আমাদের সোনালি ঐতিহ্য : ঈদুল ফিতর

মঈনুল হক চৌধুরী

আলোর রেখা

পবিত্র রমজান মাসে পুরো এক মাস কঠোর সংযম সাধনের মাধ্যমে রোজা পালনের পর পবিত্র শাওয়াল মাসের প্রথম দিনে পবিত্র ঈদুল

2020-05-22T00:00:00+00:00
2020-05-22T00:00:00+00:00
 
  রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬,
৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬
আলোর রেখা
আমাদের সোনালি ঐতিহ্য : ঈদুল ফিতর
মঈনুল হক চৌধুরী
প্রকাশ: শুক্রবার, ২২ মে, ২০২০, ১২:০০ এএম   (ভিজিট : ২৭০)
পবিত্র রমজান মাসে পুরো এক মাস কঠোর সংযম সাধনের মাধ্যমে রোজা পালনের পর পবিত্র শাওয়াল মাসের প্রথম দিনে পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপিত হয়। ঈদের আনন্দ এমন এক ধরনের আনন্দ যা শুধু ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সমাজের প্রতিটি ব্যক্তির মধ্যে যখন ঈদের আনন্দ উৎসারিত হয়, তখন তা আর ব্যক্তিগত আনন্দ থাকে না, সমষ্টিগত আনন্দে পরিণত হয়। তাই ঈদের আনন্দ প্রতিটি মুসলমানের জন্য যেমন আনন্দের, তেমনি তা সমগ্র মুসলিম সম্প্রদায়ের এক অবিভাজ্য সমষ্টিগত আনন্দ। এ আনন্দে ব্যক্তি মানুষ থেকে সমাজের প্রতিটি মানুষ সম্পৃক্ত হয়। এ আনন্দে সমাজের সবাইকে সম্পৃক্তকরণে ইসলামের ভ্রাতৃত্বপূর্ণ, সাম্যবাদী, উদার সহনশীল মানবিক আদর্শের নির্দেশনাও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শাওয়ালের চাঁদ যে আনন্দের বারতা নিয়ে আসে সেইটিই ঈদুল ফিতর। ঈদুল ফিতরের অর্থ হলো দান খয়রাতের মাধ্যমে পবিত্র ঈদের উৎসবকে আনন্দে উদ্ভাসিত করে তোলা। যাকাত ফিতরার মাধ্যমে ধনী ও গরিবের মধ্যকার ভেদাভেদ দূরীভূত হয়।
আর এতেই মুসলিম হৃদয় উদ্বেলিত হয়। আমাদের মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) ঈদুল ফিতরের সুদূরপ্রসারী গুরুত্বকে তুলে ধরে বলেছেন, “রোজা শেষে আজকের এদিন আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থাশীল ও তার কাছে জবাববদিহিতার তাগাদা অনুভবকারী সাবধানী মানুষদের জন্য খুশির দিন। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সুলতানী আমলে পবিত্র রমযান মাসকে মর্যাদার সাথে উদযাপন করা হতো। ঈদের নামাজের ব্যবস্থাও হতো জাঁকজমকের সাথে। ঐতিহাসিক মিনহাজ-উস-সিরাজ তার ‘তাবাকাৎ-ই-নাসিরীতে’ উল্লেখ করেছেন যে, ‘সুলতানগণ রমযান মাসে দৈনন্দিন ধর্মীয় আলোচনার ব্যবস্থা করতেন এবং এ উদ্দেশ্যে ধর্মপ্রচারক নিযুক্ত করতেন। তারা ঈদুল ফিতর ও ঈদ উল আজহার নামাজ আদায়ের জন্য ইমামও নিযুক্ত করতেন। শহরের বাইরে বিরাট উন্মুক্ত জায়গায় অথবা গ্রামে ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হতো এবং এসব স্থানকে ঈদগাহ বলা হতো। বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ঈদের মাঠ বলতে ঈদগাহকেই বুঝানো হতো।
এমনকি ঈদের দিনে মাঠে যাওয়া মানে ঈদগাহে যাওয়া বোঝানো হতো। মধ্যযুগে মুসলিম পরিবারে নামাজ রোজা এবং ঈদ উৎসবে আলাদা একটা বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা গেছে। মোগলরা ইসলামের মৌলিক অনুশাসন মানার ক্ষেত্রে খুবই যত্নবান ছিলেন। বিশেষ করে রোজা এবং ঈদে তাদের মধ্যে উৎসবের আমেজ বিরাজ করতো। মির্যা নাথান তার ‘বাহারিস্তান-ই-গায়বীতে’ উল্লেখ করেন, এমনকি যুদ্ধ-বিগ্রহসহ কোনো বড় ধরনের বির্পযয়ের মুহূর্তেও তারা ঈদের খুশিকে ছড়িয়ে দিতেন সবার মাঝে। রমজান মাস কেবল সংযম ও নামাজের মাসই ছিল না, এ মাসে অবস্থাপন্ন লোকেরা ব্যাপক দান-খয়রাতও করতো এবং প্রতিবেশীরাও একে অপরের খানাপিনার খোঁজখবর ও লেনদেন করতো। মীর্যা নাথান আরো উল্লেখ করেন, রমজান মাসের শুরু থেকে এর শেষ দিন পর্যন্ত ছোট বড় সকলে প্রতিদিন নিজ নিজ বন্ধুর তাঁবুতে যেতেন। এটা একটা সাধারণ রীতি হয়ে দাঁড়ায় যে, প্রতিদিন সবাই একজন বন্ধুর তাঁবুতে তাদের সময় কাটাতো। সেই অনুসারে শেষের দিন রাত্রে মুবারিজ খানের সন্ধ্যাভোজ ছিল।
সমস্ত লোক সেদিন তার সেখানে সময় কাটায়। উল্লেখ্য, সম্রাট শাহজাহানের চার পুত্রের মসনদ দখলের লড়াইয়ে বাংলার সুবেদার শাহ মুহাম্মদ সুজা আরাকানে পালিয়ে যাবার সময়েও ঈদের নামাজ আদায় করেছেন। ঈদ উৎসবের মর্যাদা রক্ষায় যথাযথ চেষ্টা করেছেন। তার স্মৃতির ঈদগড় এখনো বাংলার ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে। এছাড়া তাদের প্রভাবিত এলাকাসমূহে নির্মিত ঈদগাহের ধ্বংসাবশেষ এখনো সেই ইতিহাসকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
বিশেষ করে বাংলার সিলেট, চট্টগ্রাম এবং ঢাকার ঈদগাহসমূহের ধ্বংসাবশেষ এখনো আমাদের আকর্ষণ করে। এরকম একটি ঈদগাহ আছে ঢাকার ধানমন্ডি আবাসিক এলাকায়। এটি মাটি থেকে চারফুট উঁচু একটি সমতলভূমি। এর দৈর্ঘ্য ২৪৫ ফুট এবং প্রস্থ ৩৭ ফুট। ভূমিটি তিনদিকে বিস্তৃত ছিল। পশ্চিমে ১৫ ফুট উঁচু প্রাচীর ঘেঁষে রয়েছে মেহরাব ও মিম্বার। পান্ডু নদীর একটি শাখা এর পাশ দিয়ে বয়ে যেত। এই শাখা নদীটি জাফরাবাদে সাতগম্বুজ মসজিদের কাছে বুড়িগঙ্গা নদীর সাথে মিলিত হয়েছিল। শাহ মুহাম্মদ সুজা বাংলার সুবেদার থাকাকালে তার প্রধান অমাত্য মীর আবুল কাশেম ১৬৪০ সালে এ ঈদগাহটি নির্মাণ করেছিলেন। সুবেদার নাজিম ও অন্যান্য মোগল কর্মকর্তারা এখানে নামাজ আদায় করতেন। ইংরেজ আমলে এটি পুরোপুরি অব্যবহৃত ছিল। এমনকি কোনো জনমানবের সংস্পর্শ না পেয়ে জরাজীর্ণ ও জঙ্গলাকীর্ণ হয়ে পড়ে। ঐতিহাসিকদের মতে, ঈদুল ফিতর ছিল আনন্দ ফুর্তি ও সকল মানুষের জন্য নতুন পোশাক-পরিচ্ছদ পরার একটি দিন। নবাবী আমলে মুসলমানরা সুন্দর সুন্দর পোশাক-পরিচ্ছদে সজ্জিত হয়ে শোভাযাত্রা করে ঈদগাহে যেত। ধনী ব্যক্তিরা উৎসবের সময়ে মুক্তহস্তে টাকা পয়সা ও উপহার সামগ্রী বিতরণ করতো। সেসময় ঈদের ভ্রাতৃত্ববোধের এ আমেজ বাংলার দুঃখী মানুষদের ঘরে ঘরেও ছড়িয়ে পড়েছিল মূলত ব্রিটিশ আমলে রোজা ও ঈদ সংস্কৃতিতে ব্যাপকভাবে ধস নামে। সেসময় মুসলমানরা শুধু অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে পড়েনি, বরং বিশ্বাস ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও চরমভাবে কক্ষচ্যুত হয়ে পড়ে। সমাজের সবচেয়ে উচ্ছিষ্ট ও অস্পৃশ্য জাতিতে পরিণত হয়েছিল মুসলমানরা। যে কারণেই অনিবার্য হয়ে উঠেছিল শহীদ মীর নিসার আলী তিতুমীর এবং হাজী শরীয়তুল্লাহর সংস্কার ও স্বাধিকার আন্দোলন এবং বালাকোটের জিহাদ। উনিশ শতকের শেষের দিকে ময়মনসিংহ অঞ্চলের ঈদের বর্ণনা দিতে গিয়ে আবুল মনসুর আহমদ উল্লেখ করেছেন, এ অঞ্চলে কোনো মসজিদ বা জুম্মার ঘর ছিল না। বছরে দুবার ঈদের জামাত হতো বটে কিন্তু তাতে বড়রাই শামিল হতো। কাজেই জামাতে খুব অল্প লোক হতো। ঈদের মাঠে লোক না হলেও বাড়ি বাড়ি আমোদ-প্রমোদ হতো। সাধ্যমতো নতুন কাপড়চোপড় পরে লোকেরা ব্যাপক গানবাজনা করতো। সারা রাত ঢোলের আওয়াজ পাওয়া যেত। তিনি আরো বলেন, ঈদের জামাতেও লোকেরা কাছাধুতি পরে যেত। তবে নামাজের সময় কাছা খুলতে হতো। অনেকে আবার প্রথম প্রথম নামাজের কাতারে বসবার পরে অন্যের অগোচরে চুপি চুপি কাছা খুলে নামাজ শেষ করে কাতার হতে উঠবার আগেই কাছা দিয়ে ফেলতো। উল্লেখ্য, ব্রিটিশ বিদায়ের পূর্বমুহূর্ত থেকেই ঢাকায় রোজা ও ঈদের ঐতিহ্য পুনরুজ্জীবিত হতে থাকে। বিশেষ করে বিশ শতকের ত্রিশের দশক থেকে মুসলমানদের মধ্যে এ আমেজে খানিকটা জোয়ার লক্ষ করা যায়। শিক্ষাদীক্ষায় মুসলমানদের সুযোগ সৃষ্টিই এর অন্যতম কারণ। রমজানের চাঁদ ওঠার কয়েকদিন আগেই বাড়িঘর এবং মসজিদ পরিষ্কারের ধুম পড়ে যেতো। রমযানের চাঁদ দেখার জন্য বিকেল থেকেই বড় কাটরা, আহসান মঞ্জিল, হুসনী দালানের ছাদে ভিড় জমে যেত। চাঁদ দেখা মাত্রই চারদিক থেকে মুবারকবাদ, পরস্পর সালাম বিনিময় এবং তোপের আওয়াজ পাওয়া যেত। রমজান ও ঈদে ঢাকার খাবারে বিশেষ আকর্ষণ ছিল। রোজার সময় ঘরে ঘরে ইফতারি তৈরির ধুম থাকলেও চকের ইফতারির প্রতি সবার আলাদা একটা টান ছিল। চকের খাবারগুলি ছিল শিরমলি, বাকরখানি, চাপাতি, নানরুটি, কাকচা, কুলিচা, নানখাতাই, শিককাবাব, হান্ডি কাবাব, মাছ ও গোস্তের কোপ্তা , শামি ও টিকা কাবাব, পরাটা, বোগদাদী রুটি, শরবাতি রুটি, মোরগ কাবাব, ফালুদার শরবত ও নানারকম ফল।
ঢাকার চক অবশ্য এখনও সে খানদানি ভাব বজায় রেখেছে। সেসময় ঈদের মেলা বসতো চক বাজারে ও রমনার ময়দানে। বাঁশের তৈরি খাঞ্চা ও ডালা আসতো নানা রকমের। কাঠের খেলনা এবং ময়দা ও ছানার খাবারের দোকান বসতো সুন্দর করে সাজিয়ে। আর বিকেলে হতো কাবলীর নাচ। চকবাজার ও কলাপুরে সে মেলার রেশ এখনো রয়ে গেছে। ব্রিটিশদের বিদায়লগ্নে গ্রামীণ মুসলমানদের মধ্যেও নতুন চেতনার উদ্ভব লক্ষ করা যায়। বিংশ শতাব্দীর তৃতীয় ও চতুর্থ দশকে বাংলার গ্রামে গঞ্জে আবারো ঈদের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। সেসময় রোজার পনেরো দিন যাওয়ার পর হতেই গৃহবধূরা নানারকম নকশী পিঠা তৈরি করতে শুরু করতো। এদের মধ্যে ফুল, পিঠা, পাপর পিঠা, ঝুরি, হাতে টেপা সেমাই, ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। ঈদের আগের দিন অর্থাৎ চান রাতে মেয়েরা মেহেদী এনে তা বেটে হাতে নানারকম চিত্র আঁকতো। পবিত্র রমজান ও ঈদুল ফিতর নিছক কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়। বরং এর রয়েছে তাৎপর্যপূর্ণ ও সুদূরপ্রসারী ভূমিকা। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল্যবোধ ও সমতা গঠনে পবিত্র রমজান ও ঈদুল ফিতর এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে অনাদিকাল থেকে চলে আসছে। পৃথিবীর অন্যান্য ধর্মের এবং বর্ণের মানুষদের জাতীয় উৎসবের সাথে যদি পবিত্র রমজান ও ঈদুল ফিতরকে তুলনা করি, তাহলে দেখা যায়, যে নিছক আমোদ-প্রমোদই যেন অন্যদের উদ্দেশ্য। ফলে, অন্যান্য ধর্মীয় ও জাতীয় উৎসবের সাথে এই এখানেই মুসলমানদের পবিত্র ঈদুল ফিতর উৎসবের মৌলিক পার্থক্য। সুতরাং, পবিত্র ঈদুল ফিতর আমাদের সোনালি ঐতিহ্য। ভালোবাসার রঙে বিলিয়ে দেবার একটি রঙিন দিন হলো ঈদুল ফিতর। সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা। ঈদ মোবারক।
সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: