ইউরোপজুড়ে ডানপন্থায় ঝোঁক

তৌহিদুজ্জামান সোহান

আন্তর্জাতিক

জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, আবাসন সংকট, অভিবাসন বিতর্ক এবং মূলধারার রাজনীতির প্রতি অনাস্থা— সব মিলিয়ে ইউরোপের রাজনৈতিক মানচিত্রে বাড়ছে ডানপন্থি

2026-10-21T02:46:18+00:00
2026-10-21T02:46:18+00:00
 
  বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬,
৫ কার্তিক ১৪৩৩
বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
ইউরোপজুড়ে ডানপন্থায় ঝোঁক
তৌহিদুজ্জামান সোহান
প্রকাশ: বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬, ২:৪৬ এএম 
ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে সহিংস বিক্ষোভ চলাকালে রায়ট গিয়ারে সজ্জিত পুলিশ সদস্যরা। ছবি : সংগৃহীত
জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, আবাসন সংকট, অভিবাসন বিতর্ক এবং মূলধারার রাজনীতির প্রতি অনাস্থা— সব মিলিয়ে ইউরোপের রাজনৈতিক মানচিত্রে বাড়ছে ডানপন্থি জনতুষ্টিবাদের প্রভাব। ইউরোপের সিসিলির কৃষিজমি থেকে ফ্রান্সের রাজপথ, পর্তুগালের আবাসনবিরোধী আন্দোলন থেকে পূর্ব জার্মানির তরুণ ভোটারদের রাজনৈতিক পছন্দ বিভিন্ন ঘটনার মধ্যে একটি অভিন্ন প্রশ্ন সামনে আসছে। সেটি হলো— প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থা কি সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে ইউরোপের অনেক ভোটার এমন রাজনৈতিক শক্তির দিকে ঝুঁকছেন, যারা জাতীয় স্বার্থ, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, কঠোর অভিবাসননীতি এবং প্রচলিত ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে।

রাতারাতি জ্বালানির আকাশচুম্বী দাম ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রার অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপে যখন পুরো ইউরোপের সাধারণ পরিবার এবং ছোট-বড় ব্যবসার শ্বাস রুদ্ধ হওয়ার জোগাড়; ঠিক তখনই এই অর্থনৈতিক সংকট আগামী বছরে আসন্ন নির্বাচনগুলোর আগে ফ্রান্স, ইতালি ও পোল্যান্ডের মতো দেশগুলোতে উগ্র-ডানপন্থি দলগুলোকে এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক গতি এনে দিচ্ছে। অতীতে যেসব রাজনৈতিক দলকে প্রান্তিক বা চরমপন্থি মনে করা হতো, ইউরোপজুড়ে গ্রামীণ ফ্রান্সের গাড়িচালক থেকে শুরু করে পূর্ব জার্মানির তরুণ ভোটাররা এখন মূলধারার বিকল্প হিসেবে ডানপন্থিদের প্রতি ব্যাপকভাবে ঝুঁকে পড়ছে। 

ইউরোপের দক্ষিণতম প্রান্ত ইতালির সিস্টার্নে অবস্থিত জিলা শহরের রাজপথে যখন একের পর এক ট্র‍্যাক্টর এসে জমা হচ্ছিল, তখন তাদের ট্রাকে পত পত করে উড়ছিল মেডুসা ও গম ক্ষেতের প্রতীক আঁকা ঐতিহ্যবাহী সিসিলিয়ান পতাকা। যে সিসিলি রোমান আমল থেকেই ইউরোপের শস্যভান্ডার হিসেবে পরিচিত। তবে এবার কৃষকরা কোনো ফসল কাটার আনন্দের গান নিয়ে আসেননি, এসেছেন প্রতিবাদ জানাতে। 

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ছড়িয়ে পড়া যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত পুরো বিশ্ববাজারে জ্বালানি মূল্যকে এক ধাক্কায় বহুদূর বাড়িয়ে দিয়েছে, যা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বাজেট ঘাটতি মেটাতে হিমশিম খাওয়া ইউরোপীয় সরকারগুলোর জন্য চরম দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। জনগণের জমানো এই চরম অসন্তোষ এখন আর কেবল ড্রয়িংরুমে সীমাবদ্ধ নেই, তা আছড়ে পড়েছে ইউরোপের মূল রাজপথে।

প্রথমে আসা যাক ফ্রান্সের কথায়। প্যারিসের উত্তরাঞ্চলীয় শহরতলিতে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা অবকাঠামোর প্রতিবাদ দিয়ে যে বিক্ষোভের সূচনা হয়েছিল, তা এখন সাম্প্রতিক দশকের সবচেয়ে বড় ও সহিংস বিশৃঙ্খলায় রূপ নিয়েছে দেশটিতে। ফ্রান্সজুড়ে শত শত দোকানপাট লুটপাট করা হয়েছে, ভবনে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে এবং লিমোজেস শহরের উনিশ শতকের একটি ঐতিহাসিক সিটি হল সম্পূর্ণ পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। নান্তেসের রাজপথে নামা ২১ বছর বয়সি ফরাসি তরুণ কেয়েন্তিন লেভিলু ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমি কেন এখানে এসেছি? খুব সাধারণভাবে বললে, বর্তমান জীবনযাত্রার যে ব্যয়ভার, তা সত্যি বলতে আমার কাছে খুবই ভীতিকর মনে হচ্ছে।

তিনি বলেন, খাদ্য, জ্বালানি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় সবকিছুর অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধির দিকে তাকিয়ে একবার চিন্তা করুন সেসব মানুষের কথা— যারা কোনোক্রমে কেবল ন্যূনতম মজুরি (মিনিমাম ওয়েজ) টুকু পান। সবকিছু যেভাবে আকাশচুম্বী আর অস্বাভাবিক রকমের ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে, তা এক কথায় মারাত্মক আতঙ্কের।

