যুক্তরাজ্য থেকে আমদানি করা রোলস রয়েস ব্র্যান্ডের একটি গাড়ির ২৪ কোটি টাকা কর ফাঁকির ঘটনা আলোচনার জন্ম দিয়েছে চট্টগ্রামে। গাড়িটি আমদানি করেন দেশের পোশাক রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান অনন্ত গ্রুপের পরিচালক শরীফ জহির।
কিন্তু কে এই শরীফ জহির, কী তার পরিচয়? বাড়িই বা কোথায়?- এসব নিয়ে গতকাল সকাল থেকে নানা জল্পনা-কল্পনা চলছে চট্টগ্রামের মানুষের মুখে মুখে। শুধু তাই নয়, শুল্ক কর ফাঁকি দিয়ে এই বিলাসবহুল গাড়ি কীভাবে ঢাকায় গেল তা নিয়েও নানা প্রশ্ন তুলছে সচেতন মহল।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এই শরীফ জহির বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানের (বিজিএমইএ) সদস্য। ব্যবসায়ী হিসেবে তার বেশ সুনাম রয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিজিএমইএর প্রথম সহসভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলেন, অনন্ত গ্রুপের এমডি শরীফ জহির বিজিএমইএর সদস্য। চট্টগ্রাম ইপিজেডে জেড অ্যান্ড জেড ইন্টিমেন্টস কারখানা তাদের। এ ছাড়া আদমজী ইপিজেডে ৫টি কারখানা রয়েছে।
তিনি ঢাকায় গুলশানের বাসভবনে থাকেন। তার জন্মস্থান নোয়াখালী জেলার অনন্তপুর গ্রামে। গ্রামের নামানুসারে তার কোম্পানির নাম রাখা হয় অনন্ত গ্রুপ। এই গ্রুপের চেয়ারম্যান তার মা কামরুন নাহার জহির। তার বাবা হুমায়ুন জহির ১৯৯৩ সালে আততায়ীর হাতে নিহত হন। তখন সবার বড় মেয়ের বয়স ছিল ২০ বছর, দ্বিতীয় মেয়ের ১৯, এরপরই ছেলে শরীফ জহিরের বয়স ১৬। আর সবচেয়ে ছোট ছেলে আসিফ জহিরের বয়স ছিল ৯ বছর।
এ সময় তার মা কামরুন নাহার অনন্ত গ্রুপের হাল ধরেন। তিনি বলেন, ১৯৯১ সালে এলিফ্যান্ট রোডের নিজস্ব ভবনে যাত্রা শুরু হয়েছিল অনন্ত অ্যাপারেলসের। বর্তমানে সেটি স্থানান্তর করা হয়েছে আদমজী ইপিজেডে। এর বাইরে গাজীপুর, কাঁচপুর ও চট্টগ্রাম ইপিজেডে কারখানা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। তৈরি পোশাকের মধ্যে সাধারণ পোশাকের পাশাপাশি স্যুট, জিনস, সোয়েটার, নারীর অন্তর্বাস তৈরি ও রফতানি করে প্রতিষ্ঠানটি।
শুরুতে অনন্ত টয় ও অনন্ত পেপার মিল নামে প্রতিষ্ঠানটির দুটি আলাদা কারখানা থাকলেও পরবর্তী সময়ে সেগুলো বিক্রি করে দেওয়া হয়। কামরুন নাহার বলেন, স্বামীর মৃত্যুর পর একদিকে সন্তানদের দায়িত্ব, অন্যদিকে ব্যবসা দুটোই শক্ত হাতে ধরেন তিনি। ব্যবসার শুরু থেকে আজ পর্যন্ত কখনও এক দিনের জন্যও ব্যাংকের ঋণখেলাপি হয়নি তার কোনো প্রতিষ্ঠান। পরে দুই ছেলেই ব্যবসার হাল ধরেছেন। তবে ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় মায়ের পরামর্শে। সবকিছু বিবেচনায় প্রতিষ্ঠানের পক্ষে কোনোরকম অন্যায় করা অসম্ভব।
অথচ শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের চট্টগ্রাম কার্যালয়ের উপকমিশনার একেএম সুলতান মাহমুদের দাবি, কাস্টমসের প্রায় ২৪ কোটি টাকা শুল্কায়ন না করে গাড়িটি খালাস করা হয়েছে। ঢাকার বারিধারা থেকে গত বুধবার সকালে গাড়িটি জব্দ করেছেন শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের কর্মকর্তারা।
কাস্টমসের তথ্যে বলা হয়, গত ১৭ মে গাড়িটি যুক্তরাজ্যের ভারটেক্স অটো লিমিটেড থেকে আমদানি করে বাংলাদেশের অনন্ত গ্রুপ ও চীনা নাগরিকের যৌথ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান জেড অ্যান্ড জেড ইন্টিমেটস লিমিটেড। আমদানি নথিতে ৬৭৫০ সিসির গাড়িটির দাম দেখানো হয়েছে ২ লাখ ডলার। যদিও রোলস রয়েসের ওয়েবসাইটে গাড়িটির দাম দেওয়া আছে ৩ লাখ ৪৬ হাজার ৮৫০ ডলার।
গাড়িটি আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকে। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে আমদানিকারকের পক্ষে খালাসের দায়িত্বে ছিল চট্টগ্রামের প্রতিষ্ঠান এম আই ট্রেড অ্যাসোসিয়েটস। এ বিষয়ে এম আই ট্রেড অ্যাসোসিয়েটসের ম্যানেজিং পার্টনার মো. নজরুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো কথা বলতে রাজি হননি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অনন্ত গ্রুপের পরিচালক শরীফ জহির সময়ের আলোকে বলেন, গাড়িটি খালাসে কোনো অনিয়ম হয়নি। বেজার আওতায় এ গাড়িটির শক্তির কোনো শর্ত নেই। এটি আনলিমিটেড। কাস্টমস রুল না দেখে কথা বলছেন। তবে গাড়িটির অ্যাসেসমেন্ট অসম্পূর্ণ ছিল। এ নিয়ে কথা বলতে পারে কাস্টমস।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম কাস্টমসের কমিশনার ফখরুল আলম বলেন, রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি শুল্কমুক্ত সুবিধায় গাড়ি আমদানি করার সুযোগ পাবে। সাধারণত ইপিজেডের পণ্য বন্দর থেকে ইপিজেডে যাওয়ার পর সেখানে শুল্কায়ন কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। কিন্তু শুল্কায়ন কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার আগেই সেটি সেখান থেকে কীভাবে ঢাকায় গেল তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
/এসকে