গ্রাফিক : সময়ের আলো নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও খাদ্যশস্যের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে ক্রমেই দুর্বিষহ করে তোলে। বিশেষ করে সীমিত আয়ের মানুষকে ঘর-সংসারের প্রয়োজন মেটাতে হিমশিম খেতে হয়। খাবার, চিকিৎসা, সন্তানের পড়াশোনা ও বাসা ভাড়ার মতো অপরিহার্য ব্যয় সামলাতে গিয়ে অনেক পরিবারকে কাটছাঁট করতে হয় জীবনের মৌলিক প্রয়োজনেও। দ্রব্যমূল্যের এই চাপ শুধু অর্থনৈতিক সংকট নয়; এটি মানুষের পারিবারিক শান্তি, সামাজিক সম্পর্ক ও মানবিক মূল্যবোধেরও পরীক্ষা। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের সামনে দুটি পথ— একদিকে নিজের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে অন্যের অসহায়ত্বের সুযোগ নেওয়া, অন্যদিকে মানুষের দুর্ভোগ উপলব্ধি করে সামর্থ্য অনুযায়ী পাশে দাঁড়ানো। ইসলাম দ্বিতীয় পথটিকেই উৎসাহিত করে। কারণ ইসলামি জীবনবোধে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি ন্যায়বিচার, সততা, সহমর্মিতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার গুরুত্ব অপরিসীম।
সংকটে অন্যায্য মুনাফালোভ নয় : ব্যবসা-বাণিজ্য জীবিকা নির্বাহের সম্মানজনক মাধ্যম। ইসলাম বৈধ উপায়ে মুনাফা অর্জনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে মানুষের প্রয়োজনকে পুঁজি করে অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়ানো, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা কিংবা অসহায় ক্রেতার কাছ থেকে অন্যায়ভাবে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেন, ‘তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না, তবে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে ব্যবসা হলে তা ভিন্ন’ (সুরা নিসা, আয়াত : ২৯)। এই নির্দেশনা ব্যবসায় সততা ও ন্যায্যতার গুরুত্ব তুলে ধরে। একজন ব্যবসায়ীর যেমন ন্যায্য মুনাফা অর্জনের অধিকার রয়েছে, তেমনি ক্রেতারও ন্যায্যমূল্যে পণ্য কেনার অধিকার রয়েছে। বিশেষত খাদ্যদ্রব্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের আরও দায়িত্বশীল হওয়া উচিত। কারণ এসব পণ্য মানুষের বিলাসিতার উপকরণ নয়, বরং বেঁচে থাকার মৌলিক উপাদান। নবীজি (সা.) মজুদদারির ব্যাপারে কঠোর সতর্কবাণী দিয়েছেন। সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, পাপী ব্যক্তি ছাড়া কেউ মজুদদারি করে না। তবে স্বাভাবিক ব্যবসায়িক প্রয়োজনে পণ্য সংরক্ষণ এবং মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়ে অন্যায়ভাবে মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা এক বিষয় নয়। মূল বিবেচ্য হলো অন্যায় ও মানুষের ক্ষতিসাধন।
বাজার নিয়ন্ত্রণে সম্মিলিত চেষ্টা : দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির জন্য সবসময় ব্যবসায়ীদের এককভাবে দায়ী করা যায় না। উৎপাদন ব্যয়, পরিবহন, আমদানি, জ্বালানি ও সরবরাহের ঘাটতিসহ বিভিন্ন কারণে পণ্যের দাম বাড়তে পারে। তাই আবেগ বা অনুমানের ভিত্তিতে কাউকে দোষারোপ না করে প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করা জরুরি। সরকারি কর্তৃপক্ষ, ব্যবসায়ী সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে বাজারে স্বচ্ছতা, ন্যায্য প্রতিযোগিতা এবং কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। মজুদদারি, ওজনে কম দেওয়া, পণ্যের মান গোপন করা কিংবা মিথ্যা তথ্য দিয়ে ক্রেতাকে প্রতারিত করার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।
