কারও গন্তব্য ছিল বাড়ি, কারও জীবিকার তাগিদ— সব হিসাব পাল্টে গেল মুহূর্তেই

সময়ের আলো ডেস্ক

সারাদেশ

কৃষিপণ্যের বীজ কিনে মৌসুমের ব্যবসা শুরু করার স্বপ্ন নিয়ে রাজশাহীর পথে রওনা হয়েছিলেন শরীয়তপুরের জাজিরার সাত ব্যবসায়ী। তাদের পাঁচজনই ফিরলেন

2026-10-21T03:03:16+00:00
2026-10-21T03:06:46+00:00
 
  বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬,
৫ কার্তিক ১৪৩৩
বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬
সারাদেশ
১৪ প্রাণ ঝরল সড়কে
কারও গন্তব্য ছিল বাড়ি, কারও জীবিকার তাগিদ— সব হিসাব পাল্টে গেল মুহূর্তেই
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:০৩ এএম  আপডেট: ২১.১০.২০২৬ ৩:০৬ এএম
বরগুনা থেকে ছেড়ে আসা চাঁপাইনবাবগঞ্জগামী আরপি স্পেশাল পরিবহনের একটি বাস বনপাড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের সামনে পৌঁছলে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি বালুবোঝাই ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।। ছবি : সময়ের আলো
কৃষিপণ্যের বীজ কিনে মৌসুমের ব্যবসা শুরু করার স্বপ্ন নিয়ে রাজশাহীর পথে রওনা হয়েছিলেন শরীয়তপুরের জাজিরার সাত ব্যবসায়ী। তাদের পাঁচজনই ফিরলেন লাশ হয়ে, আহত হলেন বাকি দুজন। একই বাসে কারও গন্তব্য ছিল বাড়ি, কারও জীবিকার তাগিদে ছুটে চলা; কিন্তু নাটোরের বড়াইগ্রামে বাস-ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ মুহূর্তেই সব হিসাব পাল্টে দিল। মঙ্গলবার ভোরের এ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৪ জন, আহত হয়েছেন অন্তত ৩২ জন। নিহতদের মধ্যে আট বছরের শিশু তাছফিয়া যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি, স্ত্রী-সন্তানের ভরসা কিংবা বৃদ্ধ বয়সেও জীবিকার প্রয়োজনে পথে নামা মানুষ। দুর্ঘটনার পর স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে একাধিক জনপদ। অন্যদিকে বাসের চালকের আসনে সুপারভাইজার ছিলেন বলে যাত্রীদের বক্তব্যে উঠে এসেছে; পেছনের আসনে চালক ও তার সহকারী ঘুমাচ্ছিলেন বলেও জানিয়েছেন তারা।

নাটোর ফায়ার সার্ভিস ও বড়াইগ্রাম থানা সূত্রে জানা যায়, গতকাল ভোর ৪টার দিকে বরগুনা থেকে ছেড়ে আসা চাঁপাইনবাবগঞ্জগামী আরপি স্পেশাল পরিবহনের একটি বাস বনপাড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের সামনে পৌঁছলে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি বালুবোঝাই ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলে ৯ জন নিহত হন। পরে বিভিন্ন হাসপাতালে আরও পাঁচজন মারা যান। আহত হন অন্তত ৩২ জন।

নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ৯ জনের পরিচয় জানা গেছে। তারা হলেন— দুর্ঘটনাকবলিত ট্রাকের চালক রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার আবুল কালাম আজাদ (৩২), বাসের সুপারভাইজার (ঘটনার সময় তিনি বাসটি চালাচ্ছিলেন) রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার সোহেল রানা (৩৬), শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার কাজীরহাট গ্রামের সোহাগ হোসেন (৩০), বড়কান্দি গ্রামের জুয়েল রানা (৪০), ডুবিসাহেবের গ্রামের জাহান উদ্দিন মোল্লা (৪৫), কাজীরহাট গ্রামের শাহীন হোসেন (২৫), রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার কোনোপাড়া গ্রামের আনোয়ার হক (৩০), পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার সুবিদখালী গ্রামের শহিদুল ইসলাম (৪০) ও তার মেয়ে তাছফিয়া খাতুন (৮)।

আহত ব্যক্তিদের মধ্যে নিহত শহিদুল ইসলামের স্ত্রী রুবিনা আক্তার বনপাড়া পাটোয়ারী হাসপাতালে ভর্তি আছেন। এখানে আরও চিকিৎসা নিচ্ছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের রমজান আলী (২৮), দিনাজপুরের ইয়াকুব আলী (৩৪), চাঁদপুরের আব্দুস সালাম (২২)। এ ছাড়া আহত ব্যক্তিদের নাটোর সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। তাদের মধ্যে গুরুতর আহত ৭-৮ জনকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

বাসের যাত্রী রমজান আলী বলেন, ‘আমি চালকের দুই সিট পেছনে বসেছিলাম। বাসটি ঈশ্বরদী আসার পর চালক ও হেলপার (চালকের সহকারী) পেছনে গিয়ে বসে। বাসের সুপারভাইজার তখন বাস চালাতে শুরু করেন। ঘণ্টাখানেক পরে বাসটি দুর্ঘটনায় পড়ে।’ দুর্ঘটনার খবর পেয়ে হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজ, জেলা প্রশাসক মোছা. সুমনী আক্তার, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরীফুল হক ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।

একই ধরনের তথ্য দেন ওই বাসের আরও দুই যাত্রী ইয়াকুব আলী ও আব্দুস সালাম। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তারা জানান, দুর্ঘটনার সময় বাসের সুপারভাইজার বাসটি চালাচ্ছিলেন। চালক ও হেলপার (চালকের সহকারী) পেছনের সিটে বসে ছিলেন। বাসটি বরগুনা জেলা শহর থেকে ছেড়ে আসে সোমবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে। ঈশ্বরদীতে কিছু সময় বিরতি দিয়ে আবার বাসটি চালু হওয়ার সময় চালকের আসনে বসেন বাসটির সুপারভাইজার। এর কিছু সময় পর দুর্ঘটনা ঘটে।

কৃষিপণ্য কিনতে গিয়ে প্রাণ গেল শরীয়তপুরের পাঁচ ব্যবসায়ী : রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার তাহেরপুরে কৃষিপণ্য কিনতে যাচ্ছিলেন শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার সাত ব্যবসায়ী। উদ্দেশ্য ছিল মৌসুমের শুরুতে বীজ ও অন্য কৃষিপণ্য কিনে এনে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা। সোমবার সন্ধ্যায় জাজিরার কাজীরহাট বাজার থেকে একসঙ্গে যাত্রা শুরু করেছিলেন তারা। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই তাদের প্রাণ হারান পাঁচ ব্যবসায়ী। আহত হয়েছেন তাদের সঙ্গে থাকা আরও দুই ব্যবসায়ী। পরিবার ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা দীর্ঘদিন ধরে জাজিরার কাজীরহাট বাজার ও আশপাশ এলাকায় ব্যবসা করে আসছিলেন। কৃষিপণ্যের বীজ ও রবিশস্যের মৌসুম শুরু হওয়ায় ব্যবসার জন্য প্রয়োজনীয় পণ্য সংগ্রহ করতে তারা রাজশাহীতে যাচ্ছিলেন।

নিহত পাঁচ ব্যবসায়ীর মধ্যে জুয়েল মাদবর রবিশস্য কেনাবেচার পাশাপাশি কাজীরহাট বাজারে রড-সিমেন্টের ব্যবসা করতেন। সামাদ ফকির ছিলেন রবিশস্য ব্যবসায়ী। শাহিন ব্যাপারি হলুদ কেনাবেচা করতেন। আর সালাল মোল্যা ও সোহাগ শিকদার পেঁয়াজ ও রসুনের বীজের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

জুয়েল মাদবরের ভগ্নিপতি বাদল জমাদ্দার বলেন, জুয়েলের মা-বাবা কেউ বেঁচে নেই। তারা তিন ভাই কাজীরহাট বাজারে ব্যবসা করেন। ভুট্টার বীজ ও ভুট্টা আনতে তিনি রাজশাহী যাচ্ছিলেন। বাদল জমাদ্দার বলেন, ছোট দুই সন্তান ও স্ত্রীকে বাড়িতে রেখে গতকাল বিকালে রাজশাহী যাওয়ার জন্য বের হন জুয়েল। সকালে দুর্ঘটনায় তার মৃত্যুর খবর পেয়েছেন। এভাবে দুর্ঘটনায় তার প্রাণ যাবে, তারা ভাবতে পারেননি।

কাজীরহাট বণিক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘নিহত ব্যবসায়ীদের মরদেহ আনার জন্য আমরা নাটোরের পথে রওনা হয়েছি। আহত ব্যবসায়ীদের স্বজনরা তাদের উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে রাজশাহীতে গেছেন।’

এ ঘটনায় এলাকায় শোক নেমে এসেছে বলে জানান বড়কান্দি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান লুৎফর খলিফা। তিনি বলেন, আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহগুলো নিয়ে আসতে আজ সন্ধ্যা বা রাত হতে পারে। এরপর ব্যবসায়ীদের মরদেহ কাজীরহাট বাজারে নেওয়া হবে। সেখানে একসঙ্গে তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হবে। পরিবারের সদস্যদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দাফনের ব্যবস্থা করা হবে।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা
  বিষয়:   নাটোর  বাস  ট্রাক  সংঘর্ষ  চালক  সুপারভাইজার  সড়ক  প্রাণ  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: