প্রধানমন্ত্রীর আগমন ঘিরে সৈয়দপুর থেকে রংপুর পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে উৎসুক মানুষের উপস্থিতি দেখা যায়। ছবি : সময়ের আলো রংপুর, ২০ অক্টোবর। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম রংপুর সফরে এসে শারদীয় দুর্গোৎসবের মহানবমীতে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়, ধর্মীয় সম্প্রীতির বার্তা ও উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তারেক রহমান। মঙ্গলবার তাঁর আগমনকে ঘিরে সৈয়দপুর থেকে রংপুর পর্যন্ত সড়কের বিভিন্ন স্থানে নেতাকর্মী ও উৎসুক মানুষের উপস্থিতি দেখা যায়। ঐতিহাসিক রাধা গোবিন্দ ধর্মসভা মন্দিরে পৌঁছে তিনি পূজারি ও ভক্তদের সঙ্গে কথা বলেন, শুভেচ্ছা বিনিময় করেন এবং মন্দির কর্তৃপক্ষের হাতে ১০ লাখ টাকার অনুদানের চেক তুলে দেন।
সফরটি ছিল সময়ের হিসাবে সংক্ষিপ্ত, কিন্তু বক্তব্যে উঠে আসে ধর্মীয় সহাবস্থান, রাজনৈতিক মতপার্থক্য অতিক্রম, সুষম উন্নয়ন ও নাগরিক অধিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রংপুরের মানুষের কাছে সফরটির তাৎপর্য শুধু একজন প্রধানমন্ত্রীর আগমনেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়ন বঞ্চনার অভিযোগ তুলে আসা উত্তরাঞ্চলের মানুষের প্রত্যাশাও নতুন করে সামনে আসে।
সৈয়দপুর থেকে রংপুর, সড়কে অভ্যর্থনা
মঙ্গলবার সকাল ৯টার দিকে ঢাকার তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে সামরিক বিমানে রওনা হন প্রধানমন্ত্রী। সকাল ৯টা ৫০ মিনিটে নীলফামারীর সৈয়দপুর বিমানবন্দরে পৌঁছালে তাঁকে স্বাগত জানান সরকারের মন্ত্রী, স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তাঁদের মধ্যে ছিলেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজ উন নবী চৌধুরী ডন, বিভাগীয় কমিশনার জাহাঙ্গীর আলম, জেলা প্রশাসক ইশরাত জাহান এবং পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোজাম্মেল হকসহ অন্যরা।
বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে সড়কপথে রংপুরের উদ্দেশে যাত্রা করেন প্রধানমন্ত্রী। তারাগঞ্জ ও পাগলাপীরসহ মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে সড়কের দুই পাশে দাঁড়িয়ে তাঁকে শুভেচ্ছা জানান নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ। গাড়িবহর থেকে হাত নেড়ে তাঁদের অভিবাদনের জবাব দেন তিনি। পথে দুটি স্থানে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে দেশের ও জনগণের কল্যাণে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
ধর্মসভা মন্দিরে সম্প্রীতির বার্তা
বেলা ১২টা ৪ মিনিটের দিকে রংপুর নগরের ঐতিহাসিক রাধা গোবিন্দ ধর্মসভা মন্দির প্রাঙ্গণে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও শিশুদের নৃত্য পরিবেশনার মধ্য দিয়ে তাঁকে স্বাগত জানানো হয়। মন্দির কমিটির সভাপতি ভবতোষ সরকার বাচ্চু, সাধারণ সম্পাদক খোকন সরকার, বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদ রংপুর জেলার সভাপতি রাম জীবন কুণ্ডু, মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক প্রশান্ত কুমার রায় ও মহানগর নাগরিক কমিটির সদস্যসচিব পলাশ কান্তি নাগ তাঁকে অভ্যর্থনা জানান।
পূজামণ্ডপ পরিদর্শনকালে প্রধানমন্ত্রী পূজারি ও ভক্তদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। উপস্থিত মানুষের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাঁদের শুভেচ্ছার জবাব দেন। ভক্তদের অনুরোধে তাঁদের সঙ্গে সেলফিও তোলেন।
পরে শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে আয়োজিত শুভেচ্ছা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তারেক রহমান বলেন, হাজার বছর ধরে এ দেশের বিভিন্ন ধর্মের মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে একসঙ্গে বসবাস করে আসছেন। আগামী হাজার বছরও যেন তাঁরা একইভাবে সম্প্রীতি ও শান্তির সঙ্গে বসবাস করতে পারেন, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, ধর্ম-বর্ণ, দল-মত ও শ্রেণি-পেশা নির্বিশেষে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে সরকার একটি শান্তিপূর্ণ, গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে চায়। প্রত্যাশিত বাংলাদেশ নির্মাণে সব ধর্মের মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
‘যাঁরা ভোট দিয়েছেন, যাঁরা দেননি—সবার সরকার হতে চাই’
নির্বাচনী রাজনীতির বিভাজন পেরিয়ে সব নাগরিকের জন্য কাজ করার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোনো এলাকায় বিএনপির প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন, আবার কোনো এলাকায় হননি। কিন্তু সরকার শুধু ভোট দেওয়া মানুষের নয়, ভোট না দেওয়া নাগরিকদেরও সেবা দিতে চায়।
মহান মুক্তিযুদ্ধ, গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এসব ঐতিহাসিক পর্বে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে অংশ নিয়েছেন। সেই ঐক্য ধরে রেখেই ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে বিতর্ক ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি না করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোনো বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলে তা জাতীয় সংসদে আলোচনা করা যেতে পারে। জনগণের প্রতিনিধিদের আলোচনার মাধ্যমে রাষ্ট্র ও জনগণের কল্যাণে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন, সন্তানদের শিক্ষাকার্যক্রম, স্বাস্থ্যসেবা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থান যেন ব্যাহত না হয়, সে বিষয়েও দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বান জানান তিনি।
রংপুরের উন্নয়নে সুষম বণ্টনের আশ্বাস
রংপুরের উন্নয়ন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের সব অঞ্চলে ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন এবং সরকারি সেবা-সুবিধার ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করতে চায় সরকার। তবে দেশের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে উন্নয়ন কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে।
তিনি রংপুর সিটি করপোরেশনের উন্নয়নে প্রায় ১ হাজার ৮১০ কোটি টাকার বরাদ্দের কথা উল্লেখ করেন। পাশাপাশি জেলার উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়ে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সড়ক, সেতু, কালভার্ট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগের কথা জানান।
রংপুরের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন-প্রত্যাশার প্রেক্ষাপটে এ বক্তব্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। উত্তরাঞ্চলের মানুষের প্রত্যাশা, উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি যেন বাস্তব প্রকল্প, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হয়।
মন্দিরের অবকাঠামো নির্মাণে সহযোগিতার আশ্বাস
ধর্মসভা মন্দিরের পেছনে হোস্টেলের মতো একটি অবকাঠামো নির্মাণে আর্থিক সহায়তার বিষয়টি বিবেচনা করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিমন্ত্রীকে নির্দেশনা দেওয়ার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে মন্দির কর্তৃপক্ষের হাতে ১০ লাখ টাকার অনুদানের চেক তুলে দেন তিনি।
অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের সঞ্চালনায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকার, বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক জয়ন্ত কুমার কুণ্ড, সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলাল ও নিপুণ রায় চৌধুরী বক্তব্য দেন।
এ ছাড়া মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক এম জেড এম জাহিদ হোসেন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদসহ রংপুরের সংসদ সদস্য ও স্থানীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রত্যাশার কেন্দ্রে রংপুর
প্রধানমন্ত্রীর এ সফর ছিল শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষ্যে তিন নগরীতে পূজামণ্ডপ পরিদর্শনের কর্মসূচির অংশ। রংপুরের কর্মসূচি শেষে তিনি রাজশাহীর উদ্দেশে রওনা হন, পরে চট্টগ্রাম সফরও নির্ধারিত ছিল।
রংপুরবাসীর কাছে সফরের দৃশ্যমান দিক ছিল সড়কের দুই পাশে মানুষের উপস্থিতি, মন্দিরে শুভেচ্ছা বিনিময় এবং প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য। তবে এ সফরের দীর্ঘমেয়াদি তাৎপর্য নির্ভর করবে সম্প্রীতির বার্তা কতটা বাস্তবে প্রতিফলিত হয় এবং উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তার ওপর।
প্রথম সফরে প্রধানমন্ত্রী যে শান্তি, ঐক্য ও সুষম উন্নয়নের কথা বলেছেন, তা রংপুরের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার সঙ্গেও সম্পর্কিত। এখন তাঁদের নজর থাকবে প্রতিশ্রুত উদ্যোগের বাস্তব অগ্রগতি, অবকাঠামো উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং নাগরিক সেবার মানোন্নয়নের দিকে।
সময়ের আলো/এনএন