ছবি : সংগৃহীত সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে ছেলে নজরুল ইসলামের সঙ্গে শেষবার ফোনে কথা হয়েছিল বাবা আবদুল বাছিরের। সেদিন ছেলে শুধু জানিয়েছিল, সে সমস্যার মধ্যে রয়েছে। কী ধরনের সমস্যায় পড়েছে, তা বিস্তারিত বলেনি। এরপর কয়েক দিন কেটে যায়। পরে গণমাধ্যমের খবর থেকে বাবা জানতে পারেন, তার ছেলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। এই খবরে শোকের ছায়া নেমে এসেছে পুরো পরিবারে।
ছেলেকে হারিয়ে শোকাহত আবদুল বাছিরের এখন একটাই দাবি—নজরুলের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা হোক। পাশাপাশি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে নজরুল আইনি সহায়তা পেয়েছিলেন কি না এবং বাংলাদেশ কনস্যুলেট তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন পরিবারের সদস্যরা।
নজরুল ইসলামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সুলতানপুর ইউনিয়নের বিরামপুর গ্রামে। তিনি ওই গ্রামের আবদুল বাছির ও রেহেনা বেগম দম্পতির চার সন্তানের মধ্যে সবার বড়। পরিবারের আর্থিক সংকট দূর করার আশায় ২০২২ সালে সাত লাখ টাকা ঋণ করে তাকে সৌদি আরবে পাঠানো হয়েছিল।
পরিবারের ভাষ্য, সৌদি আরবে যাওয়ার এক মাস পর মক্কার পবিত্র মসজিদুল হারামে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ পান নজরুল। তবে সাত-আট মাস পর থেকে পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। পরে কারাগার থেকে ফোন করে তিনি জানান, বন্দি রয়েছেন। কিন্তু কী অভিযোগে তাকে আটক করা হয়েছে, সে বিষয়ে পরিবারকে বিস্তারিত কিছু জানাননি।
নজরুলের বাবা আবদুল বাছির বলেন, ‘প্রায় তিন বছর তিন মাস ধরে আমার ছেলে কারাগারে ছিল। গত রোববার সে আমাকে ফোন দিয়েছিল। বলেছিল, সে সমস্যার মধ্যে রয়েছে। এটাই ছিল তার সঙ্গে আমার শেষ কথা। এরপর গত বুধবার জানতে পারি, আমার ছেলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।’
আবদুল বাছিরের অভিযোগ, কারাগারে থাকার সময় ছেলেকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, বাংলাদেশ কনস্যুলেটের কেউ তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন কি না। জবাবে নজরুল জানিয়েছিলেন, কেউ যোগাযোগ করেননি।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে নজরুল আইনজীবীর সহায়তা পেয়েছিলেন কি না, কিংবা আত্মপক্ষ সমর্থনের যথাযথ সুযোগ পেয়েছিলেন কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তার বাবা।
তিনি বলেন, ‘প্রতিটি দেশের কনস্যুলেট কারাগারে থাকা নিজ দেশের নাগরিকদের খোঁজখবর নেয়। অথচ আমাদের দেশের কনস্যুলেট থেকে আমার ছেলের কোনো খোঁজ নেওয়া হয়নি বলে সে জানিয়েছিল। আমার ছেলের মতো আর কেউ যেন এভাবে মারা না যায়। বিদেশে কারাগারে থাকা বাংলাদেশিদের খোঁজখবর নেওয়ার ব্যবস্থা করা হোক।’
পরিবারের দাবি, নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে আগে থেকে তাদের কিছুই জানানো হয়নি। গণমাধ্যমের খবর থেকেই তাঁরা বিষয়টি জানতে পারেন। তাই মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে কনস্যুলেটের ভূমিকা এবং নজরুলের আইনি সহায়তা পাওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট করার দাবি জানিয়েছেন স্বজনেরা।
ছেলেকে হারিয়ে শোকের পাশাপাশি আর্থিক সংকটেও পড়েছেন আবদুল বাছির। পরিবারের সচ্ছলতার আশায় নজরুলকে সৌদি আরবে পাঠাতে যে সাত লাখ টাকা ঋণ করেছিলেন, সেই ঋণের বোঝা এখনো তাদের ওপর রয়েছে।
আবদুল বাছির বলেন, ‘আমার ছেলে গেল, সব হারিয়ে আমি এখন নিঃস্ব। সরকারের কাছে দাবি জানাই, আমার ছেলের মরদেহ যেন দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।’
এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ জানান, নজরুলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। মরদেহ দেশে ফিরলে ভুক্তভোগী পরিবারকে সহায়তা করা হবে।
ছেলেকে হারানোর শোক আর অনিশ্চয়তার মধ্যে এখন নজরুলের মরদেহ দেশে ফেরার অপেক্ষায় দিন কাটছে পরিবারের সদস্যদের। তাদের প্রত্যাশা, দ্রুত মরদেহ দেশে এনে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা করা হবে।
সময়ের আলো/এসএকে