অভাবী মানুষের পাশে দাঁড়ানো : দ্রব্যমূল্যের চাপে অনেক পরিবার নীরবে কষ্ট সহ্য করে। আত্মসম্মানের কারণে অনেকে অন্যের কাছে সাহায্য চাইতে পারেন না। তাই আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের উচিত আশপাশের মানুষের খোঁজ নেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া। আল্লাহ তায়ালা নেককারদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, ‘তারা নিজেদের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অভাবগ্রস্ত, এতিম ও বন্দিকে খাবার দান করে’ (সুরা ইনসান, আয়াত : ৮)। এই শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানবিকতা শুধু উদ্বৃত্ত সম্পদ থেকে কিছু দান করার নাম নয়; বরং অন্যের কষ্ট অনুভব করে সামর্থ্য অনুযায়ী পাশে দাঁড়ানোর নামও মানবিকতা।
সংযমী জীবনযাপন ও মিতব্যয় : দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করা ব্যক্তিবিশেষের পক্ষে সম্ভব না হলেও নিজের ব্যয় ব্যবস্থাপনায় সচেতন হওয়া সম্ভব। অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা, লোক দেখানো আয়োজন ও খাবারের অপচয় পরিহার করলে অনেক পরিবার আর্থিক চাপ কিছুটা কমাতে পারে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা খাও ও পান করো, কিন্তু অপচয় করো না’ (সুরা আরাফ, আয়াত : ৩১)। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী কেনাকাটা, ব্যয়ের পরিকল্পনা, খাবার নষ্ট না করা এবং সামর্থ্যরে বাইরে ঋণ এড়িয়ে চলা উচিত। তবে সংযমের শিক্ষা দিয়ে দরিদ্র মানুষের প্রকৃত দুর্ভোগকে খাটো করে দেখা যাবে না। একজন মানুষ অপচয় না করেও দ্রব্যমূল্যের চাপে সংকটে পড়তে পারেন। তাই ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি ন্যায্য বাজারব্যবস্থা ও সামাজিক সহযোগিতাও অপরিহার্য।
ধৈর্যের সঙ্গে ন্যায়ের চর্চা : অর্থনৈতিক সংকটে ধৈর্যধারণ করা গুরুত্বপূর্ণ। তবে ধৈর্যের অর্থ অন্যায়ের কাছে নীরব থাকা নয়। বাজারে অনিয়ম দেখা দিলে যাচাই না করে গুজব ছড়ানো কিংবা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়াও সমাধান হতে পারে না। বরং নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো এবং আইনসম্মত উপায়ে প্রতিকার চাওয়া উচিত। একই সঙ্গে আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে হালাল উপার্জন, পরিমিত ব্যয় ও পারস্পরিক সহযোগিতার চর্চা করতে হবে। নিজের পরিবারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সামর্থ্য অনুযায়ী অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোও একজন মুমিনের কর্তব্য।
মানবিকতাই সংকট মোকাবিলার শক্তি : দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি মোকাবিলায় কার্যকর অর্থনৈতিক পদক্ষেপের বিকল্প নেই। তবে সেই প্রচেষ্টাকে সফল ও মানবিক করে তুলতে প্রয়োজন সততা, ন্যায়পরায়ণতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা। ব্যবসায়ী ন্যায্য মুনাফা অর্জন করবেন, ক্রেতা ন্যায্যমূল্যে পণ্য পাবেন, কর্তৃপক্ষ বাজারে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করবে এবং সামর্থ্যবান মানুষ অসহায়দের পাশে দাঁড়াবেন, এমন পরিবেশই কাম্য। মানুষের দুর্দিনে তার অসহায়ত্বকে পুঁজি করে লাভবান হওয়া নয়, বরং কষ্ট লাঘবে এগিয়ে আসাই হোক আমাদের অঙ্গীকার। কারণ ইসলাম আমাদের শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতের শিক্ষা দেয় না; মানুষের অধিকার রক্ষা, ন্যায় প্রতিষ্ঠা ও বিপদগ্রস্তের পাশে দাঁড়ানোরও নির্দেশ দেয়। দ্রব্যমূল্যের চাপে তাই আমাদের মানবিকতা যেন সংকুচিত না হয়, বরং ধর্মীয় মূল্যবোধের আলোয় আরও প্রসারিত হয়।
লেখক : শিক্ষক, মাদরাসাতুদ দাওয়াহ আশ-শরইয়্যাহ নারায়ণগঞ্জ
সময়ের আলো/জেডআই