ফ্রান্সে দেশজুড়ে বিক্ষোভ। ছবি : আনাদোলু ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে ইয়েলো ভেস্ট (হলুদ জ্যাকেট) আন্দোলনকারীদের অংশগ্রহণে দেশজুড়ে বিক্ষোভ চলাকালে ২ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও ব্যাপক লুটপাটের ঘটনার পর রোববার এ তথ্য জানিয়েছেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে নুনেজ জানান, সহিংসতায় ৬০০-এর বেশি পুলিশ কর্মকর্তা, জেন্ডারমেরি সদস্য ও দমকলকর্মী আহত হয়েছেন।
তিনি বলেন, আহতের সংখ্যা এখনো প্রাথমিক হিসাবের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়েছে। দায়ীদের শনাক্ত করতে তদন্ত চলছে। এ ছাড়া কয়েকশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান উল্লেখযোগ্য আর্থিক ও অবকাঠামোগত ক্ষতির শিকার হয়েছে।
ফ্রান্সের বাণিজ্য ও বিতরণ ফেডারেশনের সভাপতি এবং ক্যারেফুরের প্রধান নির্বাহী আলেক্সান্দ্র বোমপার্ড জানান, প্রায় ১ হাজার ৫০০টি খুচরা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তার অনুমান, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কয়েক শ মিলিয়ন ইউরো।
দেশজুড়ে বিক্ষোভে লাখো মানুষের অংশগ্রহণ
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, শনিবারের বিক্ষোভে সারা দেশে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ অংশ নেন। এর মধ্যে রাজধানী প্যারিসে ছিলেন ১ লাখ ১০ হাজার মানুষ। তবে আয়োজকদের দাবি, বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৮ লাখ।
ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের বিভিন্ন সংগঠন, শ্রমিক ইউনিয়ন, শিক্ষার্থী ও কৃষকেরা এই আন্দোলনে একত্রিত হন।
প্যারিসে মূল পদযাত্রা বড় ধরনের কোনো ঘটনা ছাড়াই শেষ হলেও কয়েকটি শহরে বিক্ষোভের পার্শ্ববর্তী এলাকায় সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে।
প্যারিসের বুলভার ম্যাজেন্তা সড়কে এক বিক্ষোভকারী অসুস্থ হয়ে পড়ে মারা যান। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তার হৃদ্যন্ত্র ও শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
এদিকে, সংবাদমাধ্যম লে প্যারিসিয়াঁ জানিয়েছে, সাঁ-এতিয়েন শহরে পুলিশের নিক্ষেপ করা গ্রেনেডের আঘাতে ১৭ বছর বয়সি এক কিশোরের একটি হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
প্যারিস পুলিশ এর আগে ৮৫৫ জনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছিল। অন্যদিকে, প্রসিকিউটররা পৃথকভাবে ৭২০ জনকে গ্রেফতারের তথ্য দেন। তাদের মধ্যে ৫১৭ জনকে পুলিশি হেফাজতে রাখা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গ্রেপ্তারের চূড়ান্ত হিসাব এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।
ঐতিহাসিক নগর ভবনে আগুন, বিভিন্ন শহরে লুটপাট
লিমোজ শহরে আগুনে ঐতিহাসিক নগর ভবনটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মার্সেই, লিয়োঁ ও বোর্দো শহরেও দোকানপাটে লুটপাট এবং বিভিন্ন ভবনে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।
ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা, ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ এবং প্রশাসনিক ও বিমাসংক্রান্ত প্রক্রিয়া সহজ করতে জরুরি টাস্কফোর্স গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন প্যারিসের মেয়র এমানুয়েল গ্রেগোয়ার।
সোমবার ব্যবসায়ী, বাণিজ্য চেম্বার, বিমা কোম্পানি এবং সরকারি সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকেরও ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
একটি খোলা চিঠিতে গ্রেগোয়ার লেখেন, গত শনিবার বহু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান অগ্রহণযোগ্য সহিংসতা ও লুটপাটের শিকার হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপকতা বিশাল এবং নজিরবিহীন।
তিনি আরও বলেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ডের কোনো যৌক্তিকতা থাকতে পারে না। কোনো ক্ষোভ বা দাবি—তা যতই ন্যায্য হোক না কেন— যারা কাজ করেন, উদ্যোগী হয়ে ব্যবসা পরিচালনা করেন এবং প্রতিদিন আমাদের শহরকে সচল রাখেন, তাদের ওপর হামলার অনুমতি দিতে পারে না।
সংকট মোকাবেলায় বৈঠকে বসছেন প্রধানমন্ত্রী
সহিংসতার অর্থনৈতিক প্রভাব, বিমাসংক্রান্ত বিষয় এবং বিচারিক পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করতে রোববার সন্ধ্যা ৭টায় আন্তমন্ত্রণালয় সংকট ব্যবস্থাপনা বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু। গ্রিনিচ মান সময় অনুযায়ী বৈঠকটি বিকেল ৫টায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।
এ ছাড়া পুলিশি ব্যবস্থাপনা এবং সহিংসতা মোকাবেলায় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসংখ্যা নিয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া প্যারিস, মার্সেই ও লিয়োঁর মেয়রদের সঙ্গেও বৈঠক করবেন তিনি।
ফ্রান্সের জাতীয় সংসদের নিম্নকক্ষের প্রেসিডেন্ট ইয়ায়েল ব্রাউন-পিভে একটি সংসদীয় তদন্ত কমিশন গঠনের বিষয়টি বিবেচনা করছেন। ফরাসি সংবাদমাধ্যম বিএফএমটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ বিষয়ে আলোচনার জন্য মঙ্গলবার সংসদীয় দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন তিনি।
নতুন করে বিক্ষোভের ডাক, ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ
রোববার প্যারিসসহ ফ্রান্সের অন্যান্য বড় শহরে নতুন করে বিক্ষোভের আহ্বান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
এর মধ্যে প্যারিসের প্লাস দ্য লা রিপুবলিক চত্বরে স্থানীয় সময় দুপুর ২টায় একটি সমাবেশের ডাক দেওয়া হয়েছে। এতে দোকানমালিকদের মধ্যে নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু সহিংসতার জন্য ‘চরম বামপন্থীদের’ দায়ী করেছেন। অন্যদিকে, বিরোধী রাজনৈতিক নেতারা পুলিশের কৌশল ও কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেছেন।
সবুজ রাজনৈতিক দলের নেত্রী মারিন তন্দেলিয়ে এবং আইনপ্রণেতা অ্যালেক্সি কোরবিয়ের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নুনেজের পদত্যাগ দাবি করেছেন। কট্টর ডানপন্থী ন্যাশনাল র্যালি দলও তার পদত্যাগের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