প্রতীকী ছবিরাষ্ট্রায়ত্ত ছয়টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে নিয়োগের যোগ্যতার শর্ত শিথিল করেছে সরকার। নতুন সংশোধনী অনুযায়ী এসব ব্যাংকের এমডি হতে উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) পদে দুই বছরের অভিজ্ঞতা আর বাধ্যতামূলক থাকছে না। তবে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অন্তত ২০ বছরের কাজের অভিজ্ঞতা থাকার শর্ত বহাল রয়েছে। গত ৯ মাসে একই নিয়োগ নীতিমালা তিনবার সংশোধন করায় এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো হলো— সোনালী, রূপালী, অগ্রণী, জনতা, বেসিক ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক পিএলসি (বিডিবিএল)।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ গত সোমবার নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করে নীতিমালাটি সংশোধন করেছে। তবে মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রজ্ঞাপনটি বিভাগের ওয়েবসাইটে আপলোড করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত ২৬ জুলাই জারি করা ‘রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক, বিশেষায়িত ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক পদে মনোনয়ন, নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়ন নীতিমালা’ সংশোধন করে নতুন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সংশোধিত নীতিমালায় এমডি পদে নিয়োগের যোগ্যতা ও প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনা হয়েছে।
৯ মাসে তিনবার সংশোধন : এমডি নিয়োগের নীতিমালা ঘন ঘন পরিবর্তনের বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। গত ৯ মাসে তিন দফায় নীতিমালাটি সংশোধন করেছে সরকার। এর আগে গত ১৮ জানুয়ারি প্রথম এবং ২৬ জুলাই দ্বিতীয় দফায় সংশোধন করা হয়েছিল। সবশেষ গত সোমবার তৃতীয় দফায় পরিবর্তন আনা হলো। এর আগের নীতিমালাটি জারি করা হয়েছিল ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে।
সবশেষ সংশোধনের ফলে ডিএমডি পদে অন্তত দুই বছর কাজ করার অভিজ্ঞতা না থাকলেও এমডি পদে নিয়োগের জন্য বিবেচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে প্রার্থীকে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ২০ বছরের কাজের অভিজ্ঞতার শর্ত পূরণ করতে হবে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের শীর্ষ পর্যায়ের এক কর্মকর্তা এ বিষয়ে বলেছেন, প্রয়োজন মনে করলে সরকার যেকোনো সময় নীতিমালা সংশোধন বা নতুন নীতিমালা জারি করতে পারে। তার ভাষ্য অনুযায়ী এবারের সংশোধনের মাধ্যমে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের এমডি হওয়ার সুযোগ বাড়ানো হয়েছে।
নিয়োগপ্রক্রিয়ায় পরিবর্তন : নীতিমালার সংশোধনীতে এমডি নিয়োগের প্রক্রিয়াতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী সরকার সরাসরি নিয়োগ না দিয়ে এমডি পদে প্রার্থীদের মনোনয়ন দেবে। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বাংলাদেশ ব্যাংকের অনাপত্তি সাপেক্ষে নিয়োগ চূড়ান্ত করবে। তবে ছয়টি বিশেষায়িত ব্যাংক, বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন (বিএইচবিএফসি) এবং ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) এমডি নিয়োগের ক্ষমতা সরকারের হাতেই রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া পদোন্নতির ক্ষেত্রে শুধু চাকরির জ্যেষ্ঠতা নয়, কর্মদক্ষতা, নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা, চাকরির রেকর্ড এবং ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে কাজ করার অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ প্রার্থীর পেশাগত দক্ষতা ও দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতাও মূল্যায়নের আওতায় থাকবে।
শিক্ষাগত যোগ্যতা ও যাচাই : নীতিমালা অনুযায়ী এমডি পদে নিয়োগের জন্য প্রার্থীকে স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অন্তত স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী হতে হবে। শিক্ষাজীবনের কোনো পর্যায়ে তৃতীয় বিভাগ বা শ্রেণি গ্রহণযোগ্য হবে না। নিয়োগের ক্ষেত্রে বাছাই কমিটির সুপারিশের পাশাপাশি প্রার্থীর গোয়েন্দা প্রতিবেদন এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রতিবেদন পর্যালোচনার বিধানও রাখা হয়েছে।
রাজনৈতিক পছন্দের প্রার্থী নিয়োগের অভিযোগ : নীতিমালায় বারবার পরিবর্তন আনার পেছনে সরকারের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ব্যাংকারদের একাংশ। তাদের অভিযোগ, রাজনৈতিকভাবে পছন্দের প্রার্থীদের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের এমডি পদে নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ তৈরি করতেই আগে নীতিমালায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। ডিএমডি পদে দুই বছরের অভিজ্ঞতার বাধ্যবাধকতা থাকায় এতদিন এ ধরনের নিয়োগে বাধা তৈরি হচ্ছিল বলে তাদের দাবি। তবে রাজনৈতিক পছন্দের প্রার্থী নিয়োগের অভিযোগের পক্ষে প্রতিবেদনে কোনো নির্দিষ্ট প্রার্থী, নিয়োগের উদাহরণ কিংবা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ উল্লেখ করা হয়নি।
ফলে নীতিমালা সংশোধনের মাধ্যমে যোগ্য প্রার্থীদের জন্য সুযোগ বাড়ানো হয়েছে, নাকি নিয়োগপ্রক্রিয়ায় নির্দিষ্ট প্রার্থীদের সুবিধা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে— তা নির্ধারণে সংশোধনীর বাস্তব প্রয়োগ এবং পরবর্তী নিয়োগপ্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা