ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে পিটিয়ে হত্যার মামলায় গ্রেফতার প্রধান আসামি ফজলুল হক আমিনী। ছবি : সময়ের আলো সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে পিটিয়ে হত্যার মামলায় গ্রেফতার প্রধান আসামি ফজলুল হক আমিনী বলেছেন, পিটিয়ে মারার উদ্দেশ্য ছিল না, দুর্ঘটনাবশত হয়ে গেছে। যে কাজটি করছি, সেটি আল্লাহ পাক ফয়সালা করবেন। আইনের দৃষ্টিতে আমি অপরাধী, তবে অনুতপ্ত নই।
সাতক্ষীরার কোর্ট ইন্সপেক্টর রোববার রাতে সময়ের আলোকে বরেন, ফজলুল হক আমিনী ১৬৪ ধারায় জবান বন্দি দেওয়ার জন্য বিচারকের রুমে রয়েছেন এখনো তিন বের হননি।
দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচ এম শাহীন জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে শামীমকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন আমিনী। তিনি আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
ওসি আরও জানান, আমিনী স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে রাজি হওয়ায় আপাতত তাকে রিমান্ডে নেওয়ার প্রয়োজন মনে করছে না পুলিশ। তবে আদালতে তার জবানবন্দি রেকর্ড হয়েছে কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ ঘটনায় অন্যদেরও গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
শুক্রবার ভোরে পুলিশ এজাহারভুক্ত ৫ ও ৬ নম্বর আসামি মোক্তার হোসেন খান (৫৩) ও আসাদুল ইসলাম মোল্যাকে (৪৬) গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠায়। আদালতের কাছে তাদের ৫ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে বলে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই আল আমিন সময়ের আলোকে নিশ্চিত করেছেন।
এর আগে শনিবার রাত ১১টার দিকে সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলার ফরিদপুর গ্রামে এক আত্মীয়ের বাড়ি থেকে প্রধান আসামি ফজলুল হক আমিনীকে (৪৫) গ্রেফতার করা হয়। রোববার বেলা ৩টায় কালিগঞ্জ উপজেলা থেকে গ্রেফতারের পর এসআরবি আমিনীকে পুলিশের নিকট হস্তান্তর করে। বিকেল ৪টায় তাকে আদালতে পাঠায় পুলিশ।
দেবহাটা সার্কেল, কালীগঞ্জ থানা, দেবহাটা থানা ও এসআরবি (স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন)-৬-এর সদস্যরা যৌথভাবে অভিযান চালিয়ে আমিনীকে গ্রেফতার করে। মঙ্গলবার দেবহাটায় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে শামীমকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। তিনি দেবহাটার সুবর্ণাবাদ গ্রামের শামছুর রহমান সানার ছেলে ।
দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচ এম শাহীন জানান, গোপন সংবাদ ও প্রযুক্তির সহায়তায় আমিনীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতারের সময় তার নিজস্ব মোবাইল সঙ্গে ছিল না। তিনি অন্য সিম ও মোবাইল ব্যবহার করছিলেন। ওই সিম ব্যবহার করে একজনের সঙ্গে নিজের পরিচয় দিয়ে কথা বলেন। ওই যোগাযোগের সূত্র ধরেই তাকে শনাক্ত করা হয়।
এ ঘটনায় শামীমের ভাই আব্দুল জলিল সানা বাদী হয়ে বৃহস্পতিবার রাতে দেবহাটা থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় ১০ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা ২০০-২৫০ জনকে আসামি করা হয়। এতে পারুলিয়ার ফজলুল হক আমিনীকে প্রধান আসামি করা হয়েছে।
শামীমের ছোট ভাই তাওসিফ রহমান বলেন, প্রধান আসামি গ্রেফতারের খবরে আমরা কিছুটা স্বস্তি পেয়েছি। মামলার অন্য আসামিদেরও গ্রেফতারের দাবি জানিয়ে তাওসিফ বলেন, ২ ও ৩ নম্বর আসামি কুলিয়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতের সভাপতি কামরুল গাজী ও সাদিকুলকে গ্রেফতার করা হলে এ ঘটনায় কারা জড়িত ছিলেন এবং কারা মূল ভূমিকা পালন করেছেন, সে বিষয়ে আরও তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ সাজা দেওয়া হোক। পাশাপাশি আমার ভাইয়ের দুই এতিম সন্তানের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে সরকার যেন তাদের পাশে দাঁড়ায়।
দেবহাটা উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ইমদাদুল হক বলেন, শামীমকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। তিনি এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বলেন, জামায়াত এ ধরনের সহিংসতা সমর্থন করে না।
নিহত শামীমের পরিবার জানায়, শামীম দীর্ঘদিন মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। ধর্ম অবমাননাকর মন্তব্য করার অভিযোগ ওঠার পর তার বাড়িতে হামলার চেষ্টা হয় এবং স্থানীয় একটি বাজারে তাকে মারধর করা হয়। পরে তিনি বিষপান করলে স্থানীয় পল্লী চিকিৎসক মো. সবুরের চেম্বারে চিকিৎসা চলাকালে পরদিন শতাধিক মানুষ সেখান থেকে বের করে মারধর করেন। পুলিশ তাকে উদ্ধার করে দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়।
দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম জানান, হাসপাতালে ভর্তির পর শতাধিক লোক ওয়ার্ডে ঢুকে শামীমকে আবার মারধর করেন। আনসার সদস্য, নিরাপত্তাকর্মী ও কর্মীরা থামাতে ব্যর্থ হন। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।
সময়ের আলো/আতা