প্রধানমন্ত্রীর রাজশাহী সফর ঘিরে চলছে কর্মযজ্ঞ। ছবি : সংগৃহীত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাজশাহী সফরে আসছেন। এর আগে গেল আট মাস আগে নির্বাচনি প্রচারণায় এসেছিলেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে রাজশাহী মহানগর বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা উজ্জীবিত ও উচ্ছ্বসিত। নগরীতে উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে। কিছু প্রকল্প সরকারের অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। প্রধানমন্ত্রীর আগমনে রাজশাহীর উন্নয়ন-অগ্রযাত্রা আরও বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করছেন জনপ্রতিনিধিরা। তবে নগরীর বাসিন্দারা কী ভাবছেন। প্রধানমন্ত্রীর কাছে নগরবাসীর প্রত্যাশা কী।
রাজশাহীর উন্নয়ন ঘিরে স্থানীয়দের প্রত্যাশার তালিকাও দীর্ঘ। বন্ধ ও রুগ্ণ চিনিকলগুলোকে কেন্দ্র করে নতুন সম্ভাবনা তৈরি, কৃষিভিত্তিক শিল্প স্থাপন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, পদ্মা নদীকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণ, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এবং তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে। বিএনপির নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা, প্রধান মন্ত্রীর এই সফর রাজশাহীর উন্নয়নে নতুন গতি সঞ্চার করবে। দীর্ঘদিনের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে উত্তরাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ এই শহরকে শিল্প, বাণিজ্য, কৃষি ও পর্যটনের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে আশা করছেন তারা।
শিক্ষক লুৎফর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রী রাজশাহী আসছেন এতে আমরা খুব খুশি। শিক্ষানগরী বা রাজশাহীতে শিক্ষার পরিবেশটা অনেক উন্নত। আমি গভীরভাবে একজন শিক্ষক হয়ে শিক্ষার ব্যাপারটাই দেব। শিক্ষার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী যেন সুদৃষ্টি দেন। শিক্ষার পরিবেশ মান এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর মানোন্নয়নের ক্ষেত্রে মনোনিবেশ করেন এটাই আমার প্রত্যাশা।
বেসরকারি চাকরিজীবী জুবায়ের আহমেদ বলেন, আমাদের দেশের বেকার সংখ্যা অনেক। রাজশাহীতে বেকার সংখ্যা দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাও অনেকে বিকল্প কর্মের অনেকে আছেন। প্রধানমন্ত্রীর কাছে নিবেদন, বেকারত্বটা কীভাবে দূর করা যায় তিনি যেন একটু বিবেচনা করে দেখেন। আমরা যারা বেসরকারি চাকরি করি সরকারি যে সুবিধা বা পে স্কেল পাচ্ছে আমাদেরও এরকম একটি বেতন কাঠামো ঘোষণা করা হোক।
আসমাউল হুসনা নামের এক গৃহবধূ বলেন, রাজশাহীকে শিক্ষানগরী বলা হয়। বর্তমানে রাজশাহীর সবকিছু সুন্দর। কিন্তু কর্মসংস্থান নাই। এখানে বেকার যুবকরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। কেউ অনেক শিক্ষিত হয়ে বাদাম বিক্রি করছে কেউ হয়ত দেখা যায় নিরাপত্তা প্রহরীর চাকরি নিচ্ছে। এটা খুবই খারাপ। কিন্তু এখানে যদি কোনো ভালো মানে চাকরির সুযোগ থাকতো বা বড় বড় কারখানা থাকতো তাইলে অবশ্যই মানুষ চাকরির সুযোগটা পেত।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান বলেন, রাজশাহীতে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই আছে। এখন এখানে সরকারিভাবে কোনো হোস্টেল চালু করা হয় তাহলে আমাদের মতো শিক্ষার্থীদের জন্য ভালো হবে। মেসের চেয়ে হোস্টেলে শিক্ষার্থীরা নিরাপদ থাকবে বেশি। তাহলে খরচও অনেক কমে আসবে।
আব্দুল আলিম নামের এক ব্যবসায়ী বলেন, রাজশাহী উন্নয়নের জন্য কর্মসংস্থান জরুরি। মানুষ যেন কর্ম করে খেতে পারে। মেয়েরাও নিজ এলাকায় থেকে কর্মসংস্থান চায়। রাজশাহীর নাগরিক হিসেবে বলতে চাই, আমাদের এই বিভাগকে এগিয়ে নিতে হলে আমাদের শিল্প কারখানার প্রয়োজন। কর্মসংস্থান হলে রাজশাহী বিভাগ এগিয়ে যাবে।
রাসিক প্রশাসক ও নগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো সরকারপ্রধান ঢাকার বাইরে শারদীয় দুর্গোৎসব পরিদর্শনের উদ্দেশ্যে রাজশাহীতে আসছেন। প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে দলীয় নেতাকর্মীদের পাশাপাশি মহানগরবাসীর মধ্যেও ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে। রাজশাহীতেও বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিমান চত্বর থেকে কাশিয়াডাঙ্গা পর্যন্ত চার লেনের সড়ক নির্মাণ, কুমারপাড়া গুলগফুর পেট্রোল পাম্প থেকে বড়কুঠি হয়ে বরেন্দ্র জাদুঘর হয়ে ফায়ার ব্রিগেড মোড় পর্যন্ত সড়ক উন্নয়ন ও প্রশস্তকরণ, নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডে খেলার মাঠের উন্নয়ন ও ফুটসাল গ্রাউন্ড নির্মাণ এবং সিনিয়র সিটিজেন পার্ক নির্মাণসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প।
রাজশাহী জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও চারঘাট-বাঘা আসনের সংসদ সদস্য আবু সাঈদ চাঁদ বলেন, রাজশাহীকে নিয়ে আগে ষড়যন্ত্র হয়েছিল। কলকারখানাগুলোকে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। সে কলকারখানাগুলোকে আবারও চালুর চেষ্টা চলছে। কিছু কলকারখানা প্রাইভেটে দেওয়া হয়েছে। এতে সচল হচ্ছে রাজশাহীর অর্থনীতি। আগামী এক বছরের মধ্যে সকল কলকারখানাগুলো পুরোদমে চালু করা হবে।
তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের দাবি থাকবে যে রাজশাহী একটা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় হয়। রাজশাহী ও আশেপাশের জেলাগুলোতে সবাই কৃষকের সন্তান। আগামী দিনে আমাদের চাষাবাদ করে জীবন চালাতে হবে। এই অঞ্চলে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় হলে আমাদের লাভ হবে। এই মাঠে প্রধানমন্ত্রী আখচাষিদের প্রণোদনা দেবেন।
রাজশাহীতে সফরের মধ্য দিয়ে শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শুভেচ্ছা জানাতে আগামী ২০ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান জনসভায় বক্তব্য দেবেন। ওইদিন বেলা ৩টায় নগরের ঐতিহাসিক মাদরাসা মাঠে এ জনসভা হবে। জনসভা ঘিরে মাদরাসা মাঠ প্রস্তুত, মঞ্চ নির্মাণ, পরিচ্ছন্নতা, সৌন্দর্যবর্ধন ও মাঠসংলগ্ন সড়ক সংস্কারসহ নানা কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ শাহীন শওকত বলেন, রাজশাহীর মানুষের প্রত্যাশা অনেক। এ অঞ্চলের কৃষি, শিল্প, শিক্ষা ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রীর সফরে রাজশাহীর সম্ভাবনা ও সমস্যাগুলো তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে। স্থানীয় মানুষের চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে রাজশাহী আরও এগিয়ে যাবে।
রাজশাহী-৩ আসনের সংসদ সদস্য শফিকুল হক মিলন বলেন, রাজশাহীর উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। কৃষিপ্রধান এই অঞ্চলে কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলা, তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং এলাকার অবকাঠামোগত উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। প্রধানমন্ত্রীর সফরের মধ্য দিয়ে রাজশাহীর মানুষের প্রত্যাশা পূরণে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে নগরজুড়ে চলছে প্রস্তুতি। জনসভাস্থল ঐতিহাসিক মাদ্রাসা মাঠ ও আশপাশের এলাকায় সাজসজ্জা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। দলীয় নেতাকর্মীদের পাশাপাশি প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও ব্যস্ত সময় পার করছেন।
প্রধানমন্ত্রীর সফরে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে রাজশাহীর চিনিশিল্প ও আখচাষিদের ভবিষ্যৎ। একসময় আখ উৎপাদন ও চিনিকলকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলের বহু মানুষের জীবিকা গড়ে উঠলেও বর্তমানে চিনিশিল্পের সংকট কৃষক ও সংশ্লিষ্ট শ্রমজীবীদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এ পরিস্থিতিতে আখচাষিদের প্রণোদনা দেওয়ার সম্ভাব্য উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের প্রত্যাশা, শুধু প্রণোদনা নয়, চিনিশিল্পের আধুনিকায়ন, আখের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং কৃষকদের উৎপাদনে উৎসাহিত করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও নেওয়া হবে।
সফরসূচি অনুযায়ী, ২০ অক্টোবর সামরিক বাহিনীর একটি বিমানে রাজশাহীতে আসবেন প্রধানমন্ত্রী। দুপুর দেড়টায় রাজশাহী ধর্মসভা মন্দিরের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করবেন। এরপর বিকাল ৩টায় ঐতিহাসিক মাদরাসা মাঠে আয়োজিত জনসভায় যোগ দেবেন।
এর আগে ওইদিন সকালে সৈয়দপুর বিমানবন্দর হয়ে রংপুরে যাবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে রংপুর ধর্মসভা (রাধা গোবিন্দ মন্দির) পরিদর্শন করবেন তিনি। রাজশাহী সফর শেষে বিকেলে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা হবেন। সেখানে জে এম সেন হলের রহমতগঞ্জ পূজামণ্ডপ পরিদর্শন শেষে ঢাকায় ফিরবেন তিনি। একদিনে দেশের তিন বিভাগ সফরের মধ্য দিয়ে শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শুভেচ্ছা জানাবেন প্রধানমন্ত্রী।
সময়ের আলো/আতা