গ্রাফিক : সময়ের আলোবাংলা ব্যান্ডের ইতিহাসে কিছু নাম কেবল নামের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, সেগুলো পরিণত হয় একটি আস্ত যুগে, একটি বিপ্লবে। বাংলা রক মিউজিকের ইতিহাসের সেইসব নামের মধ্যে একটি নাম ব্যান্ড কিংবদন্তি, গিটারের জাদুকর আইয়ুব বাচ্চু। ২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর হঠাৎ করেই থমকে গিয়েছিল তার গিটারের দুরন্ত ঝংকার, স্তব্ধ হয়েছিল অসংখ্য শ্রোতার হৃদয় কাঁপানো চিরচেনা কণ্ঠ। সময়ের নিয়মে বছর ঘুরে আবারও ফিরে এলো তার প্রয়াণ দিবস। তিনি আজ সশরীরে আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু রেখে গেছেন এক সুবিশাল সুরের সাম্রাজ্য, যা আজও প্রতিটা গানপাগল বাঙালির হৃদয়ে একইভাবে দোলা দেয়।
আইয়ুব বাচ্চু— বাংলা রককে কেবল নতুন রূপ দেননি, তরুণ প্রজন্মকে শিখিয়েছিলেন সুরের ছন্দে জীবনকে ভালোবাসতে, দুঃখকে বুকে চেপে রাখতে আর ভালোবাসার জয়গান গাইতে। আশির দশকে ‘সোলস’ দিয়ে শুরু করে পরবর্তীতে ‘এলআরবি’র প্রতিষ্ঠা— প্রতিটি পদক্ষেপেই তিনি গড়েছেন নতুন ইতিহাস। তার হাতে রুপালি গিটার যেন কথা বলত। ‘সেই তুমি কেন এত অচেনা হলে’, ‘রুপালি গিটার’, ‘হাসতে দেখো গাইতে দেখো’, ‘কষ্ট পেতে ভালোবাসি’, কিংবা ‘ফেরারী মন’— গানগুলো শুধু অসম্ভব জনপ্রিয় ছিল তো বটেই, একই সঙ্গে এগুলো ছিল কোটি তরুণের মনের কথা, জমানো আবেগ ও ভালোবাসার অঘোষিত জাতীয় সংগীত। কণ্ঠের স্বতন্ত্রতা, গিটার বাজানোর অসাধারণ দক্ষতা এবং সংগীতায়োজনে নিজস্বতা তাকে দিয়েছিল আলাদা পরিচয়। বিশেষ করে লিড গিটারে তার মুনশিয়ানা তাকে উপমহাদেশের অন্যতম স্মরণীয় গিটারবাদকে পরিণত করেছে।
আইয়ুব বাচ্চু ছিলেন সুরের এক হৃদয়জুড়ানো ফেরিওয়ালা। মঞ্চে তার উপস্থিতি ছিল এক অদ্ভুত জাদুকরী শক্তিতে ভরা। এক হাতে গিটার উঁচিয়ে যখন তিনি গাইতেন, হাজার হাজার শ্রোতা তখন একই সুরে সুর মেলাত। ‘সেই তুমি’ গানটির কথাই ধরা যাক। সময় বদলায়, মানুষ বদলায়, সম্পর্কের সমীকরণ পাল্টে যায়; কিন্তু গানটির প্রতিটি পঙক্তি আজও পুরোনো স্মৃতির দরজা খুলে দেয়। হারিয়ে যাওয়া মানুষ, অসমাপ্ত ভালোবাসা কিংবা বুকের গভীরে জমে থাকা অভিমান— সবকিছুর সঙ্গে যেন অদৃশ্য সেতুবন্ধ তৈরি করে তার কণ্ঠ। এটাই আইয়ুব বাচ্চুর শিল্পের জাদু। তিনি কেবল গান শোনাননি, মানুষের অনুভূতিকে সুরের শরীরে বেঁধে দিয়েছেন।
আইয়ুব বাচ্চু শুধু একজন সংগীতশিল্পী ছিলেন না; তিনি ছিলেন প্রায় সব প্রজন্মেরই আবেগের নাম। তার কণ্ঠে প্রেমিক খুঁজে পেয়েছে— না বলা ভালোবাসার ভাষা, বিরহী মানুষ পেয়েছে নিজের কান্নার প্রতিধ্বনি, আর তারুণ্য পেয়েছে বুক চিতিয়ে বাঁচার সাহস। তার গাওয়া প্রতিটি গানই যেন জীবনের কোনো না কোনো মুহূর্তের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তার চলে যাওয়াটা তাই কেবল একজন শিল্পীর মৃত্যু নয়; এটি সংগীতপ্রেমীদের জীবনে এক অপূরণীয় শূন্যতা।
আইয়ুব বাচ্চু নেই, কিন্তু তার গান আছে। আছে সেই রুপালি গিটার, যা ছুঁয়ে গেছে, এখনও যায় অগণিত হৃদয়। তার চলে যাওয়া মানে শুধু একজন শিল্পীকে হারানো নয়; বাংলা সংগীতের আকাশ থেকে একটি উজ্জ্বলতম নক্ষত্রের পতন। কিন্তু মৃত্যুর পরও কি সত্যিই মিটে যায় শিল্পীর আলো? না, শিল্পীর কোনো মৃত্যু হয় না। তিনি বেঁচে থাকেন তার সৃষ্টির মাধ্যমে, বেঁচে থাকেন শ্রোতার হৃদয় নিংড়ানো আবেগে। যত দিন বাংলা গান থাকবে, যত দিন মানুষ ভালোবাসবে, হারাবে, কাঁদবে কিংবা স্মৃতির কাছে ফিরে যাবে— তত দিন গিটারের তারে, হৃদয়ের গভীরে বেজে উঠবে আইয়ুব বাচ্চুর সুর।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি