প্রতীকী ছবিদেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে অস্বাভাবিক। আয় বাড়েনি, অথচ নানা কারণে খরচ বেড়েছে দ্বিগুণ। মূলত, মানুষের আয় এক জায়গায় আটকে আছে কিন্তু খাদ্য, বাসা ভাড়া, গ্যাস, যাতায়াত, শিক্ষা—সব খরচ একসঙ্গে বেড়েছে। তাই মধ্যবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্ত সাধারণ মানুষকে সংসার চালাতে সঞ্চয়ে হাত দিতে হচ্ছে, অর্থাৎ অনেকেই এখন সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছে। এ পরিস্থিতি শহর থেকে গ্রাম— সব পর্যায়েই পড়েছে। গ্রামের অনেক মধ্যবিত্ত পরিবার গরু-ছাগল বিক্রি করছে সংসারের খরচ মেটাতে। আবার গ্রাম থেকে শহর— সব পর্যায়ের অনেক পরিবারকে ঋণ করে সংসার চালাতে হচ্ছে। মূলত সাধারণ মানুষ সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে, কয়েক দফা জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাবসহ আরও কিছু কারণে।
এক গবেষণায় বলা হয়েছে— গত ৩ বছরে চাল, ডাল, তেলের দাম বেড়েছে ৪০-৬০ শতাংশ, কিন্তু বেসরকারি চাকরি, গার্মেন্টস, নির্মাণ খাতে মজুরি বেড়েছে মাত্র ১৫-২০ শতাংশ। বিবিএসের তথ্য বলছে, প্রকৃত মজুরি (মূল্যস্ফীতি বাদ দিয়ে) কমেছে ৩ শতাংশ। ফলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সরাসরি কমেছে। এলপিজির সংকট ও দাম বৃদ্ধির প্রভাবও বেশ খানিকটা আছে। ২০০৮ সাল থেকে পাইপলাইনে গ্যাস সংযোগ বন্ধ, এখন ৪ কোটি পরিবার এলপিজিনির্ভর। ১২ কেজি সিলিন্ডার সরকার নির্ধারিত ১৮৩৭ টাকা হলেও বাজারে ২৪০০-২৫০০ টাকা। ৮ মাসে দাম বেড়েছে ৬০ শতাংশ। অর্থাৎ একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের আয়ের ১০ শতাংশ শুধু গ্যাসে চলে যাচ্ছে। বেশি গ্যাস লাগে বলে মানুষ ডাল, মাংস, ছোলা রান্না কমিয়ে দিয়েছে, ফলে পুষ্টিও কমছে।
এসব কারণে মাসিক আয়ে সংসার না চলায় সাধারণ মানুষ সঞ্চয় ভাঙছে। আবার যাদের সঞ্চয় শেষ তারা ধারকর্য বা ঋণ করে সংসার চালাচ্ছে। গত ৮ মাসে ব্যাংক থেকে ৪৫ হাজার কোটি টাকা বেশি তোলা হয়েছে। মানুষ এখন টাকা জমা দেওয়ার চেয়ে বেশি তুলছে। পরিবারগুলো এখন সঞ্চয় ভেঙে বা ঋণ করে চলছে, এফডিআর ভাঙছে নিম্ন-মধ্যবিত্ত।
অপরদিকে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের কাজ কমে যাওয়ায় সংকট আরও বেড়েছে। নির্মাণ শিল্প, রিয়েল এস্টেট, ইটভাটা, ক্ষুদ্র ব্যবসায় কাজ কমেছে ৩০ শতাংশ। ওভারটাইম, বোনাস বন্ধ, অনেক প্রতিষ্ঠানে। অনেক প্রতিষ্ঠান বেতন বাড়ায়নি ২ থেকে ৫ বছরে। আবার অনেকে চাকরিহারা হয়েছেন। ফলে বেকারত্ব বাড়ছে এবং ছদ্ম-বেকারত্ব অনেক বেশি এখন। আবার আয় কমে যাওয়ায় পুষ্টিকর খাবার বাদ দিতে হচ্ছে অনেক পরিবারকে। গার্মেন্টস শিল্পে কর্মরত শ্রমিক পরিবারগুলোকে আরও বেশি কষ্ট করে সংসার চালাতে হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত থেকে একেবারে খেটে খাওয়া মানুষের কষ্টের মাত্রা যে বেড়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ একদিকে তাদের আয় কমেছে, অন্যদিকে ব্যয় বেড়েছে সব দিক থেকে। তাই বাধ্য হচ্ছে তারা সঞ্চয় ভেঙে খেতে।
এ বিষয়ে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, ‘দেশের সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো গত তিন-চার বছর ধরেই বহু কষ্টের মধ্য দিয়ে দিন পার করছে। কারণ বিগত সরকারের আমলেই খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১৩ থেকে ১৪ শতাংশের কাছে চলে গিয়েছিল। চাল, ডাল, তেল, চিনি থেকে শুরু করে মাছ-মাংস ও সবজি— এমন কোনো পণ্য নেই যার দাম বাড়েনি। এই পণ্যমূল্য বৃদ্ধির হার এখনও ঊর্ধ্বমুখী। বর্তমানে হয়তো মূল্যস্ফীতির হার ৮ শতাংশের ঘরে আছে, কিন্তু দফায় দফায় গ্যাস-বিদ্যুৎ থেকে শুরু করে সব ধরনের জ্বালানির দাম বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
একই ভাবে বাড়ি ভাড়া, যাতায়াত ভাড়া, শিক্ষা ব্যয় থেকে শুরু করে অন্য সব ব্যয় বেড়েছে অনেকখানি। অথচ মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর আয় সেভাবে বাড়েনি। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানো হয়েছে, অথচ বেসরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানোর কোনো উদ্যোগ নেই। এভাবে সব দিকের ব্যয় একত্রে বৃদ্ধি পেয়েছে, অন্য দিকে আয় তো বাড়েনি, অনেক ক্ষেত্রে আয় আরও কমে গেছে। তাই বাধ্য হয়ে দেশের সাধারণ মানুষ, যাদের সঞ্চয় আছে— তারা সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছে। আর যাদের সঞ্চয় নেই তারা ধার-কর্য করে জীবন চালাচ্ছে। সুতরাং দেশের সাধারণ মানুষের কষ্ট কীভাবে লাঘব করা যায় সরকারকে সে দিকটি নিয়ে সবচেয়ে বেশি ভাবতে হবে।’
মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর গল্প প্রায় একই রকম
মধ্যবিত্ত একটি পরিবারের প্রধান আনিসুর রহমান। থাকেন রাজধানীর কল্যাণপুর নতুন বাজার এলাকায়। বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত তিনি। গত তিন বছরে তিল তিল করে ২ লাখ টাকা জমিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল মেয়েকে ভালো স্কুলে ভর্তি করানো। কিন্তু সম্প্রতি তিনি মতিঝিলে তার ব্যাংকে গিয়ে এফডিআর ভেঙে ফেলেন। তার মাসিক বেতন ৩৫ হাজার টাকা। সব কিছুর দাম বেড়ে যাওয়ায় এই বেতনে এখন আর সংসার চলছে না। এখন চালের কেজি ৭৫-৮৫ টাকা, ভোজ্য তেল ২০০-২১০ টাকা, এলপি গ্যাসের সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে ২৪০০-২৫০০ টাকায়। বাসা ভাড়া ১৫ হাজার। সব মিলিয়ে মাসে ঘাটতি থাকছে ৮-১০ হাজার টাকা। তিনি বলেন, প্রথমে ধার করেছি, এখন সঞ্চয় ভাঙছি। ২ লাখ থেকে ৫০ হাজার শেষ। আর তিন মাস পর কী করব জানি না। একা আনিসুর রহমান নন, তার মতো মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেকের সংসারের চিত্রই এখন এমন।
যেমন কড়াইল বস্তির গার্মেন্টস শ্রমিক আয়েশা বেগমের গল্প আরও করুণ। তার স্বামী রিকশাচালক। দুজনের আয় ২৫ হাজার টাকা। আগে মাসে ৫ হাজার টাকা গ্রামের বাড়িতে পাঠাতেন। এখন ৩ মাস ধরে পাঠাতে পারেন না। উল্টো গ্রাম থেকে মায়ের জমানো ৩০ হাজার টাকা এনে সংসার চালাচ্ছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ মান্থলি রিপোর্ট অনুযায়ী ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর— এই ৮ মাসে দেশের ব্যাংকিং খাত থেকে নিট ৪৫ হাজার ২০০ কোটি টাকা সঞ্চয় তুলে নিয়েছে মানুষ। অর্থাৎ, এই সময়ে মানুষ ব্যাংকে যত টাকা জমা দিয়েছে, তার চেয়ে ৪৫ হাজার কোটি টাকা বেশি তুলে নিয়েছে।
সঞ্চয় ভাঙছে কোন পরিবারগুলো বেশি : এই সংকট সবচেয়ে বেশি আঘাত করেছে তিনটি শ্রেণিকে। শহরের নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণি— যাদের মাসিক আয় ১৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকার মধ্যে। এদের মধ্যে আছে— ৪২ লাখ গার্মেন্টস শ্রমিক, ৭০ লাখ নির্মাণ শ্রমিক, বেসরকারি চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। বিবিএসের হিসাব বলছে, ২০২২ সালে এই শ্রেণির আয়ের ৫৮ শতাংশ যেত খাদ্যে, ১২ শতাংশ জ্বালানিতে, ১২ শতাংশ সঞ্চয়ে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে এসে খাদ্যে যাচ্ছে ৬৮ শতাংশ, জ্বালানিতে ১৮ শতাংশ, সঞ্চয় নেমে এসেছে ২ শতাংশে। অনেক পরিবারে সঞ্চয় এখন মাইনাসে চলে গেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. এম এম আকাশ বলেন, অর্থনীতির ভাষায় এটাকে বলে ডিস-সেভিং বা ঋণাত্মক সঞ্চয়। মানুষ যখন ভবিষ্যতের জন্য জমানো টাকা দিয়ে বর্তমানের চাল-ডাল কেনে, তখন বুঝতে হবে পরিবারটি খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার দ্বারপ্রান্তে।’
সঞ্চয় ভেঙে সংসার চালানোর পেছনে তিনটি বড় কারণ রয়েছে। প্রথম কারণ— আয় বাড়েনি অথচ ব্যয় বেড়েছে ৪০ শতাংশ।
দ্বিতীয় কারণ হলো—জ্বালানির অদৃশ্য কর বা এলপিজির বাড়তি মূল্য। এটি এবারের সংকটের সবচেয়ে বড় নতুন কারণ। ২০০৮ সালে সরকার নতুন পাইপলাইন গ্যাস সংযোগ বন্ধ করে দেওয়ার পর দেশে এখন ৪ কোটি পরিবার এলপিজির ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করলেও বাজারে তা ২৪০০-২৫০০ টাকা। ৮ মাসে দাম বেড়েছে ৬০ শতাংশ। জানুয়ারিতে ছিল ১৪০০ টাকা। একটি পরিবারের মাসে একটি সিলিন্ডার লাগে। অর্থাৎ, আয়ের ১০ শতাংশ শুধু রান্নার গ্যাসে। বিআইডিএসের জরিপ বলছে, এই কারণে বস্তি এলাকায় ডাল, মাংস, ছোলা রান্না ৩০ শতাংশ কমে গেছে।
কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, এলপিজি এখন আর জ্বালানি নয়, এটি খাদ্য নিরাপত্তার ইস্যু। যখন একটি পরিবারকে ২৪০০-২৫০০ টাকা গ্যাসের পেছনে দিতে হয়, তখন সে ডিম, দুধ কেনা কমিয়ে দেয়।
তৃতীয় কারণ হলো— কাজ কমে যাওয়া। নির্মাণ খাত, রিয়েল এস্টেট, ইটভাটা, ক্ষুদ্র শিল্পে কাজ ৩০ শতাংশ কমেছে। ফলে ওভারটাইম, বোনাস বন্ধ। অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বেতন বাড়ায়নি টানা কয়েক বছর। এ কারণেও দুর্ভোগ বেড়েছে।
সঞ্চয় শেষে ঋণের ফাঁদে : সঞ্চয় শেষ হলে মানুষ ঋণের দিকে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে ক্ষুদ্রঋণ সংস্থা (এমএফআই) থেকে ঋণ নেওয়া ২০ শতাংশ বেড়েছে। পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) বলছে, ঋণখেলাপি ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৪ শতাংশ হয়েছে। কারণ মানুষ ঋণ নিয়ে খাদ্য কিনছে, বিনিয়োগ করছে না। পুষ্টি সংকট বেড়েছে। মানুষ আমিষ খাওয়া কমিয়েছে। জাতীয় পুষ্টি জরিপ বলছে, ২৮ শতাংশ শিশু খর্বাকৃতি, ৩৫ শতাংশ নারী রক্তস্বল্পতায় ভুগছে। এই হার আরও বাড়বে।
এসব কিছুর প্রভাব ব্যাংকিং খাতে সংকট বাড়িয়েছে। মানুষ টাকা তুলে নেওয়ায় ব্যাংকে আমানত প্রবৃদ্ধি ৭.২ শতাংশে নেমেছে। ফলে ব্যাংকঋণ দিতে পারছে না, বিনিয়োগ কমছে। এসব কিছুর প্রভাবে দারিদ্র্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্বব্যাংক বলছে, যদি এই প্রবণতা আরও ৬ মাস চলে, তা হলে দেশে নতুন করে ২০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাবে। বর্তমানে দারিদ্র্যের হার ১৮.৭ শতাংশ।
সমাধান কোন পথে : এই সংকটের সমাধানে সরকারকে কয়েকটি জনবান্ধব সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের। সরকারের ওএমএস কর্মসূচিতে ৩০ টাকা কেজি চাল দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু তা মাত্র ৩০ লাখ পরিবার পায়। এটি বাড়িয়ে প্রয়োজনে ২ কোটি দরিদ্র পরিবারকে দেওয়ার ব্যবস্থা করা। খাদ্যের বদলে নগদ টাকা দেওয়া—যা সরকার ইতিমধ্যেই ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে দেওয়া শুরু করেছে। ১ কোটি দরিদ্র পরিবারকে মাসে ২০০০ টাকা করে দিলে বছরে ২৪ হাজার কোটি টাকা লাগবে, যা ৪৫ হাজার কোটি টাকা সঞ্চয় ভাঙার চেয়ে কম।
এ ছাড়া এলপিজিতে ভর্তুকি বাড়ানো দরকার। গরিব ১ কোটি পরিবারের জন্য ১০০০ টাকায় সিলিন্ডার দেওয়ার ব্যবস্থা করলে উপকারে আসবে। রেশন কার্ড বাড়ানো যেতে পারে। গ্রামে ভিজিডি আছে, শহরে নেই—শহরের গরিবদের জন্যও চালু করা দরকার। বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রামে ৫০ লাখ পরিবারকে রেশন কার্ড দেওয়া দরকার। একই সঙ্গে কাজের নিশ্চয়তা দেওয়া দরকার। ১০০ দিনের কর্মসৃজন প্রকল্প শহরেও চালু করতে হবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি