১৯৭১ সালের ৭ মার্চ। দুপুর না গড়াতেই রেসকোর্স ময়দানে নেমেছে মানুষের ঢল। একটা সময় রেসকোর্স পরিণত হলো জনসমুদ্রে। একটাই কারণ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভাষণ দেবেন। সবার মনে কৌতূহল, তিনি কী বলবেন। রেসকোর্স ময়দানের মাঝামাঝি স্থানে ডায়াস স্থাপন করা হয়েছে। যেখানে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু ভাষণ দেবেন। ডায়াসের তিন ফুট দূরে রয়েছেন চলচ্চিত্র প্রকাশনা দফতরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।
তারা মূলত বঙ্গবন্ধুর ভাষণ রেকর্ড করবেন। কতক্ষণ করবেন তা নির্ধারণ করা ছিল না। দফতরের পরিচালক আবুল খায়ের (বিখ্যাত চলচ্চিত্র ও নাট্যাভিনেতা) ছিলেন মূল তত্ত্বাবধানে। ক্যামেরাসহ এই টিমে ছিলেন মোট ৮ জন। এই টিমের অন্যতম সদস্য হলেন আমজাদ আলি খন্দকার। এবার তিনি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে একুশে পদক পেয়েছেন।
আমজাদ আলি খন্দকারের সঙ্গে সেদিনের ঘটনা ছাড়াও তার ঝুঁকিপূর্ণ কাজের বিষয় জানার জন্য গত শনিবার টেলিফোনে তার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়। তিনি বর্তমানে সাভারে থাকেন। সাক্ষাৎকারের শুরুতেই তিনি জানালেন, সেই ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ দিনের কথা। তিনি নিজে উপস্থিত থেকে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ রেকর্ড করতে পেরে আজ গর্ব অনুভব করেন।
বললেন, এটা আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ দিন ছিল। একই সঙ্গে স্মরণীয় দিনও, যা আমার আমৃত্যু মনে থাকবে। কথা প্রসঙ্গে তিনি বললেন, চাকরির সুবাদে আমাকে যেতে হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এত কাছে থেকে বঙ্গবন্ধুকে দেখে আমি বিস্মিত হয়েছি। আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি। কি বিশাল দেহ, এত বড় মনের অধিকারী ছিলেন তা দেখেই অনুভব করা যায়। ভাষণ যথারীতি শুরু হলো। বঙ্গবন্ধু ডান হাতের তর্জনি উঁচিয়ে সেই বক্তব্য শুনছিলাম। আর অবাক হয়ে দেখছিলাম। সামনে নেই কোনো কাগজ । যেন মুখস্থ বলে যাচ্ছেন একের পর এক। কতক্ষণ রেকর্ড করেছি তা মনে নেই। কিন্তু মনে হচ্ছিল আমি যেন এক মহামানবের কথা শুনছি। একবার চোখ মেলে তাকালাম চারদিকে। শুধু মানুষ আর মানুষ। মাথা আর মাথা। অনেকের হাতে লাঠি আর বাঁশ।
‘এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম’ বলে কখন যে ভাষণ শেষ করলেন তা মোটেই টের পাইনি।
ভাষণ শেষ হলে গাড়ি চড়ে সচিবালয়ে চলে যাই। এ কথা বলে নেওয়া ভালো, সে সময় তথ্য ও প্রকাশনা দফতর ছিল সচিবালয়ের ভেতরে। সচিবালয়ে গিয়ে আমরা ডেভেলপ করার সিদ্ধান্ত নিলাম। সে সময় আমাদের পরিচালক আবুল খায়ের সযত্নে সেটা রেখে দিতে বললেন। আমরা যখন ডেভেলপ করে রাখি তখন টেপে লিখে রাখা হলো, সাইক্লোন ১, সাইক্লোন ২ । এ লেখা ছাড়া কোনো গতি ছিল না।
তিনি বলেন, ২৫ মার্চ কালো রাত। বর্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এদেশের মানুষের ওপর রাতের আঁধারে ঝাঁপিয়ে পড়ল। এরপর আমাদের পরিচালক এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিলেন। আর সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য আমাকেই দায়িত্ব দিলেন। সে সময় সচিবালয়ে সহজে গাড়ি প্রবেশ করতে দিত না; কিন্তু বের হতে দিত। একদিন অর্থাৎ ৯ এপ্রিল জীবনের ঝুঁকি নিলাম। এর আগে একটা ট্রাঙ্ক কিনি। এই ট্রাঙ্কের ভেতর বঙ্গবন্ধুর ভাষণের টেপ নিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সচিবালয় থেকে বের হই। এ কথা বলে রাখা ভালো, ট্রাঙ্কটি ছিল স্টিলের। সব ভিডিও ফুটেজ ছিল এই ট্রাঙ্কে।
জীবনের ঝুঁকি নিতে আমি বিন্দুমাত্র পিছপা হইনি। কারণ আমার মতো আমাদের সে সময়ের পরিচালকও বঙ্গবন্ধুর খুব ভক্ত ছিলেন। যাহোক পাকিস্তানি বাহিনীর জোরদার টহলের মধ্যে তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে সচিবালয় থেকে ট্রাঙ্ক নিয়ে বের হওয়া ছিল জীবনকে একেবারে হাতে নেওয়া। কখন কার চোখে ধরা পড়ি বলা তো যায় না। এরপরও সবার চোখ ফাঁকি দিতে সব ধরনের জীবনের ঝুঁকি নিই। ট্রাঙ্ক নিয়ে সোজা চলে যাই বুুড়িগঙ্গা নদীর দিকে। সে সময় রাস্তায় কোনো যানবাহন নেই। রিকশা নেই। কিছুটা হেঁটে আবার কিছুটা দম নিয়ে বুড়িগঙ্গা নদী পার হই। বুড়িগঙ্গা হয়ে আমি পৌঁছে যাই জিঞ্জিরা। পরে জিঞ্জিরা হয়ে মুন্সীগঞ্জের জয়পাড়ায় মজিদ দারোগার বাসায় নিয়ে যাই সেই মূল্যবান ফুটেজ আর ভিডিওগুলো। পরবর্তী সময়ে ওই ভিডিও ফুটেজ কলকাতায় হাইকমিশনে পৌঁছে যায়। এ কথা আর বলার অপেক্ষা রাখে না, সে সময় যদি এভাবে বঙ্গবন্ধুর মূল্যবান ভাষণ সংরক্ষণ করা না যেত তা হলে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সেই ভাষণ পেতাম কি না সন্দেহ। স্বাধীনতার পর সেই মূল্যবান ভাষণ তথ্য প্রকাশনা দফতরে সংরক্ষণ করা হয়।
বর্তমানে কেমন লাগছে? এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ৭৯ বছর বয়সে আমার তৃপ্তি হচ্ছে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সেই মূল্যবান ভাষণ রেকর্ড করার সুযোগ হয়েছে। বঙ্গবন্ধু না হলে দেশ কখনও স্বাধীনতার স্বাদ পেত কি না আমি এখনও অবাক হয়ে ভাবি। চলতি বছরের একুশে পদক পাওয়া নিয়ে তার অনুভূতি জানতে চাইলে তিনি অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে বিনম্র হয়ে জাতির পিতার প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
তিনি বলেন, একুশে পদক পাওয়া নিয়ে আমার অনুভূতি কী তা বলে বোঝানো যাবে না। তবে আমি সরকারের কাছে চিরঋণী। ধন্য আমার জীবন। সে দিনের মূল্যবান বঙ্গবন্ধুর ভাষণ যে দুনিয়াজুড়ে খ্যাতি পাবে তা তখন ভাবিনি।
/আরএ