গ্রাফিক : সময়ের আলো কুয়াশাভেজা শিউলি ফুলের গন্ধে মাতোয়ারা হয়ে শরতের সকালে পূজামণ্ডপে ছুটে যাওয়ার স্মৃতি এখনও চোখে ভেসে ওঠে। মহালয়ার ভোরে চণ্ডীপাঠ শোনার মধ্য দিয়ে পূজার আমেজ উপভোগ করতাম। শিক্ষক বাবা খুব বেশি বোনাস পেতেন না। তাই নতুন পোশাকের জন্য বাবার দিকে চেয়ে থাকতাম। নতুন কাপড় কিনে সেলাই করে গায়ে না জড়ানো পর্যন্ত শান্তি পেতাম না। লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, কিশোর কুমার ও মান্না দের আধুনিক গান শুনে পূজার সকাল শুরু হতো।
পূজার কয়েক দিন আগে থেকেই মনে একধরনের উত্তেজনা কাজ করত। বন্ধুরা নতুন জামা-জুতা কিনে দেখাত। আমিও বন্ধুদের আমার নতুন জামা দেখাতাম। বাবা পূজার সময় নতুন কাপড় কিনেছেন কি না, তা নিয়ে ভাবতাম। সন্তানদের নতুন পোশাক দিতে পারলেই তিনি আনন্দ পেতেন। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের একজন বাবার সন্তানের প্রতি ভালোবাসা ও মমত্ববোধ পূজার এই কেনাকাটার মধ্য দিয়েই অনেকটা বোঝা যায়।
দেশের অর্থনীতি আগের তুলনায় অনেক পরিবর্তিত হয়েছে। দুর্গাপূজার আয়োজনেও এসেছে নানা পরিবর্তন। প্রতিমা, মণ্ডপসজ্জা ও আলোকসজ্জায় যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন ভাবনা। তবে অনেক ক্ষেত্রে থিমনির্ভর পূজার আয়োজনও অর্থের প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে। যারা বেশি অর্থ ব্যয় করতে পারেন তাদের আয়োজনও হয়ে ওঠে বিশাল। কম বা বেশি অর্থ ব্যয় করে পূজা করা বড় কথা নয়। আসল বিষয় হলো, কতটা ভক্তি ও আন্তরিকতা নিয়ে পূজা করা হচ্ছে।
কখনো কখনো দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও আত্মপ্রচারের প্রবণতাও দেখা যায়। বিভিন্ন পূজামণ্ডপে বিচারকরা আসেন সেরা আয়োজন বেছে নিতে। কোন প্রতিমা শ্রেষ্ঠ, কার আলোকসজ্জা সবচেয়ে সুন্দর, কোন অসুরের প্রতিকৃতি বেশি আকর্ষণীয়— এসব নিয়ে চলে প্রতিযোগিতা। অথচ কোনো মণ্ডপের আয়োজকরা কোটি টাকা ব্যয় করেও যদি অনাহারি মানুষের একবেলার খাবারের ব্যবস্থা না করেন, পাড়ার দরিদ্র পরিবারের শিশুদের নতুন পোশাক কিনে দিতে না পারেন তা হলে সেই আয়োজনের মানবিক সার্থকতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। শুধু আড়ম্বর দিয়ে দেবীর আশীর্বাদ পাওয়া যায় কি না, তা নিয়ে ভাবার অবকাশ রয়েছে।
অনেকে পূজায় বড় অঙ্কের অনুদান দিয়ে আত্মপ্রচারে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। কিন্তু হৃদয়ে ভালোবাসা না থাকলে এই প্রচার ক্ষণস্থায়ী। ভালোবাসা আমাদের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান অনুভূতিগুলোর একটি। এই ভালোবাসার কারণেই মানুষ যুগ যুগ ধরে প্রিয়জনদের আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায়। স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্পর্ক, মা-বাবার সঙ্গে সন্তানের বন্ধন— সবকিছুর মূলে রয়েছে ভালোবাসা। যে সন্তানদের মা-বাবা পরম মমতায় বড় করে তোলেন, সেই সন্তান যখন তাদের অবহেলা করে বা ত্যাগ করে, তখন মা-বাবার ভালোবাসা ও ত্যাগের প্রতি অবিচার করা হয়।
