সংগৃহীত ছবিদেশে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো, বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা এবং এ খাতের কার্যক্রম সুশৃঙ্খল করতে ‘বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন অধ্যাদেশ, ২০২৬’ জারি করেছে সরকার। অধ্যাদেশ অনুযায়ী, সৌরবিদ্যুতের বিদ্যুৎ বা যন্ত্রাংশ চুরি করলে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে। এ ছাড়া সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার যন্ত্রাংশের ক্ষতিসাধন করলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। রোববার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভা বৈঠকে এর খসড়ায় নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়ার পরের দিন সোমবার রাতে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় অধ্যাদেশটি জারি করে।
অধ্যাদেশ অনুযায়ী, সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, সরকারি কোম্পানি ও বাসাবাড়ির ছাদ, আঙিনা, ভবনসংলগ্ন পতিত জমি এবং জলাশয়ে সর্বোচ্চ পাঁচ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা যাবে। এর আওতায় থাকবে সৌরচালিত সেচপাম্প, কোল্ড স্টোরেজ, বৈদ্যুতিক যানবাহনের চার্জিং স্টেশন, চা বাগান, ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ ও কৃষিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা। তবে বৃহৎ ভূমিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প এ অধ্যাদেশের আওতায় পড়বে না।
অধ্যাদেশ অনুযায়ী সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন ও পরিচালনায় গ্রাহক, সার্ভিস প্রোভাইডার এবং উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি করতে হবে। এতে যন্ত্রপাতির গুণগত মান, নিরাপত্তা, রক্ষণাবেক্ষণ, বিদ্যুতের বণ্টন, বিল পরিশোধ, মালিকানা, চুক্তির মেয়াদ ও বিরোধ নিষ্পত্তির বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে। মেয়াদোত্তীর্ণ যন্ত্রপাতি ফেরত নেওয়া এবং ই-বর্জ্য নিরাপদে ব্যবস্থাপনার বিষয়ও চুক্তিতে রাখতে হবে।
অধ্যাদেশে নেট-মিটারিংয়ের সুযোগ রাখা হয়েছে। এ ব্যবস্থায় গ্রাহক নিজের সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ব্যবহারের পর উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করতে পারবেন। গ্রিডে দেওয়া বিদ্যুতের পরিমাণ বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। এরপরও বিদ্যুৎ উদ্বৃত্ত থাকলে সরকার নির্ধারিত ট্যারিফ অনুযায়ী তার মূল্য পাওয়া যাবে। এ ছাড়া সরকার নেট-মিটারিংয়ে প্রণোদনা দিতে পারবে। সৌরবিদ্যুৎ কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়নে ক্যাপেক্স মডেলে সীমিত দরপত্র পদ্ধতিতে পণ্য ও সংশ্লিষ্ট সেবা কেনার আর্থিক সীমা সর্বোচ্চ পাঁচ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট (ই-জিপি) ব্যবহার বাধ্যতামূলক হবে না। যোগ্য সার্ভিস প্রোভাইডারদের জেলাভিত্তিক তালিকা তৈরি করা হবে এবং প্রতিযোগিতার মাধ্যমে গ্রাহক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করবে। তবে গ্রাহক চাইলে উন্মুক্ত দরপত্রের (ওপেক্স) মাধ্যমেও প্রতিষ্ঠান বেছে নিতে পারবেন।
সৌরবিদ্যুতের বিস্তার ও নীতিগত দিক-নির্দেশনার জন্য জাতীয় পলিসি কাউন্সিল গঠন করার কথা বলা হয়েছে অধ্যাদেশে। এতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং সংশ্লিষ্ট সচিবরা থাকবেন। কাউন্সিল বিনিয়োগ, নেট-মিটারিং, প্রণোদনা ও ট্যারিফ কাঠামোর অগ্রগতি পর্যালোচনা করবে।
অধ্যাদেশের ১২ ধারায় বলা হয়েছে, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা থেকে বিদ্যুৎ বা যন্ত্রাংশ চুরি করলে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। চোরাই বলে জানা সত্ত্বেও যন্ত্রাংশ কেনা, বিক্রি বা নিজের হেফাজতে রাখলেও একই শাস্তি হবে।
১৩ ধারায় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার যন্ত্রাংশের ক্ষতিসাধন করলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। ১৪ ধারা অনুযায়ী, উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমতি ছাড়া সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা থেকে অন্য কাউকে অবৈধ সংযোগ দিলে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড বা পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
১৫ ধারায় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন, সংযোগ, পরিদর্শন বা রক্ষণাবেক্ষণের কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তা, কর্মচারী কিংবা সার্ভিস প্রোভাইডারকে বাধা দেওয়ার শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে। এ অপরাধে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড বা পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড দেওয়া যাবে।
১৬ ধারা অনুযায়ী, এ অধ্যাদেশের অধীন কোনো অপরাধ সংঘটনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহায়তা, ষড়যন্ত্র বা প্ররোচনা দিয়ে অপরাধ সংঘটিত করালে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিও মূল অপরাধের জন্য নির্ধারিত একই দণ্ড পাবেন।
অধ্যাদেশের অধীন অপরাধের বিচার প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে হবে। এসব অপরাধ মোবাইল কোর্ট আইনের তফসিলভুক্ত হলে মোবাইল কোর্টেও বিচার করা যাবে। তদন্ত, তল্লাশি, জব্দ, গ্রেফতার ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক কার্যক্রমে অধ্যাদেশের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ না হলে ফৌজদারি কার্যবিধি প্রযোজ্য হবে।
বর্তমানে সংসদ অধিবেশন চলমান না থাকায় রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করেছেন। সংসদের অধিবেশন আগামী ১৫ নভেম্বর আহ্বান করা হয়েছে। ওই দিন সংসদে অধ্যাদেশটি উত্থাপন করা হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা