স্ত্রী ও একমাত্র সন্তানের সাথে নূর আলম। ছবি : সংগৃহীতকক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেক সৈকত সংলগ্ন টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে স্ত্রী, একমাত্র সন্তান, শ্যালক ও তিন শ্যালিকাকে হারিয়েছেন বরিশালের উজিরপুর উপজেলার বড়াকোঠা ইউনিয়নের গাজিরপাড় গ্রামের নূর আলম।
অফিসের জরুরি কাজে একদিন আগে কক্সবাজার থেকে চুয়াডাঙ্গায় ফিরে আসায় প্রাণে বেঁচে গেলেও মুহূর্তেই নূর আলমের জীবনে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। তিনি বেসরকারি ওষুধ কোম্পানি ড্রাগ ইন্টারন্যাশনালের জ্যেষ্ঠ বিপণন কর্মকর্তা হিসেবে চুয়াডাঙ্গায় কর্মরত রয়েছেন। চাকরির সুবাদে প্রায় আট বছর ধরে তিনি চুয়াডাঙ্গা শহরের দক্ষিণ হাসপাতালপাড়ায় স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে ভাড়া বাসায় বসবাস করছিলেন।
নূর আলমের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, তার (নূর আলম) স্ত্রী ফারিয়া কবির (৩৩) বেশ কিছুদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। অসুস্থতার মধ্যেও পরিবারের সদস্যদের সাথে কিছুটা সময় কাটাতে তারা কক্সবাজারে বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। বুধবার (১৪ অক্টোবর) স্ত্রী ফারিয়া কবির ও পাঁচ বছর বয়সের একমাত্র ছেলে ফাইজান নূরকে নিয়ে চুয়াডাঙ্গা থেকে ঢাকায় যান নূর আলম। পরেরদিন বৃহস্পতিবার শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের সাথে তারা কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন।
কক্সবাজারে পৌঁছানোর পর অফিসের জরুরি কাজ থাকায় শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) নূর আলম একাই চুয়াডাঙ্গায় ফিরে আসেন। কিন্তু পরেরদিন শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকালে গণমাধ্যমে কক্সবাজারের ইনানীর টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের খবর দেখে তিনি স্বজনদের খোঁজ নিতে শুরু করেন। একপর্যায়ে জানতে পারেন ভয়াবহ ওই অগ্নিকাণ্ডে নিহত ছয়জনই তার পরিবারের সদস্য।
নিহতরা হলেন-নূর আলমের স্ত্রী ফারিয়া কবির (৩৩), তাদের পাঁচ বছর বয়সের ছেলে ফাইজান নূর, শ্যালক নাসির উদ্দিন (২৫) এবং তিন শ্যালিকা ইসরাত জাহান মালিহা (৩০), লায়লা জাহান নাবিলা (২৭) ও মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩)। এ ঘটনায় আরও কয়েকজন হতাহত হয়েছেন।
শনিবার সকাল সাড়ে সাতটার দিকে কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার ইনানীর পাটুয়ারটেক সৈকত সংলগ্ন টুপটুপ রিসোর্টে আগুনের সূত্রপাত ঘটে। ফায়ার সার্ভিসের তথ্যানুযায়ী, অগ্নিকাণ্ডে মোট ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় ছয়জন দগ্ধ হয়ে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
দগ্ধদের মধ্যে মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক শিহাব উদ্দীন ও তার স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান, ইসমাইল হোসেন মাসুদ ও তার স্ত্রী মেহেরুন নেছা, মান্নান এবং সামিদা রয়েছেন। ইসমাইল হোসেন ও তার স্ত্রী মেহেরুন নেছা নিহত ফারিয়া কবিরের মামা-মামি। তাদের বাড়ি চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার দক্ষিণ ঠেটালিয়া গ্রামে।
নূর আলমের বাবা মোহাম্মদ আলী রাঢ়ী জানিয়েছেন, ছেলে নূর আলম বিয়ে করার পর স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে কখনোই তাদের উজিরপুরের গ্রামের বাড়িতে আসেননি। নূর আলমের শ্বশুরবাড়ি পটুয়াখালীর তালতলীতে হলেও তারা ঢাকার বনশ্রী এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করেন।
মোহাম্মদ আলী রাঢ়ী বলেন, পুত্রবধূ, নাতি এবং ছেলের শ্যালক-শ্যালিকাসহ পরিবারের ছয়জনকে হারানোর খবর তাদের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক। সবার লাশ ঢাকায় দাফন করার বিষয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে প্রাথমিকভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
একসাথে স্ত্রী, একমাত্র সন্তান, শ্যালক ও তিন শ্যালিকাকে হারিয়ে নূর আলম এখন বাগরুদ্ধ। কারো সাথে তেমন কোনো কথা বলছেন না। যে ভ্রমণ ছিল পরিবারের সাথে আনন্দঘন সময় কাটানোর আয়োজন, সেটিই এখন পরিণত হয়েছে জীবনের সবচেয়ে বড় শোকে। অফিসের জরুরি কাজে একদিন আগে কক্সবাজার থেকে ফিরে আসায় নূর আলম প্রাণে বেঁচে গেলেও হারিয়েছেন তার সবচেয়ে কাছের ছয়জন মানুষকে। স্বজনদের সাথে ক্যামেরাবন্দি করা ছবিগুলো এখন তার কাছে শুধুই স্মৃতি।
সময়ের আলো/আতা