ছবি : সংগৃহীত ছুটির আনন্দে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কক্সবাজারের ইনানিতে বেড়াতে গিয়েছিলেন তারা। কিন্তু সাগর পাড়ের সেই অবকাশযাপন যে এমন মর্মান্তিক পরিণতি ডেকে আনবে, তা কে জানত! শনিবার সকালে পাটোয়ারটেক সৈকতসংলগ্ন টুপটুপ রিসোর্টে আগুন লাগার পর মুহূর্তেই তা ছড়িয়ে পড়ে তিন তলা কাঠের স্থাপনাটিতে।
প্রাণ বাঁচাতে ছোটাছুটি করেও বের হতে পারেননি অনেকে; কেউ কেউ আশ্রয় নিয়েছিলেন শৌচাগারে, সেখান থেকেও ফেরা হয়নি জীবনের পথে। আগুনে পুড়ে মারা গেছেন একই পরিবারের ছয়জনসহ ১০ পর্যটক, তাদের মধ্যে পাঁচ নারী ও পাঁচ বছরের এক শিশুও রয়েছে। দগ্ধ হয়েছেন আরও ছয়জন। রিসোর্টটিতে ছিল না অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র কিংবা প্রয়োজনীয় অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, ছিল না ফায়ার লাইসেন্সও।
উখিয়া উপজেলার জালিয়াপালং ইউনিয়নের মেরিন ড্রাইভ সড়কের ইনানি পাটোয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রিসোর্ট অ্যান্ড রেস্তোরাঁটিতে আগুনের সূত্রপাত শনিবার সকাল ৭টার দিকে। বেলা ১১টার দিকে আগুন পুরোপুরি নেভানো হয় বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন।
একই পরিবারের নিহতরা হলেন— ইসরাত জাহান মালিহা (৩০), মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), লায়লা জাহান নাবিলা (২৭), নাফিস তেহামী, ফারিহা কবির (৩৩) ও ফাইয়াজ আহম্মেদ (৫)।
এ ঘটনায় আহত ছয়জন হলেন— মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক শিহাব উদ্দীন (৩১), তার স্ত্রী নাফিসা নেওয়াজ খান (২৯), মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০) ও সামিদা (৩২)।
এ বিষয়ে উখিয়ার ইউএনও পান্না আক্তার বলেন, এখন পর্যন্ত দশজনের মৃতদেহ পাওয়া গেছে। আমরা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি এর মধ্যে একই পরিবারের ছয়জন সদস্য হতে পারে। তবে ডিএনও রিপোর্টের মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে। নিহতদের মধ্যে তিনজন ঢাকা, জগন্নাথ ও ইস্ট-ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চীনা ভাষা ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী নাফিজ তেহামী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের লায়লা জাহান নাবিলা এবং ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির মেলিতা মেহেজাবিন আলভী।
সমুদ্রের পাশে হওয়ায় দ্রুত ছড়ায় আগুন, নেভানোর কিছুই ছিল না রিসোর্টে : ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের চট্টগ্রাম বিভাগের উপপরিচালক মো. তৌফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, গতকাল সকাল ৭টা ২৩ মিনিটে কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিসে আগুনের খবর দেওয়া হয়। সকাল ৮টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। ৮টা ১৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। চারজন ব্যক্তি মারা গেছেন তিন তলার দুটি শৌচাগারে।
তৌফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, সমুদ্রের তীব্র বাতাসে কাঠের রিসোর্টে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এ ধরনের স্থাপনায় বহনযোগ্য অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, অগ্নিসংকেত, হোস পাইপ ও অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনা থাকা দরকার। কিন্তু রিসোর্টটিতে এগুলোর কিছুই ছিল না। ফায়ার লাইসেন্সও ছিল না। মাত্র সাত-আট মাস আগে রিসোর্টটি তৈরি হয়েছিল। জায়গাটির মালিকানা নিয়েও দ্বন্দ্ব ছিল বলে জানান তিনি।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান বলেন, রান্নাঘরের চুল্লি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ অনুসন্ধানে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
সিলিন্ডার বিস্ফোরণ থেকে আগুনের সূত্রপাত : স্থানীয় বাসিন্দা ও পাশের দোকানের মালিক গিয়াস উদ্দিন এবং জালিয়াপালং ইউনিয়নের আনসার-ভিডিপি কমান্ডার মোহাম্মদ আজিজের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গতকাল সকাল সাড়ে ৬টার দিকে সিলিন্ডার বিস্ফোরণের মতো শব্দ শুনেছিলেন তারা। এরপর বাইরে এসে আগুন দেখতে পান।
গিয়াস উদ্দিন বলেন, রিসোর্টের আগুনে তার চা-কফির দোকানের একটি ফ্রিজ ও দোকানের কিছু অংশ পুড়ে গেছে। তিনি বলেন, সকাল ৭টার দিকে বিস্ফোরণের শব্দ শুনে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। এ সময় রিসোর্টে থাকা পর্যটকদের কান্নাকাটি দৌড়ঝাঁপ দেখতে পান। কিন্তু দাউ দাউ আগুন আর ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে সেখানে প্রবেশ করে লোকজনকে উদ্ধার করা সম্ভব ছিল না।
গিয়াস উদ্দিনের দাবি, চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর মোহাম্মদ তানভীর তার মায়ের ওয়ারিশদের কাছ থেকে ২০ শতক জমি কিনে সেখানে স্থাপনা করেন। রিসোর্টের পাশের দোকানের একটি ফ্রিজ ও কিছু কাঠও আগুনে পুড়েছে। মালিক তানভীরের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। তাকে ঘটনাস্থলেও পাওয়া যায়নি।
রিসোর্ট লাগোয়া সুপারিবাগান। বাগানের মালিক নুরুল ইসলাম বলেন, রান্নাঘরের চুল্লি থেকে আগুনের সূত্রপাত ঘটতে পারে। এরপর সেখানে গ্যাস সিলিন্ডারের বিস্ফোরণ ঘটেছে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলার মেঝে কাঠের ছিল। আগুনে কাঠ পুড়ে যাওয়ায় সম্ভবত অতিথিরা নিচে নামতে পারেননি। বের হওয়ার বিকল্প কোনো পথ ছিল না। বাথরুমে আশ্রয় নিয়েও রক্ষা পাননি অনেকে। মেরিন ড্রাইভের ইনানি সৈকতে এ ধরনের ভয়ংকর ঘটনা আর ঘটেনি।
এদিকে রেস্তোরাঁয় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় রিসোর্টটির ম্যানেজার মোহাম্মদ সুমনকে আটক করেছে পুলিশ। শনিবার বেলা সাড়ে ৩টার দিকে তাকে ঘটনাস্থল থেকে আটক করা হয়।
উখিয়া থানার ওসি আতিকুর রহমান মজুমদার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। ওসি জানান, আটক ম্যানেজার সুমনকে থানায় নেওয়া হয়েছে। তাকে অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে