জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। ছবি : সংগৃহীতকর ফাঁকি শনাক্ত, করের আওতা সম্প্রসারণ এবং বকেয়া রাজস্ব আদায়ে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা জোরদারের পরিকল্পনা নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। ব্যাংক লেনদেন, জমি-ফ্ল্যাট কেনা, গাড়ির মালিকানা, ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার ও বিদেশ ভ্রমণসহ ১৬টি উৎসের তথ্য কাজে লাগিয়ে সম্ভাব্য করদাতা শনাক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি করদাতার ঘোষিত আয় ও সম্পদের তথ্য বিভিন্ন সরকারি সংস্থার তথ্যভান্ডারের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার পরিকল্পনা রয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে উপস্থাপিত পরিকল্পনায় আয়কর, মূল্য সংযোজন কর (মূসক) ও কাস্টমস ব্যবস্থার আধুনিকায়নে বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে অনলাইনে কর নির্ধারণ ও শুনানি, স্বয়ংক্রিয় কর ফেরত, ঝুঁকিভিত্তিক অডিট, ভ্যাট ফাঁকি রোধ এবং আমদানি-রফতানিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার। তবে অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি, কর অব্যাহতি, তথ্য বিনিময়ে সীমাবদ্ধতা ও জনবল সংকট পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জ।
রাজস্বের বড় দায়িত্ব এনবিআরের
২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারের মোট বাজেট ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে এনবিআরের মাধ্যমে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আদায়ের পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের মোট আহরিত রাজস্বের প্রতি ১০০ টাকার মধ্যে প্রায় ৮৬ টাকা এনবিআরের মাধ্যমে আসে বলে সংস্থাটির উপস্থাপনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
রাজস্ব আহরণে তিনটি কৌশল নিয়েছে এনবিআর— রিকভারি স্ট্র্যাটেজির মাধ্যমে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি বাড়ানো, রিস্টোরেশন স্ট্র্যাটেজির মাধ্যমে করের আওতা সম্প্রসারণ ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি এবং রিকনস্ট্রাকশন ফর অ্যাক্সিলারেশন স্ট্র্যাটেজির মাধ্যমে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও স্বেচ্ছায় কর পরিপালন বাড়ানো। রাজস্ব আহরণের গড় প্রবৃদ্ধি ১৬ শতাংশে উন্নীত করা এবং ২০৩০ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্যও রয়েছে।
১৬ উৎসের তথ্য দিয়ে করদাতা শনাক্ত
করহার না বাড়িয়ে করের আওতা সম্প্রসারণে সম্ভাব্য করদাতা শনাক্তকরণ কর্মসূচি নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ব্যাংক লেনদেন, জমি ও ফ্ল্যাট কেনা, গাড়ির মালিকানা, ক্রেডিট কার্ড, বিদেশ ভ্রমণ, সরকারি ক্রয়, শেয়ারবাজার ও ইউটিলিটি সংযোগসহ ১৬টি ক্ষেত্রের তথ্য আয়কর রিটার্নের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে। করযোগ্য আয় থাকা সত্ত্বেও রিটার্ন জমা দেন না, কিংবা টিআইএন থাকা সত্ত্বেও নিয়মিত কর পরিপালন করেন না— এমন ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হবে।
টিআইএন ডাটাবেজ পর্যালোচনা করে করদাতাদের নিয়মিত রিটার্নদাতা, শূন্য রিটার্নদাতা, নন-ফাইলার, নিষ্ক্রিয় ও সম্ভাব্য করদাতা— এই পাঁচ শ্রেণিতে ভাগ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া ‘ন্যাশনাল ইনকাম ট্যাক্স ডাটা ম্যাচিং সিস্টেম’-এর মাধ্যমে ঘোষিত আয়, ব্যাংক আমানত, সম্পদ কেনা ও বিদেশ ভ্রমণের তথ্যের মধ্যে অসংগতি শনাক্তের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সমন্বিত করদাতা প্রোফাইল তৈরি করে অস্বাভাবিক অসংগতি পাওয়া গেলে ঝুঁকিভিত্তিক যাচাই এবং উচ্চ সম্পদসম্পন্ন ব্যক্তিদের আলাদা প্রোফাইলিং করা হবে। করপোরেট করের ক্ষেত্রে টার্নওভার, মুনাফার অনুপাত, সংশ্লিষ্ট পক্ষের লেনদেন, রয়্যালটি ও আমদানি মূল্যসহ ১৪টি সূচক পরীক্ষা করা হবে। বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের কর ফাঁকি ও মুনাফা স্থানান্তর শনাক্তে আন্তর্জাতিক কর ও ট্রান্সফার প্রাইসিং ইউনিটের সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
ডিজিটাল আয়কর ও ভ্যাট ব্যবস্থাপনা
অনলাইনে নোটিস, নথি জমা, শুনানি, স্বয়ংক্রিয় মামলা বরাদ্দ ও আদেশ জারির ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। চাকরিজীবীদের জন্য আগে থেকে পূরণ করা রিটার্ন, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও ফ্রিল্যান্সারদের জন্য সহজ রিটার্ন এবং বাড়ির মালিকদের আয় শনাক্তে সম্পত্তিভিত্তিক কর্মসূচি নেওয়া হবে। উৎসে করের হিসাব সংরক্ষণে রিয়েল-টাইম ট্যাক্স ক্রেডিট লেজার, অতিরিক্ত কর ফেরতে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, বকেয়া আদায়ে ডেট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি কার্যকর করার উদ্যোগ রয়েছে। নন-ফাইলার শনাক্ত, বকেয়া করের তালিকা এবং কেন্দ্রীয় ঝুঁকিভিত্তিক অডিটও পরিকল্পনার অংশ।
ভ্যাটের ক্ষেত্রে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন ও লেনদেনের সঙ্গে বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (বিআইএন) যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ব্যাংক হিসাব, ঋণ, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন, মোবাইল আর্থিক সেবার মার্চেন্ট হিসাব, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ ও যানবাহন নিবন্ধনের মতো ক্ষেত্রে বিআইএন ব্যবহারের বিষয়টি রয়েছে পরিকল্পনায়। কর অব্যাহতি পুনর্মূল্যায়নে ‘ট্যাক্স এক্সপেন্ডিচার পলিসি অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট ফ্রেমওয়ার্ক ২০২৫’ অনুসরণ এবং সুবিধার মেয়াদ শেষে পুনর্মূল্যায়নের বিধান বা সানসেট ক্লজ যুক্ত করার কথাও বলা হয়েছে।
তামাক খাতে উৎপাদন ও সরবরাহ পর্যায়ে নজরদারি, ট্র্যাক অ্যান্ড ট্রেস ব্যবস্থা, সিসি ক্যামেরা এবং স্ট্যাম্পে কিউআর বা এআর কোড ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। কর ফাঁকির তথ্যদাতাদের পুরস্কৃত করা এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কর পরিশোধ সহজ করার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
কাস্টমসে এআই, বাধা জনবল সংকট
আমদানি-রপ্তানিতে উচ্চ ঝুঁঁকির চালান শনাক্তে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসমৃদ্ধ স্বয়ংক্রিয় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, ‘বাংলাদেশ সিঙ্গেল উইন্ডো’ বাস্তবায়ন, বাণিজ্যভিত্তিক অর্থ পাচার শনাক্তে ট্রান্সফার প্রাইসিং সেলের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কাস্টমস বন্ড ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। বন্দরে দীর্ঘদিন পড়ে থাকা পণ্য দ্রুত নিলামে তুলে জট কমানো ও রাজস্ব আদায়েও জোর দেওয়া হচ্ছে।
তবে কাস্টমস ও ভ্যাট অনুবিভাগে জনবল সংকট বড় বাধা। খসড়ায় দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ১৪ হাজার ২৯৮টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত ৭ হাজার ৬৮২ জন; শূন্য পদ ৫ হাজার ৭২২টি। প্রথম থেকে দশম গ্রেডে ৭ হাজার ৬৬২টি পদের বিপরীতে কর্মরত ৪ হাজার ৭২ জন এবং শূন্য ২ হাজার ৭০৬টি পদ। ষষ্ঠ গ্রেডের উপকমিশনারের ২৪৭টি পদের মধ্যে ১৬৭টি, নবম গ্রেডের রাজস্ব কর্মকর্তার ১ হাজার ১৪৭টি পদের মধ্যে ৩২০টি এবং দশম গ্রেডের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তার ৫ হাজার ৬৩১টি পদের মধ্যে ২ হাজার ৩৮৬টি পদ শূন্য। একাদশ থেকে ২০তম গ্রেডেও ৬ হাজার ৬৩৬টি পদের বিপরীতে ৩ হাজার ১৬টি পদ খালি রয়েছে।
এদিকে কর অব্যাহতি, নগদ লেনদেননির্ভর অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি, তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থার অসমন্বয় এবং অসংগতিপূর্ণ আইন প্রয়োগ রাজস্ব আহরণে বাধা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। রাজস্ব নীতি ও ব্যবস্থাপনা পৃথক করা এবং প্রশাসনিক পুনর্গঠনের উদ্যোগও রয়েছে। তবে প্রযুক্তির পাশাপাশি দক্ষ জনবল, তথ্যের নির্ভুলতা ও গোপনীয়তা নিশ্চিত করা, কর অব্যাহতির যৌক্তিকতা পর্যালোচনা এবং করদাতার আস্থা বাড়ানো ছাড়া পরিকল্পনার কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে