সড়কের বাঁকে বাঁকে মৃত্যু ফাঁদ, আঞ্চলিক সড়কেই বেশি ঝুঁকি

কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা

সারাদেশ

গত ৩ সেপ্টেম্বর সকালে সাদুল্লাপুরে ছেলেকে মোটরসাইকেলে মাদরাসায় নিয়ে যাচ্ছিলেন গোলাম রব্বানী। বিপরীত দিক থেকে আসা বাসের ধাক্কায় বাবা-ছেলে ছিটকে

2026-10-21T12:29:24+00:00
2026-10-21T12:29:24+00:00
 
  বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬,
৫ কার্তিক ১৪৩৩
বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬
সারাদেশ
জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস
সড়কের বাঁকে বাঁকে মৃত্যু ফাঁদ, আঞ্চলিক সড়কেই বেশি ঝুঁকি
কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা
প্রকাশ: বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:২৯ পিএম 
গাইবান্ধা আঞ্চলিক সড়কের বাঁক। ছবি : সময়ের আলো
গত ৩ সেপ্টেম্বর সকালে সাদুল্লাপুরে ছেলেকে মোটরসাইকেলে মাদরাসায় নিয়ে যাচ্ছিলেন গোলাম রব্বানী। বিপরীত দিক থেকে আসা বাসের ধাক্কায় বাবা-ছেলে ছিটকে পড়েন। ঘটনাস্থলেই মারা যান সাদুল্লাপুর সরকারি কলেজের এই হিসাবরক্ষক। আধা ঘণ্টা পরে পলাশবাড়ীর মাঝিপাড়ায় বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে মারা যান মাইক্রোবাসচালক মাসুদ রানা। দুই ঘটনায় আহত অন্তত ১০ জন। দুটিই আঞ্চলিক সড়কে।

২২ অক্টোবর জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস। র‌্যালি ও আলোচনা সভার আগে গাইবান্ধার সড়কের হিসাব বলছে, ঝুঁকি এখন সবচেয়ে বেশি জেলার আঞ্চলিক সড়কে, যেখানে নজরদারি প্রায় নেই।

জাতীয় হিসাবে দুর্ঘটনার ৪০ শতাংশের বেশি ঘটছে আঞ্চলিক সড়কে। গাইবান্ধার ঘটনাগুলোও সেই ছবিই দেখাচ্ছে। মহাসড়কে তদারকি ও টহল আছে, আঞ্চলিক সড়কে নেই।

আঞ্চলিক সড়কে দুর্ঘটনা বেশি
১৯৯৩ সালের ২২ অক্টোবর বান্দরবানে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন জাহানারা কাঞ্চন। এরপর নিসচা বা নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন গড়ে ওঠে। ২০১৭ সালে এই দিনকে সরকার জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস ঘোষণা করে।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে, ২০২৫ সালে সড়কে নিহত ৯ হাজার ১১১ জন। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের (আরএসএফ) হিসাবে ৭ হাজার ৩৫৯ জন, যাঁদের ২ হাজার ৬৭১ জন মোটরসাইকেল আরোহী। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে নিহত ৪২৩ জন, অর্থাৎ দিনে গড়ে ১৪ জন।

আরএসএফের মাসিক প্রতিবেদনে আঞ্চলিক সড়কের ঝুঁকি স্পষ্ট। জুনে ৪৭২টি দুর্ঘটনার ৪১ দশমিক ১০ শতাংশ ঘটেছে আঞ্চলিক সড়কে, জাতীয় মহাসড়কে; ৩২ শতাংশ। সর্বশেষ একটি মাসিক হিসাবে আঞ্চলিক সড়কের অংশ ৪২ দশমিক ৩০ শতাংশ। তবে জুলাইয়ে মহাসড়কে দুর্ঘটনা ১৬৯টি আর আঞ্চলিক সড়কের ১৫৫টি। আঞ্চলিক সড়কের দুর্ঘটনার চেয়ে মহাসড়কে ১৪টি বেশি ছিল। অর্থাৎ আঞ্চলিক সড়ক প্রায় সব মাসেই মহাসড়কের কাছাকাছি বা বেশি প্রাণ নিচ্ছে। বেশির ভাগ দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ হারানো ও মুখোমুখি সংঘর্ষে। জুনে মোট দুর্ঘটনার প্রায় ৩১ শতাংশ মোটরসাইকেলের।

গাইবান্ধার আঞ্চলিক সড়ক : হিসাব যা বলছে
সরকারি পূর্ণাঙ্গ হিসাব নয়, গণমাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনার ভিত্তিতে সংকলিত তথ্য বলছে-

গাইবান্ধা-পলাশবাড়ী সড়ক : ৩১ মে ঠুটিয়াপাকুর এলাকায় বাস খাদে পড়ে রিক্তা খাতুন (২৫) মারা যান; আহত হন সাতজন। ৩ সেপ্টেম্বর মাঝিপাড়ায় (সাঁকোয়া সেতু সংলগ্ন এলাকা) মাসুদ রানা নিহত ও সাতজন আহত। গত বছরের ১৭ অক্টোবর ঢোলভাঙ্গা বাসস্ট্যান্ডের কাছে বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে রাকিব (১৭) নামের এক মোটরসাইকেল আরোহী কিশোর নিহত হন। গাইবান্ধা-পলাশবাড়ী আঞ্চলিক সড়কের ছয় স্থানে হাটবাজার বসায় যানজট ও দুর্ঘটনা বাড়ছে।

বড়দরগাহ-মাদারগঞ্জ-সাদুল্লাপুর-গাইবান্ধা সড়ক : এ বছর অন্তত তিনজন নিহত। ২৪ ফেব্রুয়ারি সাদুল্লাপুরে কার্গো ভ্যান ওভারটেক করতে গিয়ে ইজিবাইকে ধাক্কা দিলে দুজন নিহত হন। ২২ জুলাই ভাতগ্রামে নসিমনের চাকায় পিষ্ট হন ভ্যানচালক জব্বার আলী (৫০)। ৩ সেপ্টেম্বর মারা যান গোলাম রব্বানী।

গাইবান্ধা-সুন্দরগঞ্জ সড়ক : ২৪ মে বামনডাঙ্গা ফিলিং স্টেশনসংলগ্ন এলাকায় ট্রাকের ধাক্কায় মারা যান অবসরপ্রাপ্ত দায়রা জজ আউয়াল সরকার (৫৬)। ট্রাকটি ধরা পড়েনি। গত বছরের ২২ নভেম্বর সুন্দরগঞ্জ পৌর এলাকায় অজ্ঞাত যানের ধাক্কায় এক পথচারীর মৃত্যু হয়।

গাইবান্ধা-দারিয়াপুর সড়ক : ১৯ মে মুরগি বোঝাই পিকআপের মুখোমুখি ধাক্কায় ইজিবাইকের চালক ফরিদ মিয়া ও যাত্রী রুস্তম আলী নিহত, আহত পাঁচজন। পিকআপের চালক পালিয়ে যান।

গাইবান্ধা-নাকাইহাট-গোবিন্দগঞ্জ সড়ক : গত বছরের ২৪ অক্টোবর বাজুনিয়াপাড়ায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও স্যালো-ইঞ্জিনচালিত ট্রলির মুখোমুখি সংঘর্ষে দুজন নিহত, তিনজন আহত।

গাইবান্ধা-সাঘাটা সড়ক : এ বছর আলোচিত প্রাণঘাতী ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। তবে, ২০২৪ সালে ৩০ মার্চ বিলবস্তা নামক এলাকায় সড়ক সংস্কারের কাজে নিয়োজিত একটি দাঁড়িয়ে থাকা মিক্সচার মেশিনের সঙ্গে ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকের ধাক্কায় মা-ছেলে নিহত হন।

তদারকির ফাঁক
ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের গাইবান্ধা অংশ ৩২ কিলোমিটার, গোবিন্দগঞ্জের ফাঁসিতলা থেকে সাদুল্লাপুরের ধাপেরহাট পর্যন্ত। সেখানে হাইওয়ে পুলিশের টহল আছে, ইজিবাইক-নসিমনের চলাচলও তুলনামূলক নিয়ন্ত্রিত। তবে এই মহাসড়কও নিরাপদ নয়। ১৩টি বাঁকে প্রতি বছর সংঘটিত দুর্ঘটনায় মানুষ নিহত ও আহত হচ্ছেন।

বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট ১৩ বাঁকের মধ্যে সাতটিকে চরম দুর্ঘটনাপ্রবণ বলে চিহ্নিত করেছে; হাইওয়ে পুলিশের লাল তালিকায় আছে নয়টি। ফাঁসিতলা, বকচর, বোয়ালিয়া, কালীতলা, চাপড়িগঞ্জ, কোমরপুর, নুনদহ, নুনিয়াগাড়ি, গিরিধারীপুর ও ধাপেরহাট বাজার এসবের অন্তর্ভুক্ত। ২০১৪ থেকে ২০১৯ সালের একটি হিসাবে এই অংশে ৫১১টি দুর্ঘটনায় ১৮৪ জন নিহত ও ৮৬৭ জন আহত হন। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর, ২১ মাসে নথিবদ্ধ গুরুতর দুর্ঘটনা ৪৮টি, নিহত ৪৬ ও আহত ১১২ জন। থানায় মামলা বা জিডি না হওয়া ঘটনা ধরলে প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে বেশি; সমন্বিত অনুমানে দুর্ঘটনা ৬৮ থেকে ৭৮টি, নিহত ৬৫ থেকে ৭৬ ও আহত ১৬০ থেকে ২২০ জন।

মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে এ বছরের ৫ জানুয়ারি সন্ধ্যার দিকে, গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার দরবস্ত ইউনিয়নের কালীতলা বাজার বাঁকে। সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি বালুভর্তি ট্রাকের পেছনে আরেকটি দ্রুতগামী পাথরবোঝাই ট্রাক ধাক্কা দেয়। এই দুর্ঘটনায় ২ জন নিহত এবং ২ জন গুরুতর আহত হন। ২৮ মে মধ্যরাতে পলাশবাড়ী পৌর শহরের পশ্চিম গোয়ালপাড়া এলাকায় দ্রুতগামী দূরপাল্লার বাসের ধাক্কায় একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালক ও এক আরোহী নিহত হন। ২৮ মে পলাশবাড়ী উপজেলার কোমরপুর ফ্লাইওভারে দাঁড়িয়ে থাকা হানিফ পরিবহনের বাসকে রানী স্পেশাল নামের অন্য একটি বাস ধাক্কা দিলে হানিফ পরিবহনের হেলপার সাজু মিয়া ঘটনাস্থলেই মারা যান।

আঞ্চলিক সড়কে এই নজরদারি নেই। ফলে মহাসড়কে কড়াকড়ির মুখে পড়া ধীরগতির যান আঞ্চলিক সড়কে ঢুকে পড়ছে। ওপরের প্রায় সব সংঘর্ষে ইজিবাইক, নসিমন, ভ্যান বা ট্রলির মতো কোনো ধীরগতির যান ছিল। সরু ও জরাজীর্ণ সড়কে বড়ো বাস-ট্রাক গতি না কমিয়ে চলছে। লাইসেন্সবিহীন চালক ও ফিটনেসবিহীন গাড়ি অবাধে চলছে। এ বছরের একাধিক ঘটনায় ঘাতক যান শনাক্ত হয়নি বা চালক পালিয়েছেন।

পথেই ফুরায় গোল্ডেন আওয়ার
গুরুতর আহতদের বেশির ভাগকে নিতে হয় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, কখনো বগুড়ায়। দেশের মহাসড়কে প্রায় ১৪০ কোটি টাকায় ২৪টি ট্রমা সেন্টার হলেও, ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের গাইবান্ধা অংশে বর্তমানে কোনো সক্রিয় বা পূর্ণাঙ্গ ট্রমা সেন্টার নেই। গত সেপ্টেম্বরে ১৪ নিহত পরিবারকে ৫ লাখ ও দুই গুরুতর আহতকে ৩ লাখ টাকা করে, মোট ৭৬ লাখ টাকার সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

কী করা দরকার
আঞ্চলিক সড়কে অবৈধ ও ধীরগতির যান নিয়ন্ত্রণ, গতিসীমা নির্ধারণ ও স্পিড গানে নজরদারি, হাটবাজার এলাকায় পার্কিং নিয়ন্ত্রণ এবং সরু সড়ক প্রশস্তকরণ জরুরি। মহাসড়কের ১৩ বাঁকে সাইনবোর্ড-আইল্যান্ড বসানো দরকার। বাঁকগুলোর ব্যাসার্ধ বাড়িয়ে নকশা নতুন করে সাজানো, স্পিড ক্যামেরা ও সোলার রিফ্লেক্টর বসানো এবং ফ্লাইওভার ও ইউ-লুপ শেষ করে ধীরগতির যানকে আলাদা সার্ভিস লেনে সরিয়ে নেওয়াও প্রয়োজন। ধাপেরহাট, কালীতলা ও কোমরপুর বাজারের মতো ব্যস্ত স্থানে মহাসড়কে স্থানীয় যানের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। ট্রমা সেন্টার চালু করতে হবে। আরএসএফ মানসম্পন্ন হেলমেট বাধ্যতামূলক করা ও আইনের কঠোর প্রয়োগের সুপারিশ করেছে।

মহাসড়ক নিরাপদ হলেই জেলা নিরাপদ হয় না। আঞ্চলিক সড়কে মহাসড়কের মতো নজরদারি না এলে ২২ অক্টোবরের অঙ্গীকার কাগজেই থাকবে।

সময়ের আলো/জোই
  বিষয়:   সড়ক  বাঁকে বাঁকে  মৃত্যু  আঞ্চলিক সড়ক  ঝুঁকি  জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস  গাইবান্ধা 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: