ছবি : সংগৃহীতবুরকিনা ফাসোর কৃষকেরা ধান চাষের কাজ শুরু করেন জমিতে বীজ ফেলার অনেক আগে থেকেই। এই পুরো প্রক্রিয়ার ভিত্তি হলো বিজ্ঞান ও গবেষণা। সম্প্রতি দেশটির বিজ্ঞানীরা পারমাণবিক প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে ধানের আটটি নতুন ও উন্নত জাত উদ্ভাবন করেছেন। এই জাতগুলো থেকে দ্রুত ফসল পাওয়া যায়, ফলন হয় বেশি এবং চালের গুণগত মানও অনেক ভালো। ফলে দেশটিতে নিজের দেশের চাহিদা মিটিয়ে চাল আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানোর চমৎকার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
২০২৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে অবমুক্ত করা এই নতুন জাতগুলো প্রমাণ করেছে যে, গবেষণাগারের বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার কীভাবে কৃষকের মাঠ পেরিয়ে সাধারণ মানুষের খাবারের থালা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত 'অ্যাটমস৪ফুড' প্রকল্পের সহায়তায় এই বিশাল সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হয়েছে।
গত দশ বছরে বুরকিনা ফাসোতে চালের ব্যবহার প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। অথচ দেশটির মোট চাহিদার প্রায় অর্ধেক চালই বাইরে থেকে আমদানি করতে হয়। এই কারণে নিজেদের দেশে ধানের উৎপাদন বাড়ানো এখন জাতীয়ভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি লক্ষ্য। আর এই লক্ষ্য পূরণে দেশটির জাতীয় ধান প্রজনন কর্মসূচি দারুণ ভূমিকা রেখে চলেছে।
বুরকিনা ফাসোর বিজ্ঞানীদের সামনে কেবল বেশি ফলনশীল ধানের জাত তৈরি করাই একমাত্র চ্যালেঞ্জ ছিল না; বরং এমন জাত উদ্ভাবন করা দরকার ছিল যা স্থানীয় আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে এবং কৃষক ও ভোক্তা উভয়ের চাহিদাকে পুরোপুরি পূরণ করতে সক্ষম। এই উদ্দেশ্যে বিজ্ঞানীরা ব্যবহার করেছেন 'মিউটেশন ব্রিডিং' বা মিউটেশন প্রজনন পদ্ধতি। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রাকৃতিকভাবে জিনগত বৈচিত্র্য সৃষ্টির প্রক্রিয়াটিকে দ্রুততর করা হয়। এরপর বিজ্ঞানীরা নিজেদের পছন্দমতো বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন গাছ বেছে নিয়ে ধানের নতুন ধারা বা লাইন তৈরি করেন।
আইএইএ-র কারিগরি সহযোগিতার কারণে দেশটির বিজ্ঞানীরা এই প্রযুক্তির ব্যবহার সম্পর্কে গভীর প্রশিক্ষণ ও বিশেষজ্ঞ পরামর্শ পাওয়ার সুযোগ পান। পাশাপাশি সম্ভাবনাময় ধানের লাইনগুলোর উন্নয়ন ও মাঠে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে এই সহায়তা দারুণভাবে সাহায্য করেছে।
এই যৌথ উদ্যোগের সুবাদেই ধানের আটটি নতুন জাত বাজারে আনা সম্ভব হয়েছে, যেগুলোতে মাঠ থেকে শুরু করে রান্নার পর থালায় আসা পর্যন্ত সব ধাপেই চমৎকার সব বৈশিষ্ট্যের সমন্বয় রয়েছে। নতুন উদ্ভাবিত এই জাতগুলোর হেক্টরপ্রতি ফলন পাওয়া যাচ্ছে ৯ থেকে ১১ টন। এগুলো পরিপক্ব হতে সময় লাগে মাত্র ৯৫ থেকে ১০৬ দিন। অন্যদিকে, বুরকিনা ফাসোর প্রচলিত বা ঐতিহ্যবাহী জাতগুলোর হেক্টরপ্রতি ফলন সাধারণত ৪ থেকে ৬ টনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে এবং সেগুলোর চাষ করতে অনেক বেশি সময়ও লাগে।
তবে বিজ্ঞানীরা কেবল বেশি ধান উৎপাদনের কথাই ভাবেননি, সাধারণ মানুষের পছন্দ ও চাহিদাকেও সমান গুরুত্ব দিয়েছেন। নতুন জাতগুলোর মধ্যে দুটি বড় দানার চাল, দুটি রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ বা প্রতিরোধী শ্বেতসারসমৃদ্ধ এবং একটি মোমের মতো আঠালো বৈশিষ্ট্যের চাল রয়েছে।
জোসেফ কিয়েরি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ইমায়েল অঁরি নেস্তর বাসোলে এই বিষয়ে বলেন, এই অর্জনের বড়ত্ব কেবল আটটি নতুন জাত উদ্ভাবনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অ্যাটমস৪ফুড প্রকল্পের মাধ্যমে আইএইএ ও এফএওর সহযোগিতায় বুরকিনা ফাসোয় আমাদের বৈজ্ঞানিক গবেষণা সক্ষমতা অনেক বেড়েছে। এর ফলে জলবায়ু ও চাষের পরিবর্তিত পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে কৃষক ও ভোক্তাদের চাহিদামাফিক ফসলের জাত উদ্ভাবন ভবিষ্যতেও চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।
ধানের একটি ভালো লাইন বা জাত আবিষ্কার করাই কাজের শেষ ধাপ নয়। কৃষকের কাছে তা পৌঁছে দেওয়ার আগে স্থানীয় মাটিতে তার কার্যকারিতা যাচাই করতে হয়, কৃষক ও ভোক্তাদের মতামত নিয়ে মূল্যায়ন করতে হয় এবং সরকারিভাবে নিবন্ধন করাতে হয়। বুরকিনা ফাসোতে মিউটেশন প্রজনন পদ্ধতির ওপর দক্ষতা বাড়ায় গবেষকেরা এই পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সফলভাবে সম্পন্ন করতে পেরেছেন। যার মধ্যে ছিল গবেষণাগারে নতুন জাত উদ্ভাবন, মাঠে পরীক্ষা চালানো এবং অবশেষে তা আনুষ্ঠানিকভাবে অবমুক্ত করা।
পূর্বের এই সফলতার ধারা ধরে রেখে আইএইএ ও এফএওর যৌথ সহায়তায় জাত নিবন্ধনের কাজ, বামা ও বানজোনে প্রদর্শনী খামার স্থাপন এবং ভবিষ্যতে আরও উন্নত জাত নিয়ে কাজ করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। নতুন অবমুক্ত জাতগুলোতে যে ভালো বৈশিষ্ট্যগুলো পাওয়া গেছে, সেগুলোকে কাজে লাগিয়ে আগামী দিনে আরও উন্নত জাতের ধান উদ্ভাবন করাই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য।
২০২৫ সালের জুনে উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে উদ্ভাবিত ১১টি সম্ভাবনাময় ধানের লাইনের মধ্য থেকে আটটিকে বুরকিনা ফাসোর উদ্ভিদ প্রজাতি ও জাতের জাতীয় তালিকায় আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধন দেওয়া হয়। দেশটির ধান গবেষণা ও কৃষি খাতের ইতিহাসে এটি একটি বিরাট মাইলফলক।
এই নতুন জাতগুলোর সরকারি অনুমোদন পাওয়ার পর এখন বীজ উৎপাদন বহুগুণ বাড়িয়ে তা আরও বেশি কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজ চলছে। বিভিন্ন প্রদর্শনী খামারে স্থানীয় আবহাওয়ায় এসব জাতের কার্যকারিতা হাতে-কলমে যাচাই করা হচ্ছে। এভাবেই গবেষণার উদ্ভাবনগুলোকে বাস্তবে মাঠের উৎপাদনে রূপ দেওয়ার কাজ এগিয়ে চলেছে।
খাদ্য ও কৃষিতে পারমাণবিক প্রযুক্তির ব্যবহারবিষয়ক যৌথ এফএও-আইএইএ কেন্দ্রের পরিচালক দংশিন ফেং জানান, বুরকিনা ফাসোর এই অগ্রগতি প্রমাণ করে যে খাদ্য নিরাপত্তার বড়-বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এবং নিজেদের গবেষণা শক্তি বাড়াতে পারমাণবিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কতটা কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে। অ্যাটমস৪ফুড প্রকল্পের আওতায় তারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কাজ করে চলেছেন, যাতে এই সাফল্যের পথ ধরে কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থার প্রতিটি ক্ষেত্রে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা যায়।
উল্লেখ্য, বুরকিনা ফাসোতে ২০২৫ সালের মে মাসে অ্যাটমস৪ফুড প্রকল্পের আওতায় প্রথম যৌথ মূল্যায়ন মিশন সম্পন্ন হয়। সেই মিশনেই ভবিষ্যতের সহায়তার জন্য কোন কোন ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত, তা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
সময়ের আলো/আতা