মো. ফাহিম, চরফ্যাশন (ভোলা)
ছবি : সময়ের আলোসংসারে অভাব ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। স্বামী দিনমজুর, আয়ও সীমিত। সেই আয়ে দুই সন্তানসহ পরিবারের খরচ চালাতে হিমশিম খেতে হতো। কিন্তু প্রতিকূলতার কাছে হার মানেননি সালমা বেগম। মাত্র ১ হাজার ৫০০ টাকা মাসিক বেতনের চাকরি দিয়ে শুরু হয়েছিল তার কর্মজীবন। সেখান থেকে সঞ্চয়, পরিশ্রম ও ধৈর্যের মাধ্যমে গড়ে তুলেছেন হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগলের খামার। পাশাপাশি করছেন কৃষিকাজও। একসময় অভাবের সঙ্গে লড়াই করা সালমা এখন স্বাবলম্বী। তাঁর সাফল্যের গল্প অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে আশপাশের নারীদেরও।
৩৩ বছর বয়সী সালমা বেগমের বাড়ি ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার শশীভূষণ থানার হাজারীগঞ্জ ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডে। এসএসসি পাস করার পর ২০০৭ সালে তার বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই সংসারের টানাপোড়েন খুব কাছ থেকে দেখেছেন তিনি। স্বামীর স্বল্প আয়ে সংসার চালাতে গিয়ে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হতো। তবে সংসারের এই বাস্তবতা তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। পরিবারের পাশে দাঁড়াতে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন তিনি।
মাত্র ১ হাজার ৫০০ টাকা মাসিক বেতনে পুষ্টি মাঠকর্মী হিসেবে চাকরি নেন সালমা। পাশাপাশি বাড়িতে ছোট ছোট শিশুদের পড়াতেন। নিজের উপার্জন থেকে সংসারের খরচ মেটানোর পর যতটুকু সম্ভব সঞ্চয় করতেন। সেই সামান্য সঞ্চয়ই একসময় তার স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার পথ তৈরি করে দেয়।
সালমার জীবনের মোড় ঘুরতে শুরু করে ২০১২ সালে। জমানো টাকা দিয়ে মাত্র পাঁচ থেকে ১০টি হাঁস-মুরগি পালন শুরু করেন তিনি। ছোট পরিসরের এই উদ্যোগ থেকে আয় হতে থাকলে লাভের টাকা আবার খামারে বিনিয়োগ করেন। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে খামারের পরিসর। হাঁস-মুরগির পাশাপাশি শুরু করেন গরু ও ছাগল পালন। একই সঙ্গে শাকসবজি চাষ এবং বিভিন্ন ধরনের ফসল উৎপাদনেও মনোযোগ দেন।
বর্তমানে সালমার খামারে রয়েছে প্রায় ৩৫টি হাঁস, ২৫টি মুরগি, সাতটি গরু ও ১১টি ছাগল। হাঁস-মুরগি পালন থেকে প্রতিবছর প্রায় আড়াই লাখ টাকার বিক্রি করেন তিনি। এ পর্যন্ত প্রায় তিন লাখ টাকার ছাগল এবং সাত লাখ টাকার গরু বিক্রি করেছেন। গত বছরই প্রায় ২৫০টি হাঁস বিক্রি করে আয় করেছেন ২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা।
সালমার খামার এখন শুধু আয়ের উৎস নয়, তার আত্মবিশ্বাস ও আত্মনির্ভরতার প্রতীকও। পশু-পাখির যত্ন নেওয়া, খাবারের ব্যবস্থা, খামার পরিচর্যা থেকে শুরু করে বাজারজাত ও বিক্রি—প্রায় সব কাজেই সরাসরি যুক্ত থাকেন তিনি।
নিজের ও স্বামীর আয় থেকে নিয়মিত সঞ্চয় করে ইতোমধ্যে ১৬০ শতক, অর্থাৎ প্রায় এক কানি জমি কিনেছেন সালমা। পাশাপাশি প্রায় ১৭ লাখ টাকা ব্যয়ে তৈরি করেছেন নতুন বসতঘর। একসময় যে সংসারে অভাব ছিল নিত্যদিনের বাস্তবতা, সেই সংসারে এখন এসেছে স্বচ্ছলতা ও স্থিতি।
তবে নিজের সাফল্য নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে চান না সালমা। আশপাশের নারীদেরও স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য উৎসাহ দেন তিনি। তার বিশ্বাস, নারীরা চাইলে ঘরে থাকা অবসর সময়টুকুও কাজে লাগিয়ে পরিবারের আয় বাড়ানোর পাশাপাশি সমাজে অবদান রাখতে পারেন।
সালমা বেগম বলেন, ‘ইচ্ছা থাকলে অল্প পুঁজি দিয়েও কাজ শুরু করা যায়। শুরুটা ছোট হলেও পরিশ্রম আর ধৈর্য থাকলে একদিন সেটাই বড় হয়ে ওঠে।’
ভবিষ্যতে খামার আরও বড় করার পরিকল্পনা রয়েছে সালমার। গরু, ছাগল ও হাঁস-মুরগির সংখ্যা বাড়িয়ে নিজের উদ্যোগকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যেতে চান তিনি।
জীবনের কঠিন পথ পেরিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানো সালমার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন অবশ্য সন্তানদের ঘিরে। তার প্রত্যাশা, সন্তানরা লেখাপড়া করে ভালো মানুষ হয়ে উঠবে এবং সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়বে।
অভাব থেকে আত্মনির্ভরতার পথে সালমা বেগমের এই যাত্রা প্রমাণ করে, বড় সাফল্যের জন্য সব সময় বড় পুঁজি প্রয়োজন হয় না। কখনো কখনো সামান্য সঞ্চয়, ছোট একটি উদ্যোগ, কঠোর পরিশ্রম আর অদম্য ইচ্ছাশক্তিই বদলে দিতে পারে জীবনের গতিপথ।
সময়ের আলো/এসএকে