ভালোবাসার নামে সহিংসতা ও নির্যাতনের ঘটনাও আমাদের সমাজে দেখা যায়। প্রেমের সম্পর্কের অজুহাতে ধর্ষণ কিংবা বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানানোর কারণে প্রেমিকার ওপর অ্যাসিড নিক্ষেপ কোনোভাবেই ভালোবাসা হতে পারে না। ভালোবাসার প্রকৃত অর্থ হলো শ্রদ্ধা, দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা ও অপরের স্বাধীনতাকে সম্মান করা। অসংখ্য কবিতা, গান, প্রবন্ধ, নাটক ও চলচ্চিত্রে ভালোবাসা নানাভাবে প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু ভালোবাসার প্রকৃত মূল্যায়ন হয় আমাদের দৈনন্দিন আচরণে।
আমরা যার পূজা করি, সেই পরম করুণাময়ের প্রতি ভালোবাসার পাশাপাশি তার সৃষ্টির প্রতিও ভালোবাসা থাকা প্রয়োজন। ভালোবাসতে হবে মা-বাবা, স্ত্রী, সন্তান, আত্মীয়স্বজন ও প্রিয়জনদের। ভালোবাসতে হবে চারপাশের অনাহারি মানুষকে এবং আগামী দিনের শিশুদের, যাদের মধ্যে লুকিয়ে আছে ভবিষ্যতের সম্ভাবনা। ভালোবাসতে হবে সৃষ্টির সবকিছুকে। এই ভালোবাসাই আমাদের আত্মাকে সতেজ রাখে এবং জীবনকে অর্থবহ করে তোলে। আমরা যার আরাধনা করি, তার সৃষ্ট মানুষের প্রতিও যদি ভালোবাসা দেখাতে না পারি, তা হলে সেই আরাধনার পূর্ণতা কোথায়?
পূজার মাঙ্গলিক দ্রব্যাদি কেনার সময়ও সতর্ক থাকা প্রয়োজন, যাতে ভেজাল বা নিম্নমানের সামগ্রী কেনা না হয়। প্রায়ই দেখা যায়, আলোকসজ্জা, শব্দব্যবস্থা, খাবার ও বিভিন্ন ধরনের থিমের জন্য পূজার বাজেট বাড়ে। অথচ মাঙ্গলিক দ্রব্যাদি কেনার ক্ষেত্রে ব্যয় সংকোচন করা হয়। পূজার প্রতিটি আয়োজনেই শুদ্ধতা, আন্তরিকতা ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় থাকা দরকার। দেবীকে আপন করে ভালোবাসতে হলে তার আদর্শ ও মানবিক শিক্ষাকেও জীবনে ধারণ করতে হবে।
দুর্গাপূজার ইতিহাসেও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তনের চিত্র পাওয়া যায়। একসময় বিত্তশালী জমিদার ও রাজপরিবারগুলো ঘটা করে দুর্গাপূজার আয়োজন করত। তাহিরপুরের রাজা কংসনারায়ণের পূজার কথা ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। প্রচলিত ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগে রাজা কংসনারায়ণ সাড়ে আট লাখ টাকা ব্যয়ে শারদীয় দুর্গোৎসবের আয়োজন করেন। পূজাটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল বারনই নদের পূর্ব তীরে রামরামা গ্রামের দুর্গামন্দিরে। বাংলার হিন্দু সমাজে স্মরণীয় হয়ে থাকার আকাঙ্ক্ষা থেকে তিনি একটি মহাযজ্ঞ আয়োজন করতে চেয়েছিলেন। এ বিষয়ে পরামর্শ নিতে তিনি তার পরগনার শাস্ত্রজ্ঞ ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের দরবারে আহ্বান করেন।
রাজা কংসনারায়ণের ইচ্ছার কথা শুনে পণ্ডিত রমেশ শাস্ত্রী তাকে দুর্গোৎসব আয়োজনের পরামর্শ দেন বলে প্রচলিত বর্ণনায় জানা যায়। তার মতে, বিশ্বজিৎ, রাজসূয়, অশ্বমেধ ও গো-মেধ— এই চারটি মহাযজ্ঞের মধ্যে প্রথম দুটি কেবল সার্বভৌম সম্রাটরা করতে পারতেন, আর পরের দুটি কলিযুগে নিষিদ্ধ। তাই কংসনারায়ণের জন্য দুর্গোৎসবই ছিল উপযুক্ত। সমবেত পণ্ডিতরা তার এই মত সমর্থন করেন। আজও বাঙালির শারদীয় দুর্গোৎসবে সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করা যায়।
পরবর্তী সময়ে কংসনারায়ণের বংশধর লক্ষ্মীনারায়ণের আমলে বাংলার সুবেদার শাহ সুজা বারনই নদের পূর্ব তীরে অবস্থিত রাজা কংসনারায়ণের প্রাসাদ ধ্বংস করে দেন বলে ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে। কংসনারায়ণ বছরে দুবার তাহিরপুরের জমিদারি পরিদর্শনে আসতেন— দোলের সময় এবং দুর্গাপূজায়। তার পূজার আয়োজন আজও ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। একইভাবে শোভাবাজারের রাজা নবকৃষ্ণ দেবও নিজের প্রাসাদে জাঁকজমকপূর্ণ দুর্গাপূজার আয়োজন করেছিলেন। এসব পূজার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের নানা অধ্যায়।
সময়ের পরিবর্তনে বিত্তশালী জমিদার ও বাবুদের প্রভাব কমতে শুরু করে। দুর্গাপূজাও ধীরে ধীরে জমিদারবাড়ির সীমানা পেরিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, ১৭৯০ সালে পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার বলাগড় থানার গুপ্তিপাড়ায় বারো বন্ধুর উদ্যোগে বারোয়ারি পূজার প্রচলন ঘটে। ‘বারো’ ও ‘ইয়ার’ শব্দের সমন্বয় থেকে ‘বারোইয়ারি’ বা ‘বারোয়ারি’ নামের উৎপত্তি বলে একটি জনশ্রুতি রয়েছে। এই পূজার আয়োজন করতে গিয়ে তারা নানা বাধার মুখে পড়েছিলেন বলেও প্রচলিত কাহিনিতে উল্লেখ আছে। একপর্যায়ে এক নবীন ব্রাহ্মণ পূজার পৌরোহিত্য করতে এগিয়ে আসেন।
বারোয়ারি পূজার মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজা জমিদারদের প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে সাধারণ মানুষের উৎসবে পরিণত হওয়ার পথ পায়। দেবী হয়ে ওঠেন সবার। এই পরিবর্তন দুর্গোৎসবকে আরও বিস্তৃত সামাজিক পরিসর দিয়েছে। আজ দুর্গাপূজা শুধু ধর্মীয় আচার নয়; এটি বাঙালির সংস্কৃতি, সম্প্রীতি ও মিলনমেলারও উপলক্ষ।
মায়ের আগমনবার্তাকে উৎসবমুখর পরিবেশে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি তার মানবিক শিক্ষাও আমাদের জীবনে ধারণ করতে হবে। পূজার আনন্দ যেন শুধু আলোকসজ্জা, প্রতিমার সৌন্দর্য কিংবা অর্থের প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ না থাকে। সেই আনন্দ ছড়িয়ে পড়ুক দরিদ্র মানুষের ঘরে, অসহায় শিশুর মুখে এবং অবহেলিত মানুষের জীবনে। পূজার প্রকৃত সার্থকতা তখনই, যখন ভক্তির সঙ্গে মানবিকতা, আনন্দের সঙ্গে সহমর্মিতা এবং দেবীবন্দনার সঙ্গে মানুষের প্রতি ভালোবাসা যুক্ত হয়। দুর্গোৎসব হোক সবার, তার আনন্দও পৌঁছে যাক সবার কাছে।
সনাতন ধর্মীয় বক্তা ও প্রাবন্ধিক
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা