ছেঁউড়িয়ার বাইরে লালনচর্চার নতুন ঠিকানা ধরলা-ব্রহ্মপুত্র-তিস্তার পাড়

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি

সারাদেশ

লালন স্মরণোৎসব ঘিরে কুষ্টিয়ায় যখন ভক্ত-সাধুদের সমাগম, তখন উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত গ্রামে শিশুদের কণ্ঠে ছড়িয়ে পড়ছে তার মানবতার গান। কুড়িগ্রাম ও

2026-10-19T18:31:43+00:00
2026-10-19T18:31:43+00:00
 
  সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬,
৩ কার্তিক ১৪৩৩
সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬
সারাদেশ
ছেঁউড়িয়ার বাইরে লালনচর্চার নতুন ঠিকানা ধরলা-ব্রহ্মপুত্র-তিস্তার পাড়
কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি
প্রকাশ: সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:৩১ পিএম 
ছেঁউড়িয়ার বাইরে লালনচর্চার নতুন ঠিকানা ধরলা-ব্রহ্মপুত্র-তিস্তার পাড়। ছবি : সময়ের আলো
লালন স্মরণোৎসব ঘিরে কুষ্টিয়ায় যখন ভক্ত-সাধুদের সমাগম, তখন উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত গ্রামে শিশুদের কণ্ঠে ছড়িয়ে পড়ছে তার মানবতার গান। কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটে নয়টি গুরুগৃহ গড়ে তুলেছে লোকসংস্কৃতি চর্চার নতুন পরিসর।

কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে লালনভক্তদের মিলনমেলা। গান, সাধুসঙ্গ আর স্মরণে উদ্‌যাপিত হচ্ছে মরমি সাধক ফকির লালন শাহের ১৩৬ তম তিরোধান দিবস। কিন্তু লালনচর্চা এখন আর ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে সীমাবদ্ধ নেই। ধরলা, ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তা অববাহিকার প্রত্যন্ত জনপদেও তার গান ছড়িয়ে দিচ্ছে নতুন প্রজন্ম। কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটের গ্রামে গ্রামে শিশুদের কণ্ঠে বেঁচে উঠছে লালনের সাম্য, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িকতার দর্শন।

কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের সিংহীমারী গ্রামের সেবালয় গুরুগৃহে দেখা যায়, একতারা-দোতরা হাতে লালনগীতি অনুশীলন করছে শিশুরা। গানের সুরের সঙ্গে তারা শিখছে গানের অন্তর্নিহিত দর্শনও। 

গুরুগৃহের প্রধানতম গুরু নারায়ণ রায় বলেন, লোকগানের নিয়মিত চর্চা শিশুদের নিজস্ব সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত রাখে। গানের কথা ও অর্থ বুঝিয়ে শেখালে সংগীতের পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধও গড়ে ওঠে।

একই চিত্র সাহসালয়, মায়ালয়, সান্ত্বনালয়, সুরালয়, সহজালয়, কর্মলয়, স্মৃতিলয় কিংবা আপনালয় গুরুগৃহে। শিশুরা শিখছে লোকগান আর লোক বাদ্যযন্ত্র। বিদ্যালয়ের পড়াশোনার পাশাপাশি তারা চর্চা করছে লালন, বাউল, মুর্শিদি, মারফতি ও ভাওয়াইয়া গান। সাথে বেহালা, একতারা, দোতরা, সারিন্দা, তবলা, বাঁশি, খমোকের মতন লোক বাদ্যযন্ত্র।

এই উদ্যোগের নাম ‘মায়ের তরী’। নরওয়ের কবি, লেখক ও লোকগবেষক উয়েরা সেথের দীর্ঘদিনের লোকসংস্কৃতিচর্চা এবং প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রামের অভিজ্ঞতা থেকে ২০১৬ সালে স্থানীয় শিল্পী ও সংগঠকদের নিয়ে গড়ে তোলেন সংগঠনটি। বাংলার লোকসংগীতের প্রতি গভীর অনুরাগ থেকে তিনি লালনের ৫৩টি গান নরওয়েজীয় ভাষায় অনুবাদ করে বই প্রকাশ করেছেন।

মায়ের তরীর নির্বাহী পরিচালক সুজন কুমার বেদ বলেন, সংগঠনটির লক্ষ্য লোকসংগীতের মধ্য দিয়ে শিশুদের মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা এবং হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা। বর্তমানে কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটের নয়টি গুরুগৃহে চলছে লোকগান ও লোকবাদ্যযন্ত্রের চর্চা।

মায়ের তরীর অন্যতম সংগঠক ইউসুফ আলমগীর বলেন, লালনের দর্শনকে ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়ির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে তার মানবিক বাণীর পূর্ণ বিস্তার ঘটে না। নদীভাঙন ও বন্যায় বিপর্যস্ত জনপদের শিশুদের কণ্ঠে সেই গান পৌঁছে দেওয়া মানে লালনের দর্শনকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

কুড়িগ্রাম লালন অ্যাকাডেমির সাধারণ সম্পাদক শিবলী সাদিক আতিকের মতে, লালনের গান কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চল বা সম্প্রদায়ের সম্পদ নয়; এটি বাঙালির মানবিক চেতনার গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য। 

কুড়িগ্রাম প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মাহফুজার রহমান টিউটরও মনে করেন, প্রান্তিক জনপদে লোকসংস্কৃতির এমন চর্চা জাতীয় পর্যায়ে ঐতিহ্য সংরক্ষণের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, মায়ের তরী লোকসংগীতের মধ্য দিয়ে শিশুদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ জাগিয়ে তুলে লোকঐতিহ্যকে জীবন্ত রেখে তা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। সেই লক্ষ্যেই ভবিষ্যতে লোকশিল্পীদের জন্য আনন্দাশ্রম বা আনন্দলয়, হারিয়ে যাওয়া গান ও শিল্পীদের জীবনকথা সংরক্ষণে ডিজিটাল আর্কাইভ এবং একটি লোকসংগীত ইনস্টিটিউট গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

ছেঁউড়িয়ায় লালন স্মরণোৎসব তার সাধনা ও দর্শনকে স্মরণ করার ঐতিহ্যবাহী আয়োজন। আর ধরলা-ব্রহ্মপুত্র-তিস্তার পাড়ে মায়ের তরীর গুরুগৃহগুলো সেই দর্শনকে নতুন প্রজন্মের চর্চায় বাঁচিয়ে রাখছে। আখড়াবাড়ি থেকে নদীঘেরা জনপদে লালনের মানবতার গান এভাবেই খুঁজে নিচ্ছে নতুন ঠিকানা।

সময়ের আলো/আতা
  বিষয়:   লালন স্মরণোৎসব  কুষ্টিয়া  ভক্ত  সাধু  সমাগম  উত্তরাঞ্চল  শিশু  কণ্ঠ  কুড়িগ্রাম  লালমনিরহাট  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: