ছবি : সংগৃহীত রাজধানীর মিরপুরসহ কয়েকটি এলাকায় ফুটপাথ দখলমুক্ত করতে উচ্ছেদ অভিযান চালানোয় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন নগরবাসী। দীর্ঘদিন পর ফুটপাথ দিয়ে নির্বিঘ্নে হাঁটার সুযোগ তৈরি হয়েছে এসব এলাকায়। তবে গুলিস্তান ও মোহাম্মদপুরসহ রাজধানীর অন্য এলাকাগুলোর ফুটপাথও দখলমুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন তারা। তাদের মতে, উচ্ছেদ অভিযানের সুফল ধরে রাখতে নিয়মিত নজরদারি, হকারদের জন্য বিকল্প কর্মস্থল এবং পুনর্দখল ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি), ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ও ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাথ দখলমুক্ত করতে অভিযান চালাচ্ছে। মিরপুর, মোহাম্মদপুর, গুলিস্তান, জাতীয় প্রেস ক্লাব, সেগুনবাগিচা ও মতিঝিলের কয়েকটি এলাকায় এর প্রভাব দেখা গেছে। কোথাও কোথাও ফুটপাথ থেকে অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে পথচারীদের চলাচলের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।
রাজধানীর ব্যস্ত বাণিজ্যিক ও যোগাযোগকেন্দ্র মিরপুর-১০-এ দীর্ঘদিন ধরে ফুটপাথ ও সড়কের বড় অংশ দখল করে বসানো হয়েছিল অস্থায়ী দোকানপাট। গোলচত্বর, হোপ মার্কেট, হোপ স্কুল রোড ও মিরপুর গার্লস আইডিয়াল স্কুলের আশপাশে এসব দোকানের কারণে পথচারীদের চলাচল কঠিন হয়ে পড়েছিল। অনেককে ফুটপাথ ছেড়ে মূল সড়ক দিয়ে হাঁটতে হতো। এতে যানজটের পাশাপাশি দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ত।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর ডিএনসিসির অভিযানের পর হোপ মার্কেট ও আশপাশের এলাকায় ফুটপাথ অনেকটাই দখলমুক্ত হয়েছে। গোলচত্বরের ফুটওভার ব্রিজের নিচের অংশ থেকেও অবৈধ দখল সরানো হয়েছে। পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি ৎ
সেখানে গাছ লাগিয়ে পরিবেশ সুন্দর করার উদ্যোগ নিয়েছে সিটি করপোরেশন। ফলে আগের তুলনায় স্বচ্ছন্দ্যে চলাচল করতে পারছেন পথচারীরা।
মিরপুরের বাসিন্দা শাহিনুর রহমান বলেন, ‘দীর্ঘদিন পর স্ত্রী ও দুই সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে ফুটপাথ দিয়ে হাঁটার সুযোগ পেয়েছি। অভিজ্ঞতাটি আমার কাছে নতুন মনে হচ্ছে। আর যেন ফুটপাথ দখল না হয়, সে জন্য সংশ্লিষ্টদের নিয়মিত নজরদারি করতে হবে।’
একই এলাকার বাসিন্দা শ্যামল সরকার বলেন, ‘প্রায় ১০ বছর ধরে এই এলাকায় থাকি। একসময় রাস্তাঘাট খোলামেলা ছিল। পরে এমন অবস্থা হয়েছিল যে ফুটপাথ দিয়ে হাঁটার উপায় ছিল না। ফুটপাথের দোকানের কারণে মার্কেটের দোকানগুলোতেও কেনাবেচা কমে গিয়েছিল। এখন পরিবেশ অনেক পরিচ্ছন্ন। এমন অভিযান পুরো ঢাকা শহরে চালানো উচিত। গুলিস্তানের অবস্থা আরও খারাপ।’
রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকা গুলিস্তানেও ফুটপাথ দখলের কারণে পথচারীদের ভোগান্তি দীর্ঘদিনের। বিপণি বিতান, বাসস্ট্যান্ড ও প্রধান সড়কের পাশে দোকানপাট ও অস্থায়ী পসরা বসায় মানুষকে বাধ্য হয়ে সড়কে নামতে হয়। এতে পথচারী ও যানবাহন একই জায়গা ব্যবহার করায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। শিশু, বয়স্ক ও শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চলাচলেও সমস্যা হয়। তাই গুলিস্তানসহ মোহাম্মদপুরের ফুটপাথগুলোও কার্যকরভাবে দখলমুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
শুধু ফুটপাথ উদ্ধার নয়, দখলমুক্ত জায়গা ব্যবহার উপযোগী করে তোলার উদাহরণ তৈরি হয়েছে সেগুনবাগিচায়। গত ৫ অক্টোবর ডিএসসিসি দীর্ঘদিন দখলে থাকা একটি ফুটপাথ উদ্ধার করে জনসাধারণের জন্য খুলে দেয়। সৌন্দর্যবর্ধনের অংশ হিসেবে সেখানে ময়লার ঝুড়ি ও বসার বেঞ্চ স্থাপন এবং দেয়াল সংস্কার করা হয়েছে। দেয়ালে দেশের শিল্প-সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত ১০ বিশিষ্ট ব্যক্তির ছবি ও গ্রাফিতি স্থান পেয়েছে। এতে পথচারীদের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া দেখা গেছে।
নগরবাসীর মতে, ফুটপাথ দখলমুক্ত রাখার পাশাপাশি রাজধানীর খালগুলোও উদ্ধার ও সচল করা জরুরি। মোহাম্মদপুর, মিরপুর, নন্দীপাড়া, জিরানী খাল, কালুনগর, মান্ডা ও শ্যামপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় খাল দখল, বর্জ্য জমা এবং পানি নিষ্কাশনে প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। খালের স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হলে বৃষ্টির পানি দ্রুত নামতে পারে না। এতে নিচু সড়ক ও আবাসিক এলাকায় জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বাড়ে। তাই খাল উদ্ধার করার পাশাপাশি নিয়মিত পরিষ্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, ফুটপাথ দখলমুক্ত রাখার অভিযান অব্যাহত থাকবে। হকারদের বিকল্প স্থানে ব্যবসার সুযোগ দেওয়া হবে। ভবিষ্যতে কেউ ফুটপাথ দখল করলে বা দখলের চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি দখল করা খাল উদ্ধার করা হবে এবং খাল দখলকারীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আবদুস সালাম বলেন, ফুটপাথ ও সড়ক দখল করে কাউকে ব্যবসা করতে দেওয়া হবে না। তবে হকারদের জীবিকার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বিকল্প স্থানে ব্যবসার সুযোগ তৈরির ব্যবস্থা করা হবে। ফুটপাথ উদ্ধারের পর সেগুলো পরিচ্ছন্ন ও ব্যবহারযোগ্য রাখার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, শুধু উচ্ছেদ অভিযান চালালেই নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত হয় না। নিয়মিত পরিচর্যা, বর্জ্য অপসারণ ও অবৈধ দখল প্রতিরোধও প্রয়োজন। ইতিমধ্যে বেশ কিছু খাল উদ্ধার করা হয়েছে। বাকি দখল করা খালও উদ্ধার করা হবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে