ত্রাসী বলয় গড়ে তোলেন। এই নতুন গ্যাংয়ের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হন হুমা বাহিনীর ‘হুমা’। তাদের সাথে যুক্ত হয় আরমান, হোসেন ডালিসহ আরও কয়েকজন শুটার।

পরবর্তীতে নাসিমের নির্দেশে তার বাহিনীর ক্যাডাররা বেশ কয়েকটি চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড ঘটায় :

২০২২ : বয়রায় নাইরমালের রাজা হত্যাকাণ্ড, তার তিন মাস পরেই মুজগুন্নী স্টেডিয়ামের পাশে 'বাপজান মুন্না' হত্যা।

২০২৩ : বাগেরহাটের ফকিরহাটে জাহিদ হত্যাকাণ্ড। ২০২৬ : দৌলতপুর থানা যুবদলের রাসু হত্যাসহ একাধিক রক্তের খেলায় জড়ায় এই গ্রুপটি। তবে এসব মামলার চূড়ান্ত আইনি নিষ্পত্তির তথ্য পুরোপুরি পাওয়া যায়নি। 

সরকারি রেকর্ড অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে চারটি হত্যা, একটি অস্ত্র, একটি বিশেষ ক্ষমতা আইন এবং একটি মারামারির মামলাসহ মোট সাতটি মামলার নথি রয়েছে। এর মধ্যে ২০০২ সালে চরমপন্থী সংগঠনের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে বাগেরহাটের চরমপন্থী নেতা গণেশ হত্যা মামলায় বাগেরহাট জেলা জজ আদালত নাসিমকে ৩২ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন। এ ছাড়া খুলনার একটি অস্ত্র মামলায় তাকে ১৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

দুটি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হওয়ার পর টানা প্রায় ২০ বছর ধরে ফেরারি ছিলেন নাসিম। এ সময় তিনি বগুড়াসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নাম ও পরিচয় গোপন করে বসবাস করেন। তার পরিবারও এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়। দীর্ঘ আত্মগোপনে থাকার পর ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে বগুড়া থেকে র‍্যাব/পুলিশের বিশেষ অভিযানে গ্রেফতার হয়ে খুলনায় আনা হয় তাকে।

জামিন রহস্য ও সচেতন মহলের প্রশ্নদুটি গুরুতর মামলায় ৪৯ বছরের সাজাপ্রাপ্ত এবং হাফ ডজন হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি হওয়া সত্ত্বেও ২০২৩ সালে গ্রেফতারের কিছুদিন পরই জামিনে মুক্ত হয়ে যান এই কুখ্যাত সন্ত্রাসী। জামিন পেয়ে তিনি প্রকাশ্যে নিজ গ্রাম দিঘলিয়ার 

ফরমাইশখানায় ফিরে আসেন এবং সেখানে অবাধে বসবাস শুরু করেন। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নজরদারির মধ্যে একজন চিহ্নিত, সাজাপ্রাপ্ত চরমপন্থী নেতা কীভাবে এবং কার রাজনৈতিক প্রভাবে বারবার জামিন পেয়ে এলাকায় প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াতেন— তা নিয়ে চরম বিস্ময় প্রকাশ করেছেন সাধারণ মানুষ ও সচেতন মহল। আইনি প্রক্রিয়ার এমন শিথিলতাই শেষ পর্যন্ত তার নিজের জীবনের সমাপ্তি ডেকে আনল বলে ধারণা করা হচ্ছে।

পুলিশ জানিয়েছে, খুনের নেপথ্যে চরমপন্থী দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল, নাকি পুরানো শত্রুতার জের রয়েছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। 

খুলনা দিঘলিয়া থানার (ওসি) অরক কুমার চৌধুরী বলেন, আমি নতুন এসেছি, নাসিমের নামে সাতটি মামলা আছে বলে জানতে পেরেছি। এছাড়া তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

অজ্ঞাতনামে আসামি করে মামলা করা হয়েছে। (মামলা নাম্বার- ৪) তারিখ ৫ অক্টোবর ২০২৬। নাসিম হত্যা মামলার আসামিরা পালাতক রয়েছে। ধরতে পারলে জানাবো।

সময়ের আলো/আতা
  বিষয়:   খুলনা  চরমপন্থী  নেতা  নাসিম  খুন  রক্তক্ষয়ী অপরাধ  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: