ছবি : সংগৃহীত দুর্গাপূজা মানেই আনন্দ, আড্ডা, নতুন পোশাক আর প্রিয়জনদের সঙ্গে মিলেমিশে সময় কাটানো। আর এই উৎসবের আনন্দে বাড়তি মাত্রা যোগ করে নানা পদের সুস্বাদু রান্না। পূজার দিনগুলোতে ঘরে ঘরে তৈরি হয় ঐতিহ্যবাহী নিরামিষ পদ, খিচুড়ি, লাবড়া, পাঁচ রকম ভাজা, চাটনি থেকে শুরু করে নানা ধরনের মিষ্টি। কোথাও আবার অতিথি আপ্যায়নে থাকে পোলাও, ছানার কালিয়া কিংবা বিশেষ কোনো পদ। রান্নার এই আয়োজন শুধু খাবারের স্বাদেই সীমাবদ্ধ নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পারিবারিক ঐতিহ্য, শৈশবের স্মৃতি আর প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা রন্ধনপ্রণালি। তবে উৎসবের ব্যস্ততার মধ্যে রান্নার পরিকল্পনা করাও জরুরি। সহজ উপকরণে সুস্বাদু পদ তৈরি, পরিবেশনে বৈচিত্র্য আর খাবারের স্বাদ ও পুষ্টির ভারসাম্য বজায় রেখে সাজিয়ে নেওয়া যায় পূজার বিশেষ মেনু। উৎসবের প্রতিটি দিন হয়ে উঠুক ঘরোয়া রান্নার স্বাদে আরও আনন্দময়। লিখেছেন রন্ধনশিল্পী খালেদা খানম, বিথী রায়।
লাবড়া
উপকরণ : আলু, মিষ্টি আলু, কুমড়ো, বেগুন, পটোল ও মুলো, ফুলকপি ও কাঁচকলা, শিম ও বরবটি, সরিষার তেল ৪-৫ টেবিল চামচ, পাঁচফোড়ন ১ চা চামচ, তেজপাতা ২ টি, শুকনো মরিচ ২-৩ টি, কাঁচা মরিচ ৪-৫ টি, আদা বাটা দেড় টেবিল চামচ, হলুদ গুঁড়া ১ চা চামচ, জিরে গুঁড়া ১ চা চামচ ও ধনে গুঁড়া ১ চা চামচ, নারকেল কোড়া বা বাটা ৩ টেবিল চামচ, লবণ ও চিনি স্বাদমতো, ঘি ১ টেবিল চামচ, গোটা জিরে, মৌরি, তেজপাতা এবং শুকনো মরিচ শুকনো খোলায় ভেজে গুঁড়া করে নেওয়া (১ চা চামচ)।
প্রস্তুত প্রণালি : সবজিগুলো সব ডুমো করে কেটে নিতে হবে। এরপর কড়াইতে সরিষার তেল গরম করে প্রথমে বেগুনের টুকরোগুলো হালকা লবণ-হলুদ দিয়ে ভেজে তুলে রাখতে হবে। ওই তেলেই শুকনো মরিচ, তেজপাতা এবং পাঁচফোড়ন দিয়ে আদা বাটা ও কাঁচামরিচ দিয়ে কিছুক্ষণ কষিয়ে নিতে হবে। এবার সব সবজি যেমন— আলু, মিষ্টিআলু, মুলো ও কুমড়ো দিয়ে ৩-৪ মিনিট ভাজুন। এরপর বাকি সবজিগুলো (বেগুন বাদে) দিয়ে দিন। সবজির মধ্যে হলুদ, জিরে ও ধনে গুঁড়া এবং স্বাদমতো লবণ দিয়ে ভালো করে মিশিয়ে নিতে হবে। এবার ঢাকনা দিয়ে মাঝারি আঁচে রান্না করে সবজি থেকে পানি বের হবে, এতে আলাদা করে পানি দিতে হবে না।