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন-ইরান যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, তাতে কেবল ইউরোপীয় কমিশনের হিসেবেই বাণিজ্য ও জ্বালানি খাতে ইউরোপের সরাসরি আর্থিক ক্ষতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ইউরো (১১২ বিলিয়ন ডলার)। ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম প্রায় ১৪০ শতাংশ বেড়েছে এবং ডিজেলের দাম হয়েছে প্রায় দ্বিগুণ।

সাপ্তাহিক ছুটির দিনে দেওয়া এক ভাষণে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ জ্বালানি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির ফলে তৈরি হওয়া ভুক্তভোগী সাধারণ বিক্ষোভকারীদের ‘যৌক্তিক দাবি’—কে স্বীকার করে নেন। তবে এর সঙ্গে সঙ্গে ধ্বংসযজ্ঞ ও লুটপাটে জড়িতদের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, দাবি-দাওয়া তুলে ধরা সাধারণ মানুষের সঙ্গে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড, ভাঙচুর ও লুটপাটকারীদের কখনোই গুলিয়ে ফেলা উচিত হবে না।

এই ক্ষোভের ঢেউ কেবল ফ্রান্সে সীমাবদ্ধ নেই, ছড়িয়ে পড়েছে ইউরোপের অন্যান্য দেশেও। ইতালির উত্তরাঞ্চলীয় বিত্তশালী শহর মিলানে বাজে নাগরিক সেবা এবং নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে রাজপথে নামা বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে গত রোববার পুলিশের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়; যেখানে পাথর নিক্ষেপ ও দোকানপাট লুটপাটের মতো ঘটনাও ঘটে। অন্যদিকে সিসিলির জিলা শহরে কৃষকরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, জ্বালানির চরম দামের কারণে খামার চালানো এখন অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ব্যানার হাতে এক কৃষক ক্ষোভ প্রকাশ করে লেখেন, আমরা জমিতে ফসল ফলাই, আর ঘরে তুলি ঋণের বোঝা। কৃষক প্রতিনিধি আর্কানজেলো গ্যাম্বিনো জানান, তাদের জ্বালানি খরচ দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে যাওয়ায় পুরো কৃষি উৎপাদন থমকে গেছে। দক্ষিণাঞ্চলে ট্রাক, খামার ও ইস্পাত শ্রমিকদের সড়ক অবরোধের ফলে জ্বালানি সংকট ও সুপারমার্কেটে নিত্যপণ্যের যোগানে মারাত্মক ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে নিম্ন মজুরি, চরম আবাসন সংকট এবং জীবনযাত্রার লাগামহীন ব্যয়ের প্রতিবাদে হাজার হাজার মানুষ শনিবার রাজপথে নেমে আসেন। এই বিক্ষোভ দেশটির মধ্য-ডানপন্থি সরকারের ওপর প্রচণ্ড এক চাপ সৃষ্টি করেছে। স্পেনে ৮৭ বছরের এক বৃদ্ধাকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদের ঘটনায় দেশজুড়ে আবাসন সংকটের বিরুদ্ধে বিশাল গণআন্দোলন গড়ে উঠেছে, যা পরবর্তীতে আগামী মাসের আগাম নির্বাচন ত্বরান্বিত করার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দাঁড়ায়।

বেলজিয়ামে জীবনযাত্রার মান নিয়ে বিক্ষোভের পাশাপাশি আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানায় সরকারি দুর্নীতি, চরম বেকারত্ব এবং বাজে শিক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিশাল গণসমাবেশ আয়োজিত হয়। এসব বিক্ষোভ ইউরোপজুড়ে অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে জনমনের আশঙ্কা ও উৎকণ্ঠারই প্রতিফলন। ফ্রান্সের স্বনামধন্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সায়েন্সেস পো’র বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিজ্ঞানী জিল ইভালদির মতে, ইউরোপজুড়ে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাওয়া এবং জীবনযাত্রার তীব্র সংকটই বর্তমানে মহাদেশটির রাজনীতিতে পপুলিস্ট বা জনতুষ্টিবাদী ধারা চাঙ্গা হওয়ার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতজনিত বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের পর সৃষ্ট এই অর্থনৈতিক চাপে ইউরোপের মূলধারার রাজনীতি এক নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এর ফলে উগ্র-ডানপন্থি এবং কট্টর বামপন্থি— উভয় প্রান্তের রাজনীতিকরাই অত্যন্ত সোচ্চারভাবে দাবি করে চলেছেন যে, রাশিয়ার সঙ্গে ভেঙে যাওয়া জ্বালানি সম্পর্ক পুনরায় জোড়া লাগালেই কেবল এ অঞ্চলে জ্বালানি ও গ্যাস সরবরাহ খরচ সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা সম্ভব।

এমন অবস্থায় ফ্রান্সে আগামী এপ্রিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে ডানপন্থি ‘ন্যাশনাল র‍্যালি’র শীর্ষ নেত্রী মারিন ল্য পেন জ্বালানির দামকে তার নির্বাচনি প্রচারের মূল হাতিয়ার বানিয়েছেন। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁর জনপ্রিয়তার পারদ যেখানে নামছে, সেখানে ল্য পেনের জনপ্রিয়তা ক্রমেই বাড়ছে। জ্বালানির ওপর মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট বহুগুণ কমানোর যে প্রস্তাব ল্য পেন দিয়েছেন, তা সাধারণ ফরাসি নাগরিকদের মাঝে বিপুল ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা
  বিষয়:   ইউরোপ  ডানপন্থা  ঝোঁক  আন্তর্জাতিক  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: