মো. শামছুল হুদা, দেওয়ানগঞ্জ (জামালপুর)
ফাইল ছবি স্বাদ ও আকারের বিশেষ বৈশিষ্ট্যে একসময় দেশজুড়ে পরিচিত ছিল দেওয়ানগঞ্জের পানিফল। জলবায়ুর পরিবর্তন, বৃষ্টিপাত ও বন্যার ধরন বদলে যাওয়ায় কমছে জলাভূমির পানি। হারিয়ে যেতে বসেছে ঐতিহ্যবাহী এ ফলের চাষ। দেওয়ানগঞ্জের চুলকানি বিল, পুঁটিমারি বিল, গুজিমারি বিল, ভেগি বিল, টেংরাগুড়া বিল, ডাকাতিয়া বিল, ভেলামারি বিল ও চুনিয়াপাড়া কোলা একসময় পানিফল চাষের জন্য বেশ পরিচিত ছিল। উপজেলার অন্যান্য জলাশয়েও হতো এ ফলের আবাদ। তবে পানির প্রাপ্যতা কমে যাওয়ায় সংকুচিত হচ্ছে চাষের জমি। কোথাও আবাদ হচ্ছে ধানসহ অন্যান্য ফসলের।
উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বছরে প্রায় ৬০ হেক্টরের বেশি জমিতে পানিফল চাষ হতো। ২০২৩ সালে তা কমে ৪৫ হেক্টরে, ২০২৪ সালে ৪২, ২০২৫ সালে ৪০ এবং ২০২৬ সালে মাত্র ৩৫ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে। কয়েক বছরের ব্যবধানে চাষের জমি কমেছে প্রায় ৪২ শতাংশ।
চুলকানি বিলের পানিফল চাষি হাসমত আলী, জাহের আলী ও করিম মিয়ার ভাষ্য, ২০১৫-১৬ সাল পর্যন্ত প্রতি বিঘা জমিতে চাষের খরচ ছিল দুই থেকে তিন হাজার টাকা। অনুকূল পরিবেশে ফলন হতো প্রায় ৩০ মণ। বর্তমানে ফলন কমে ১৪-১৫ মণে নেমেছে, আর খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০ হাজার টাকায়। প্রতি মণ পানিফল ৭০০-৮০০ টাকায় বিক্রি হলেও কাঙ্ক্ষিত লাভ হচ্ছে না। আগে একই চারা থেকে তিন দফায় ফল পাওয়া যেত, এখন দুই দফার বেশি পাওয়া যায় না। উৎপাদন কমে যাওয়ায় পানিফলের বীজ, স্থানীয়ভাবে ‘পুল’ নামে পরিচিত, সংগ্রহ ও সংরক্ষণেও সংকট তৈরি হয়েছে।
চাষি বেলাল, মজেন, সুফিয়া ও ওমিছা বেগম জানান, পানিফলে লাল-কালো পোকার আক্রমণ বেড়েছে। বিভিন্ন কীটনাশক প্রয়োগ করেও আশানুরূপ ফল পাওয়া যাচ্ছে না। ‘ইন্ডিয়ান ডিডিটি পাউডার’ নামে পরিচিত একটি কীটনাশক পাওয়া যেত, যা পোকার আক্রমণ দমনে কার্যকর ছিল। একসময় ৫০ টাকায় পাওয়া গেলেও পরে দাম বেড়ে ৩০০ টাকা হয়। বর্তমানে ওই কীটনাশক আর পাওয়া যায় না। বাজারের বিভিন্ন কীটনাশক প্রয়োগ করে আশানুরূপ ফল পাওয়া যাচ্ছে না। ফলন হ্রাস, পোকার আক্রমণ ও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় চাষের ঝুঁকিও বাড়ছে।
পানিফল ব্যবসায়ী সমিরুল তুলে ধরেন, একসময় দেওয়ানগঞ্জ থেকে প্রতিদিন দুটি লোকাল ট্রেন ও ট্রাকযোগে পানিফল ঢাকায় পাঠানো হতো। কারওয়ান বাজার ও সদরঘাটের আশপাশের বাজারে এসব ফল বিক্রি হতো। ট্রেন চলাচল বন্ধ, উৎপাদন হ্রাস ও পরিবহন সংকটে এখন আগের মতো ঢাকায় পানিফল পাঠানো হয় না। এখন মাঝেমধ্যে ময়মনসিংহ অঞ্চলে পানিফল পাঠানো হলেও উৎপাদিত ফলের বড় অংশ স্থানীয় বাজারেই বিক্রি হয়।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. রতন মিয়া বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বৃষ্টিপাতের ধরন ও বন্যার স্বাভাবিক চক্রে পরিবর্তন আসায় গত কয়েক বছর তুলনামূলকভাবে বন্যা কম হয়েছে। ফলে জলাভূমিতে পানির প্রাপ্যতা কমে পানিফল চাষ ব্যাহত হচ্ছে। পানিফলের ঐতিহ্য ধরে রাখতে চাষিদের তালিকা তৈরি করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে কৃষকদের প্রশিক্ষিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, পানিফল চাষের ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে জলাভূমি সংরক্ষণ, পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিতকরণ, পোকার আক্রমণ মোকাবিলা, উন্নত চাষপদ্ধতি, বীজ সংরক্ষণ ও সহজ বাজারজাতকরণ জরুরি। সময়মতো কার্যকর উদ্যোগ না নিলে দেওয়ানগঞ্জের কৃষি ও স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা পানিফল চাষ আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই হারিয়ে যাবে।
সময়ের আলো/আতা