সবজি আধা সেদ্ধ হয়ে এলে কোরানো নারকেল এবং ভেজে রাখা বেগুনগুলো দিয়ে দিতে হবে। স্বাদ ব্যালেন্স করার জন্য সামান্য চিনি দিলে লাবড়া একটু মিষ্টি মিষ্টি ভালো লাগে। এরপর সবজি পুরোপুরি সেদ্ধ হয়ে মাখামাখি হয়ে এলে ওপর থেকে ঘি এবং ভাজা মসলা ছড়িয়ে ভালো করে মিশিয়ে আঁচ বন্ধ করে ৫ মিনিট ঢেকে রাখতে হবে। এটি গরম খিচুড়ি কিংবা লুচির সঙ্গে পরিবেশন করা যাবে।
কাশ্মিরি পোলাও
উপকরণ : বাসমতি বা চিনিগুড়া চাল ২ কাপ, সয়া বড়ি ১ কাপ, তরল দুধ ১ কাপ, পানি আড়াই কাপ, কাজুবাদাম ও কিসমিস ২ টেবিল চামচ, তেজপাতা ১টি, দারচিনি ১ টুকরো, এলাচ ৩-৪টি, লবঙ্গ ৪টি, শাহী জিরে ১ চা চামচ, মরিচ গুঁড়া ১ চা চামচ, আদা বাটা ১ চা চামচ, গরম মসলা গুঁড়া আধা চা চামচ, ঘি ও সাদা তেল ৩-৪ টেবিল চামচ, লবণ ও চিনি স্বাদমতো, কুচানো কাঠবাদাম, পেস্তা ও বেদানা/আনারের দানা (সাজানোর জন্য)।

প্রস্তুত প্রণালি : প্রথমে গরম পানিতে সামান্য লবণ দিয়ে সয়া বড়িগুলো ৫ মিনিট ফুটিয়ে নিতে হবে। এরপর পানি থেকে তুলে ঠান্ডা করে হাতের সাহায্যে ভালো করে চিপে অতিরিক্ত পানি বের করে নিতে হবে। কড়াইতে সামান্য তেল গরম করে সয়া বড়িগুলো সামান্য লবণ ও মরিচ গুঁড়া দিয়ে হালকা সোনালি করে ভেজে তুলে রাখতে হবে। একটি বড় হাঁড়ি বা প্যানে ঘি ও তেল একসঙ্গে গরম করে তাতে কাজুবাদাম ও কিসমিস হালকা সোনালি করে ভেজে গোটা গরম মসলা (তেজপাতা, এলাচ, দারচিনি, লবঙ্গ) এবং শাহী জিরে ফোড়ন দিন। সুগন্ধি বেরোলে পানি ঝরিয়ে রাখা চাল যোগ করে হালকা আঁচে ২-৩ মিনিট ভেজে নিতে হবে। এবার ভাজা চালের মধ্যে আদা বাটা, মরিচ গুঁড়া এবং আগে থেকে ভেজে রাখা সয়া বড়িগুলো দিয়ে সব উপাদান একসঙ্গে মিশিয়ে নিতে হবে। এরপর প্যানে গরম পানি, তরল দুধ, স্বাদমতো লবণ ও চিনি দিয়ে ভালোভাবে ফুটিয়ে নিতে হবে। পানি ফুটে উঠলে ওপর থেকে ভাজা কাজু ও কিশমিশ ছড়িয়ে আঁচ কমিয়ে ১৫-২০ মিনিট দমে রান্না করে নিতে হবে। পোলাওয়ের পানি সম্পূর্ণ শুকিয়ে এলে ঢাকনা না খুলে আরও ৫ মিনিট দমে রেখে নিতে হবে।
লুচি
উপকরণ : ময়দা ২ কাপ, তেল বা ঘি ২ টেবিল চামচ (ময়ান দেওয়ার জন্য) এবং ভাজার জন্য পরিমাণমতো সাদা তেল, লবণ স্বাদমতো, চিনি ১ চা চামচ (লুচির সুন্দর রঙের জন্য), কুসুম গরম পানি পরিমাণমতো (ময়দা মাখার জন্য)।
প্রস্তুত প্রণালি : একটি বড় পাত্রে ময়দা, স্বাদমতো লবণ, চিনি এবং ২ টেবিল চামচ তেল বা ঘি ভালো করে মিশিয়ে নিতে হবে। এবার আঙুল দিয়ে ঘষে ঘষে ময়দার সঙ্গে তেল ভালো করে মিশিয়ে ময়ান দিতে হবে। অল্প অল্প করে কুসুম গরম পানি দিয়ে ময়দা ভালো করে মেখে একটি শক্ত ডো বা খামির তৈরি করুন। ডো তৈরি হয়ে গেলে ওপরের একটু তেল মেখে একটি ভেজা কাপড় দিয়ে ঢেকে ৩০ মিনিট রেখে দিতে হবে। এতে ময়দা নরম ও সেট হবে। ৩০ মিনিট পর খামিরটি আরেকবার হালকা মেখে ছোট ছোট গোল গোল লেচি বা বল কেটে নিন। এবার পিঁড়ি-বেলনে সামান্য তেল মেখে (আটা ব্যবহার করবেন না, তা না হলে তেলে দিলে তেল পুড়ে যায়) লেচিগুলো গোল করে লুচির আকারে বেলে নিতে হবে।
কড়াইতে পর্যাপ্ত পরিমাণে সাদা তেল গরম করে একটা একটা করে লুচি তেলের মধ্যে দিয়ে দিতে হবে। খুন্তি দিয়ে হালকা করে চেপে ধরলে লুচি চমৎকারভাবে ফুলে উঠবে। লুচির একপাশ হালকা সোনালি হয়ে এলে উল্টে অন্য পাশটাও হালকা ভেজে তেল থেকে তুলে নিতে হবে। এভাবে সব লুচি ভেজে আলুর তরকারি বা ছোলার ডালের সঙ্গে গরম গরম পরিবেশন করা যাবে।
নারিকেল সন্দেশ
উপকরণ : নারিকেল কোরানো ১টি, চিনি বা গুড় ১ কাপ (স্বাদমতো),গুঁড়া দুধ ১ কাপ (সন্দেশে সুন্দর আঠালো ভাব আনার জন্য), ঘি ১ টেবিল চামচ, এলাচ গুঁড়া আধা চা চামচ (বা ৩/৪টি আস্ত এলাচ)।
প্রস্তুত প্রণালি : প্রথমে কোরানো নারিকেল ব্লেন্ডারে সামান্য তরল দুধ অথবা পানি দিয়ে একদম মিহি করে ব্লেন্ড করে নিতে হবে বা শীল-পাটায় বেটে নিতে হবে। নারিকেল যত মিহি হবে, সন্দেশ ততবেশি নরম হবে। এবার একটি প্যানে বা কড়াইয়ে ঘি গরম করে তাতে ব্লেন্ড করা নারিকেল, চিনি এবং এলাচ গুঁড়া দিয়ে দিতে হবে। চুলার আঁচ মাঝারি রেখে অনবরত নাড়তে থাকুন যেন লেগে না যায়। চিনি গলে যখন নারিকেলের পানি শুকাতে শুরু করবে, তখন অল্প অল্প করে গুঁড়া দুধ মিশিয়ে নিতে হবে। গুঁড়া দুধ মিশ্রণটিকে দ্রুত ঘন ও আঠালো করতে সাহায্য করবে। চুলার আঁচ কমিয়ে মিশ্রণটি নাড়তে নাড়তে যখন নারিকেলের মিশ্রণটি কড়াইয়ের গা ছেড়ে দলা পাকিয়ে আসবে এবং আঠালো হয়ে যাবে, তখন চুলা থেকে নামিয়ে এলাচগুলো (আস্ত দিয়ে থাকলে) ফেলে দিতে হবে। মিশ্রণটি পুরোপুরি ঠান্ডা হওয়ার আগেই হালকা গরম থাকা অবস্থায় হাত দিয়ে ভালোভাবে মেখে সন্দেশ তৈরির ছাঁচে সামান্য ঘি মাখিয়ে সুন্দর ডিজাইনের সন্দেশ তৈরি করে নিতে হবে। ছাঁচ না থাকলে হাত দিয়ে গোল বা চ্যাপ্টা আকৃতিও দিতে পারেন। তৈরি হয়ে গেল সুস্বাদু নারিকেল সন্দেশ।
ছানার কালিয়া
উপকরণ : ছানা ৫০০ গ্রাম, আলু ২টি (ডুমো করে কাটা) ফোড়ন গোটা জিরে, তেজপাতা, ছোট এলাচ, দারচিনি, শুকনো মরিচ, পাঁচফোড়ন, আদা-জিরে বাটা, টমেটো কুচি বা পেস্ট, হলুদ গুঁড়া, লাল মরিচের গুঁড়া, গরম মসলা গুঁড়া, ঘি, সরিষার তেল, লবণ ও চিনি স্বাদমতো।
প্রস্তুত প্রণালি : প্রথমে ছানা ভালো করে মেখে তার সঙ্গে সামান্য ময়দা, লবণ ও চিনি মিশিয়ে ছোট ছোট বলের আকার দিতে হবে। কড়াইতে তেল গরম করে আলুগুলো সোনালি করে ভেজে তুলে নিতে হবে। এবার ওই তেলেই ছানার বলগুলো হালকা বাদামি করে ভেজে তুলে রাখতে হবে। এরপর তেলে ফোড়ন দিয়ে আদা-জিরে বাটা, টমেটো এবং গুঁড়া মসলা দিয়ে ভালো করে কষিয়ে নিতে হবে যতক্ষণ না তেল ছাড়ছে। কষানো মসলায় ভেজে রাখা আলু ও পরিমাণমতো পানি দিয়ে ঝোল ফুটে উঠলে ছানার বলগুলো দিয়ে দিতে হবে। ওপর থেকে একটু ঘি ও গরম মসলার গুঁড়া ছড়িয়ে নামিয়ে পরিবেশন করা যাবে ছানার কালিয়া।
মাটন ঘি রোস্ট
উপকরণ : মাটন (হাড়সহ বা হাড় ছাড়া) ১ কেজি, টকদই হাফ কাপ, আদা-রসুন বাটা ১ টেবিল চামচ, হলুদ গুঁড়া হাফ চা চামচ, লেবুর রস ১ টেবিল চামচ, লবণ স্বাদমতো। ঘি রোস্ট মসলার জন্য শুকনো মরিচ ৮-১০টি (ঝাল বুঝে),ধনিয়া গুঁড়া দেড় টেবিল চামচ, জিরে গুঁড়া ১ চা চামচ, গোলমরিচ হাফ চা চামচ, মৌরি হাফ চা চামচ, মেথি চার ভাগের ১ চা চামচ, দারুচিনি ১টি ছোট টুকরো, ঘি ৬-৭ টেবিল চামচ।
প্রস্তুত প্রণালি : প্রথমে ধুয়ে রাখা মাটনের সঙ্গে টকদই, আদা-রসুন বাটা, হলুদ গুঁড়া, লেবুর রস এবং লবণ ভালো করে মেখে অন্তত ১ থেকে ২ ঘণ্টা মেরিনেট করে রেখে দিতে হবে। এরপর একটি কড়াইয়ে শুকনো মরিচ এবং অন্য সব মসলা (ধনে, জিরে, গোলমরিচ, মৌরি, মেথি ও দারুচিনি) শুকনো খোলায় হালকা আঁচে টেলে নিতে হবে। মসলা থেকে মিষ্টি গন্ধ বের হলে নামিয়ে ঠান্ডা করে সামান্য পানি দিয়ে মিহি পেস্ট বানিয়ে নিতে হবে। মেরিনেট করা মাটন একটি সসপেনে নিয়ে সামান্য পানি দিয়ে সেদ্ধ করে নিতে হবে। খেয়াল করতে হবে মাংস যেন পুরোপুরি গলে না গিয়ে প্রায় ৮০ শতাংশ সেদ্ধ হয়। মাংস ও স্টক আলাদা করে রাখতে হবে। তারপর একটি কড়াইতে পর্যাপ্ত ঘি গরম করে আগে থেকে তৈরি করে রাখা ঘি রোস্টের মসলার পেস্টটি দিয়ে দিতে হবে। মাঝারি আঁচে ৪ থেকে ৬ মিনিট ভালো করে কষিয়ে নিতে হবে যতক্ষণ না মসলার ধার দিয়ে ঘি ছাড়তে শুরু করে। সেদ্ধ করা মাটন কড়াইতে দিয়ে মসলার সঙ্গে ভালো করে মিশিয়ে নিতে হবে।
প্রেশার কুকারের মাংসের স্টক থেকে কিছুটা দিয়ে মাখা মাখা গ্রেভি তৈরি করে স্বাদমতো লবণ দিয়ে দিতে হবে। একদম কম আঁচে ঢাকা দিয়ে ৭-৮ মিনিট রান্না করুন যতক্ষণ না জল শুকিয়ে সম্পূর্ণ মসলা মাংসের গায়ে লেগে মাখো মাখো ও গাঢ় হয়। গরম গরম লুচি বা পরোটার সঙ্গে পরিবেশন করা যাবে মজাদার মাটন ঘি রোস্ট।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি