গ্রাফিক : সময়ের আলো‘বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার (বিসিএম) অর্থনৈতিক করিডোর’ বাস্তবায়িত হলে সবাই লাভবান হবে। তিন দেশের মধ্যে এই বিষয়ে অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠায় আমরা কাজ করছি। এমন উদ্যোগ প্রতিষ্ঠা করা গেলে অনেক সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো যাবে। তবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে কিছু প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে। চীনের ইউনান প্রভিন্সের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপ-মহাপরিচালক ওয়েন শিসাং সময়ের আলোকে এসব কথা বলেন।
বাংলাদেশ মিডিয়া প্রতিনিধির একটি দল গত ২৭ অক্টোবর থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত চীনের রাষ্ট্রীয় আমন্ত্রণে দেশটির ইউনান প্রভিন্স ও চংছিং শহর ভিজিট করে। ওই প্রতিনিধি দলে দৈনিক সময়ের আলোর এই প্রতিনিধি ছিলেন। প্রতিনিধি দলটির উদ্দেশ্যে গত ৩০ অক্টোবর চীনের ইউনান প্রভিন্সের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপ-মহাপরিচালক ওয়েন শিসাং একটি মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করেন। ওই ভোজের সাইড লাইনে দৈনিক সময়ের আলোর এই প্রতিবেদক চীনের ইউনান প্রভিন্সের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপ-মহাপরিচালক ওয়েন শিসাংয়ের সঙ্গে ‘বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার (বিসিএম) অর্থনৈতিক করিডোর নিয়ে আলাপ করেন।
উপ-মহাপরিচালক ওয়েন শিসাং বলেন, বাংলাদেশ-চীন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক খুব ভালো অবস্থানে আছে। বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার অথনৈতিক করিডোর প্রতিষ্ঠার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ঢাকা-বেইজিং দুপক্ষ লাভবান হবে। এটি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত করতে বেইজিং প্রয়োজনীয় কাজ করছে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সংস্কৃতি, বাণিজ্য, স্বাস্থ্যসেবা, পর্যটনসহ উভয় পক্ষের একাধিক খাত উপকৃত হবে এবং দুই দেশের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ আরও বাড়বে।
উপ-মহাপরিচালক আরও বলেন, ‘ইউনান প্রভিন্সের ভাইস গভর্নরের সঙ্গে গত সেপ্টেম্বরে আমি ঢাকা সফর করেছি। ওই সফরে বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। ওই বৈঠকে বাংলাদেশ- চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর নিয়ে আলাপ হয়েছে। ওই সময়ে বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রী টেক্সটাইল খাত, শহর পরিকল্পনা, যোগাযোগ খাত এবং দুপক্ষের অংশীদারিত্ব জোরদার নিয়ে আলাপ করেন, যা খুবই ইতিবাচক।’
বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর প্রতিষ্ঠায় অনেক সম্ভাবনা থাকলেও কিছু প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে। প্রথমত এ ধরনের অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হলে সবার আগে পলিসি প্রস্তুত করা প্রয়োজন। দুপক্ষেরই প্রতিষ্ঠানগুলো, ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে পলিসি ঠিক করতে হবে। সেসঙ্গে দুপক্ষের আগ্রহী বিষয়গুলোতে জোড় দিতে হবে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত্ব করতে হলে সব পক্ষকেই কার্যকরভাবে গুরুত্ব দিতে হবে।
এর আগে গত ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় একটি অনুষ্ঠানে চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেন, চীনের ইউনান প্রদেশ ও বাংলাদেশের মধ্যে পরিবহন, কৃষি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, সংস্কৃতি, পর্যটন ও শিক্ষা খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ আরও বাড়াবে এবং ‘বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর’ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করবে।
কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন সামাজিক ও বাণিজ্যিক সংগঠন বাংলাদেশ ও চীনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলগুলোর সফর দুই দেশের সহযোগিতাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। চীনা দূতাবাস দুই দেশের পারস্পরিক উন্নয়ন, যোগাযোগ ও সহযোগিতা বৃদ্ধিতে একটি সেতু হিসেবে কাজ করে যাবে। বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যৌথ সমৃদ্ধি অর্জনে চীন দৃঢ় সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।
এদিকে গত ২৬ জুন বেইজিংয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই ঠৈকে বেইজিং ঢাকাকে বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত একটি অর্থনৈতিক করিডোর করার প্রস্তাব দেয়। ওই সময়ে কানেক্টিভিটি নিয়ে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিস্তারিত কথা হয়। এই ইকোনমিক করিডোরের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে— বাংলাদেশের অর্থনীতির ব্যাপ্তি বাড়ানো, ট্রানজেকশন বাড়ানো এবং মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্টেশনকে আরও এনহ্যান্স করা।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশ গত ২০১৬ সালে চীনের বিআরআই প্রকল্পে যোগ দিয়েছে। এ মুহূর্তে চীন বাংলাদেশকে বিসিএম অর্থনৈতিক করিডোরে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। এর বিপরীতে বাংলাদেশকে ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিবেচনায় বাস্তবভিত্তিক বিকল্প প্রস্তাব নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। চীনকে দিয়ে যদি রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান করিয়ে নেওয়া যায়, তবে এই অঞ্চলের সবাই উপকৃত হবে।
কেননা রোহিঙ্গা সংকট এখন এই অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। এই সংকট সমাধান হলে এই অঞ্চলে চীনের বিনিয়োগ যেমন সুরক্ষিত থাকবে তেমনি ভারতসহ অন্যরাও উপকৃত হবে। ঢাকার কূটনীতিকরা যদি দিল্লি ও বেইজিংয়ের সঙ্গে সমন্বয় করতে পারে তবে তা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে ঢাকার কূটনীতিকদের অসাধারণ কৌশল অবলম্বন করতে হবে।
আরেকটি কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) আওতায় বাংলাদেশের কমবেশি ৯টি মেগা উন্নয়ন প্রকল্পে এই সময়ে চীনের বিনিয়োগ ৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। যা চীনের বিআরআই প্রকল্পের অংশ। গত এক দশকে এই প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বাংলাদেশ উন্নতি করেছে। চীন বিসিএম অর্থনৈতিক করিডোরে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে, যা বাংলাদেশ বিবেচনা করছে।
চীনের বিআরআই প্রকল্পের লক্ষ্য সারা বিশ্বকে এক ছাতার নিচে আনা। প্রাচীনকালের সিল্ক রুটের আওতাভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সংযোগ স্থাপন এই প্রকল্পের লক্ষ্য। বেইজিং মনে করে, পরিকল্পনামানিফ আগামী ২০৪৯ সালে বিআরআই প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে সব দেশ সমানভাবে লাভবান হবে।
এরই মধ্যে এই প্রকল্পের মাধ্যমে অন্তত ৬৮টি দেশ যুক্ত হয়েছে। ৬৮টি দেশ, ৬০ শতাংশ বিশ্ব জনসংখ্যা এবং ৪০ শতাংশ উৎপাদন নিয়ে এই নয়া রেশমপথ রচনা করছে এশীয় আদলের নতুন বিশ্বায়ন।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও