শতবর্ষের সম্প্রতি, একই আঙিনায় মসজিদ-মন্দির

গোদাগাড়ী (রাজশাহী) প্রতিনিধি

সারাদেশ

একই আঙিনায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে মসজিদ ও মন্দির। একদিকে মুসল্লিরা আদায় করছেন নামাজ, অন্যদিকে চলছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পূজা-অর্চনা। আজানের ধ্বনি

2026-10-20T18:38:35+00:00
2026-10-20T18:40:27+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬,
৪ কার্তিক ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬
সারাদেশ
শতবর্ষের সম্প্রতি, একই আঙিনায় মসজিদ-মন্দির
গোদাগাড়ী (রাজশাহী) প্রতিনিধি
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:৩৮ পিএম  আপডেট: ২০.১০.২০২৬ ৬:৪০ পিএম
ইনসান বাইতুস শরিফ জামে মসজিদ ও সার্বজনীন গোদাগাড়ী কেন্দ্রীয় মন্দির। ছবি : সময়ের আলো
একই আঙিনায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে মসজিদ ও মন্দির। একদিকে মুসল্লিরা আদায় করছেন নামাজ, অন্যদিকে চলছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পূজা-অর্চনা। আজানের ধ্বনি ভেসে এলে থেমে যায় ঢাকঢোল ও বাদ্যযন্ত্রের শব্দ। নামাজ শেষ হলে আবারও মুখর হয়ে ওঠে পূজামণ্ডপ। এভাবেই পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার ভগবন্তপুর হাট এলাকা।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, প্রায় শত বছর ধরে এ এলাকায় পাশাপাশি অবস্থিত মসজিদ ও মন্দিরে নিজ নিজ ধর্মীয় আচার পালন করে আসছেন মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। ধর্মীয় পরিচয় আলাদা হলেও তাঁদের দৈনন্দিন জীবনযাপন, সামাজিক সম্পর্ক ও পারস্পরিক সহযোগিতায় এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি।

ভগবন্তপুর হাট ইনসান বাইতুস শরিফ জামে মসজিদ ও ভগবন্তপুর হাট সার্বজনীন গোদাগাড়ী কেন্দ্রীয় মন্দির ঘুরে দেখা যায়, মসজিদ ও মন্দিরের দূরত্ব মাত্র পাঁচ মিটার। পাশাপাশি দুটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের মধ্যে রয়েছে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক। দুর্গাপূজার আয়োজন চললেও নামাজের সময় মসজিদের প্রতি সম্মান জানিয়ে বন্ধ রাখা হয় ঢাকঢোল ও বাদ্যযন্ত্র। নামাজ শেষ হলে আবারও শুরু হয় পূজার আনুষ্ঠানিকতা।

স্থানীয়দের মতে, দীর্ঘদিন ধরে পারস্পরিক সমঝোতা ও ধর্মীয় বিধিবিধানের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই চলছে দুই সম্প্রদায়ের উপাসনা।

ভগবন্তপুর হাট এলাকার ৮০ বছর বয়সী বাসিন্দা মইজুদ্দীন আহম্মেদ বলেন, ১৯৬৬ সালে স্থানীয় ইনসান জমিদার মন্দিরের পাশে মাটির দেয়াল ও খড়ের ছাউনি দিয়ে মসজিদটি নির্মাণ করেন। তখন থেকেই দুই ধর্মের মানুষ পাশাপাশি তাঁদের ধর্মীয় কার্যক্রম চালিয়ে আসছেন বলে তাঁর স্মৃতিতে রয়েছে।

মইজুদ্দীন আহম্মেদের ভাষ্য, পাশাপাশি মসজিদ-মন্দির থাকলেও এখানে কখনো ধর্মীয় বিভেদ বা বিশৃঙ্খলা দেখেননি তিনি। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার মধ্য দিয়ে এলাকার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছেন।

গোদাগাড়ী কেন্দ্রীয় মন্দিরের সভাপতি শ্রী শান্ত কুমার মজুমদার বলেন, মন্দিরটি শত বছরেরও বেশি পুরোনো। তাঁর দাদা আদ্যনাথ মজুমদার ব্রিটিশ আমলে মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন বলে তিনি জানান।

শান্ত কুমার মজুমদার বলেন, আমরা আমাদের পূজা নির্ধারিত সময়ে করি, আর মুসলিম ভাইয়েরা তাঁদের নামাজ আদায় করেন। এখানে আমরা সবাই মিলেমিশে বসবাস করি। একে অপরের ধর্মীয় আচার পালনে সহযোগিতা করি।

ইনসান বাইতুস শরিফ জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা মো. শাহালাল বলেন, মসজিদের পাশেই রয়েছে ঐতিহ্যবাহী মন্দির। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মন্দিরটি মসজিদের আগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। দুই ধর্মের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে নিজ নিজ ধর্ম পালন করে আসছেন, কিন্তু এ নিয়ে কোনো বিরোধ সৃষ্টি হয়নি।

ইমাম শাহালাল বলেন, আজান ও নামাজের সময় মন্দিরের বাদ্যযন্ত্র বন্ধ রাখা হয়। একইভাবে মসজিদ ও মন্দিরের ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে উভয় পক্ষই পারস্পরিক শ্রদ্ধা বজায় রাখে।

স্থানীয় বাসিন্দা অধীর চন্দ্র বলেন, ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনে তাঁরা স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের কাছ থেকে সহযোগিতা পান। আজান ও নামাজের সময় তাঁরা বাদ্যযন্ত্র বন্ধ রাখেন। তাঁর ভাষায়,আমরা সবাই ভাইয়ের মতো মিলেমিশে বসবাস করছি।

তবে মন্দিরটির উন্নয়নে সরকারি উদ্যোগ নেওয়া হলে তা স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জন্য উপকারী হবে বলে মনে করেন তিনি।

মন্দিরের পুরোহিত পলাশ প্রতিম মজুমদার বলেন, পাশাপাশি মসজিদ ও মন্দিরের অবস্থান এবং দুই সম্প্রদায়ের পারস্পরিক সহযোগিতার মধ্য দিয়ে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের একটি ইতিবাচক চিত্র ফুটে উঠেছে।

তিনি বলেন, আজান ও নামাজের সময় তাঁরা বাদ্যযন্ত্র বন্ধ রাখেন এবং মসজিদের ধর্মীয় কার্যক্রমের প্রতি সম্মান দেখান। পূজা নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে প্রশাসন, পুলিশ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও স্বেচ্ছাসেবকেরাও সহযোগিতা করছেন বলে জানান তিনি। পূজার শেষদিন পর্যন্ত এ সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন পুরোহিত।

গোদাগাড়ী পৌরসভার সাবেক মেয়র আনোয়ারুল চৌধুরী বলেন, পাশাপাশি অবস্থিত মসজিদ ও মন্দিরে দুই সম্প্রদায়ের মানুষ তাঁদের ধর্মীয় আচার পালন করে আসছেন। তাঁর দাবি, এ পর্যন্ত সেখানে দুই পক্ষের মধ্যে ধর্মীয় বিরোধ বা সংঘাতের ঘটনা ঘটেনি।

তিনি বলেন,একজন আরেকজনকে সহযোগিতা করে নিজ নিজ ধর্মীয় রীতি পালন করেন। বাপ-দাদার আমল থেকে চলে আসা এই সম্প্রীতির ঐতিহ্য ধরে রাখতে পেরে আমরা গর্বিত।

গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইসরাত জাহান বলেন,পাশাপাশি অবস্থিত দুটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে দুই সম্প্রদায়ের মানুষের নিজ নিজ ধর্ম পালনের বিষয়টি সম্প্রীতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে উপজেলার ৪২টি পূজামণ্ডপে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

ভগবন্তপুর হাটের এই মসজিদ-মন্দির তাই শুধু দুটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি অবস্থানের গল্প নয়। এটি দীর্ঘদিনের সহাবস্থান, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার একটি স্থানীয় দৃষ্টান্ত, যেখানে ধর্মীয় আচার আলাদা হলেও মানুষের মধ্যে সম্পর্কের বন্ধন অটুট রাখার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

সময়ের আলো/এনএন

  বিষয়:   গোদাগাড়ী  শতবর্ষের সম্প্রতি  একই আঙিনায় মসজিদ-মন্দির  ভগবন্তপুর হাট  রাজশাহী  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: