প্রবাসী গৃহকর্মী : যাদের মৃত্যুও এক রহস্য!

এপিডব্লিউএলডি ফেলোশিপ প্রতিবেদন

জাতীয়

২ ফেব্রুয়ারি, ২০২২ মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরের বাড়িতে ফেরার কথা ছিলো সৌদি প্রবাসী গৃহকর্মী ফাতেমা আখতারের (৩৩)। সেদিন ফেরেন নি। ফাতেমার মুঠো

2022-12-02T16:49:35+00:00
2022-12-04T14:32:56+00:00
 
  রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬,
১১ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
প্রবাসী গৃহকর্মী : যাদের মৃত্যুও এক রহস্য!
এপিডব্লিউএলডি ফেলোশিপ প্রতিবেদন
প্রকাশ: শুক্রবার, ২ ডিসেম্বর, ২০২২, ৪:৪৯ পিএম  আপডেট: ০৪.১২.২০২২ ২:৩২ পিএম
২ ফেব্রুয়ারি, ২০২২ মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরের বাড়িতে ফেরার কথা ছিলো সৌদি প্রবাসী গৃহকর্মী ফাতেমা আখতারের (৩৩)। সেদিন ফেরেন নি। ফাতেমার মুঠো ফোন বন্ধ পেয়ে খবর নিতে স্বজনরা ছুটে যান স্থানীয় দালাল, পাশের গ্রামের কুদ্দুসের বাড়ি। কুদ্দুসের সহায়তায় সৌদি পাড়ি দেন ফাতেমা। কুদ্দুস, স্বজনদের কয়েক দিন অপেক্ষা করতে বলে।

কয়েকদিন পর খবর না পেয়ে স্বজনরা আবারো ছুটে যান কুদ্দুসের কাছে। এবার ফাতেমা সুস্থ আছে বলে স্বজনদের আশ্বস্ত করে সে, প্রতিশ্রুতি দেয় মুঠো ফোনে কথা বলে দেয়ার। এভাবে ১ সপ্তাহের বেশি সময় পার হলেও কোন ধরনের খবর না পেয়ে স্বজনরা স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্যদের নিয়ে গ্রাম্য সালিশে বসেন। সেই সালিশে কুদ্দুস সত্য ঘটনা জানাতে বাধ্য হয়। জানায়, ৩ ফেব্রুয়ারি আত্মহত্যা করেছেন ফাতেমা। ততদিনে মৃত্যুর ১০ দিন পার হয়ে গেছে! তবে পরিবারের দাবি আত্মহত্যা নয়, হত্যা করা হয়েছে ফাতেমাকে।

এ বিষয়ে জানতে স্থানীয় এজেন্ট কুদ্দুসের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, “রিক্রুটিং এজেন্সির সৌদি প্রতিনিধি ৩ ফেব্রুয়ারি টিকিট নিয়ে গিয়ে দেখেন ফাতেমা মারা গেছেন। পরে দরজা ভেঙে ঝুলন্ত অবস্থায় তার মরদেহ পা্ওয়া যায়”। ফাতেমাকে নির্যাতনের বিষয়টি অস্বীকার করেন তিনি। বলেন, “ফ্যানের সাথে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া গেছে ফাতেমাকে। প্রাথমিক সুরতহাল রিপোর্টে গলায় দাগও পাওয়া গেছে”।

এদিকে ঘটনা অনুসন্ধানে ফাতেমার বাড়ি মানিকগঞ্জে গেলে তার ভাই শরিফুল ইসলাম জানান, “ফাতেমার ঘরে কোন সিলিং ফ্যানই ছিলো না, সে আত্মহত্যা করেনি, তাকে মেরে ফেলা হয়েছে”। বরং ফ্যান না থাকায় গরমে ফাতেমার কষ্ট হচ্ছিল বলে মালিককে অনুরোধ করে, বেতনের টাকা কেটে নিয়ে একটি চার্জার টেবিল ফ্যান কিনে দেয়ার ব্যবস্থা করেন শরিফুল। বলেন, “সিলিং ফ্যানই নেই আমার বোন ঘরে, তাহলে কিভাবে আত্মহত্যা করতে পারে?”

ফাতেমাকে নির্যাতন, মোবাইল ফোনে কথা বলতে না দেয়ার অভিযোগ করে স্বজনরা বলেন, “একবার মেরে হাতের আংগুল ভেঙ্গে দিয়েছিলো, অনেকদিন কাজ করতে পারেনি। আমরা বিশ্বাস করি আমাদের বোন আত্মহত্যার করার মতো মানুষ না, আমরা ঘটনার সঠিক তদন্ত ও বিচার চাই। মরদেহ দেশে আনার মতো সামর্থ্য আমাদের নেই, সরকারের কাছে অনুরোধ আমার বোনের মরদেহ যেন দেশে আনা হয়”।

ফাতেমার মা খোদেজা খাতুনও কেঁদে একই অভিযোগ জানান, “মোবাইলে কথা বলতে দিতো না, মারতো। একবার কথা শুরু করতেই সে বলে- মা ফোন রাখো দেহো কেমন করে, তেড়ে আসতেছে। আমি পরে কল দিমু…..”। আকুতি জানিয়ে খোদেজা খাতুন বলেন, “আমার মেয়েটাকে তোমরা এনে দাও, দেশের মাটিতে অন্তত কবরটা থাক”।

জুন, ২০২২। ততদিনে ৭ মাস পার হয়ে গেছে, ফাতেমার লাশ সৌদি আরবের একটি হাসপাতালের পড়ে আছে। এদিকে, পোস্ট মর্টেম ছাড়াই ফাতেমার মরদেহ দেশে আনতে অনাপত্তি ছাড়পত্রে স্বজনদের সই করতে বলে দালাল কুদ্দুস ও এজেন্সি। কিন্তু স্বজনরা তাতে রাজি না হওয়ায় মাসের পর মাস লাশ আটকে থাকে বিদেশে। স্বজনরা আবেদন জানান প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়েো। কিন্তু অর্থাভাবে ও সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সমন্বয়হীনতায় দেশে ফেরে না মরদেহ।

যদিও বাংলাদেশ কর্মসংস্থান ব্যুরো বিএমইটির ছাড়পত্র নিয়ে বৈধকর্মী হিসেবেই রাজধানীর নয়াপল্টনের অপশন রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে সৌদি আরবে যান ফাতেমা। সৌদিতে যাওয়ার পর প্রথম মালিকের বাসায় দু বছর ভালো থাকলেও নতুন এই মালিক (জুমা সাইদ হাদী আল খাতানি) এর বাসায় নির্যাতনের শিকার হতো বলে অভিযোগ স্বজনদের।

দালাল কুদ্দুসের কথায় প্রভাবিত হয়ে ২০১৯ সালে ফাতেমা বিদেশ যান। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রিক্রুটিং এজেন্সিদের এজেন্ট হিসেবে মানিকগঞ্জের ওই এলাকা থেকে কয়েকটি এজেন্সিকে কর্মী যোগান দেয় কুদ্দুস।

মূলত, তার পরিবারে দিনমজুর দুই ভাই আর বৃদ্ধ বাবা মা, নিজ পরিবারের অর্থ কষ্ট দূর করতে ২০১৯ সালের নভেম্বরে গৃহকর্মীর কাজ নিয়ে সৌদি আরব যান গার্মেন্টস কর্মী ফাতেমা আক্তার। ফাতেমা ও তার স্বামী দুজনেই একটা গার্মেন্টস কোম্পানীতে কাজ করতেন। দালাল কুদ্দুসের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ভাগ্য পরিবর্তনের লক্ষ্যে বিদেশ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু, ফিরতে হয় লাশ হয়ে।

এ বিষয়ে জানতে রাজধানীর নয়াপল্টনে অপশন রিক্রুটিং এজেন্সিতে গেলে, তারা ফাতেমাকে নির্যাতনের বিষয়টি অস্বীকার করেন। রিক্রুটিং এজেন্সির ম্যানেজার রায়হান পাটোয়ারি জানান, “এ বিষয়ে কখনো অভিযোগ জানানো হয়নি এজেন্সিতে। যদি কোন প্রকার সমস্যা হতো আগে থেকে অবশ্যয় এজেন্ট কুদ্দুস আমাদের জানাতো। উনি অথবা যাত্রীর পরিবার আমাদের সাথে যোগাযোগ করতো।”

মরদেহ দেশে আনতে অস্বীকার করেন তিনি। বলেন- “যে কোন কর্মী জীবিত অথবা মৃত, দূতাবাসের অধীনে গেলে দূতাবাসই তার সম্পূর্ণ দেখভাল করবে, মরদেহ দেশে আনার দায়িত্ব প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের, আমাদের নয়। আমরা স্বজনদের বলেছি বিএমইটিতে অভিযোগ জানাতে”।

মিডিয়ায় আলোচিত না হলে অর্থাভাবে মরদেহ দীর্ঘ সময় প্রবাসেই আটকে থাকে

নির্যাতন করা না হলে আত্মহত্যা কেন করবে ফাতেমা?পরিবারের এমন প্রশ্নের উত্তরে পাটোয়ারি ও তার সহযোগিরা দাবি করেন, ব্যক্তিগত কারণে কিংবা পারিবারিক সমস্যায় হতাশাগ্রস্ত হয়ে আত্মহত্যা করে থাকতে পারেন। তবে, কীভাবে আত্মহত্যা করেছেন– ফ্যানের সাথে ঝুলে নাকি অন্য কোনভাবে তা ঠিক পরিস্কার করে জানাতে পারেনি তারা, সহযোগি কেউ বললেন ফ্যানের সাথে ঝুলে আবার কৌশলে এড়িয়ে গেলেন প্রশ্ন!

সামর্থ না থাকায় মরদেহ দেশে আনতে দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন ফাতেমার স্বজনরা। কিন্তু তেমন আন্তরিকতা দেখায়নি সরকারি দপ্তরগুলোও। মরদেহ দেশে আনতে ৫ এপ্রিল ওয়েজ আনার্স কল্যাণ বোর্ডে আবেদন জানায় ফাতেমার পরিবার। কিন্তু সে আবেদনের ৩ মাস পরও কেন তার মরদেহ ফিরলো না এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে কল্যাণ বোর্ডের যুগ্ম সচিব, পরিচালক (প্রশাসন ও উন্নয়ন) মুশাররাত জেবীন জানান, “আবেদনের কোন তথ্য জানা নেই, এখানে অনেক বিভাগ আছে তারা কাজ করে, তারা জানতে পারে। সেক্ষত্রে খোঁজ নিয়ে দেখতে পারি।“

মুশাররাত জেবীন জানান, “যখন কেউ নিতান্তই না পারে তখন আমরা মরদেহ দেশে আনি। প্রকৃতপক্ষে প্রবাসী কর্মীর লাশ দেশে আনা আমাদের মূল কাজের মধ্যে এটা পরে না। আমরা তখনই হস্তক্ষেপ করি যখন নিতান্তই দায়গ্রস্ত কিংবা মানবিক দিক বিবেচনায় পড়ে, যে লাশটা অনেক দিন পড়ে আছে, একেবারেই আনএটেনডেন্ট তখন। না হলে কল্যাণ বোর্ডের কাজ হলো কর্মীর কল্যাণ করা, মানে ডেডবডি সরকারিভাবে আনা এটা আসলে আমাদের কাজ না।”
তবে, এ ক্ষেত্রে তথ্য থাকলে খোঁজ খরব নিয়ে দেখার কথা জানান তিনি। এ বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমেদ বলেন, “যারা বৈধভাবে বিদেশে যায় কোম্পানিই তাদের মরদেহ দেশে আনে, ফলে সমস্যা হয় না, আর অবৈধভাবে যারা যায়, কোন সমস্যা হলে ওয়েজ আনার্স কল্যাণ বোর্ড তাদের মরদেহ দেশে আনে। তাদের মাধ্যমে অনেক মরদেহই দেশে ফেরে”।
৫-৭ মাস দেরি হওয়ার বিষয়ে তিনি জানান, “এতোটা দেরি কিন্তু মন্ত্রণালয়ের জন্য হয় না। দেরির অভিযোগটা ঠিক নয়। ওখানে যে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স, বডি রিলিজ করাসহ নানা সমস্যা থাকে সে কারণে দেরি হয়। তবে আমার কাছে কাগজপত্র এলে আমি ওয়েলফেয়ার বোর্ডে পাঠিয়ে দেই।”

পরে, মিডিয়ার উপস্থিতির কারণে মরদেহ আনার তৎপরতা শুরু করে কল্যাণ বোর্ড। ১২ আগস্ট, ২০২২ দেশে ফেরে ফাতেমার মরদেহ। কিন্তু, কোন ধরনের পোস্টমর্টেম বা ফরেনসিক ছাড়াই। ফলে, মৃত্যুর পরেও ৭ মাস ৯ দিন বিদেশে অবস্থান করেও মৃত্যুর কারণটা অজানাই থেকে যায়! ফাতেমার মৃত্যুর পর সৌদি আরবে ডাক্তারের প্রাথমিক রিপোর্টে ময়না তদন্ত করার নির্দেশনা ছিলো। কিন্তু কনস্যুলেটের পাঠানো নো অবজেকশন চিঠিতে দেখা যায় ময়নাতদন্ত ছাড়াই দেশে ফেরত পাঠানো হয় ফাতেমার মরদেহ। এ ধরনের মৃত্যুর ক্ষেত্রে দেশেও কোন বিধান না থাকায় ময়নাতদন্ত ছাড়াই মানিকগঞ্জের নিজ গ্রামে দাফন করা হয় তাকে।
কতজনের ক্ষেত্রে এমনটা ঘটছে?
ঢাকা বিমানবন্দরে প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের তথ্য অনুসারে, বিদেশ থেকে প্রতিদিনই গড়ে ১৫-২০ জনের মরদেহ দেশে ফেরে। ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত ৫ মাসে দেশে ফিরেছে ১৩৮৯ জন প্রবাসী কর্মীর মরদেহ। ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত ফিরেছে প্রায় ৪০ হাজার মরদেহ। ২০১৫-২০২০ সাল পর্যন্ত ৪৮৭ জন নারীর মরদেহ দেশে ফিরেছে। যার মধ্যে আত্মহত্যায় মৃত্যু হয়েছে ৮৬ জনের। ১১টি দেশে মৃত্যুবরণকারী ৪৮৭ নারীদের মরদেহের মধ্যে শুধু সৌদি আরব থেকে ১৯৮ জন নারীর মরদেহ দেশে ফিরেছে।

তবে, বিভিন্ন সূত্রের হিসাবে যে সংখ্যক মরদেহ দেশে ফেরে তার দ্বিগুন মরদেহ স্থানীয়ভাবে সেই দেশগুলোতেই দাফন করা হয়। সৌদি আরবের জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেলের হিসাবে, গত বছর ২০২১ সালে ৪৩৫ জনের মরদেহ বাংলাদেশে পাঠানো হয়, কিন্তু একই সময়ে স্থানীয়ভাবে সৌদি আরবে দাফন করা হয় ৮৪৭ জন বাংলাদেশি প্রবাসী কর্মীর মরদেহ। আবার দেশে পাঠানো ৪৩৫ এর মধ্যে কেবল ৭ টি মরদেহ সরকারী অর্থায়নে দেশে পাঠানো হয়, বাকি ৪২৮ মরদেহই নিয়োগকর্তার অর্থায়নেই পাঠানো হয়। ফলে বেশিরভাগেরই মরদেহের খরচ বহন করে থাকে নিয়োগকর্তা। ২০২২ সালেও শুধু জানুয়ারিতেই ৪৭ টি মৃতদেহ বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে কিন্তু একই সময়ে স্থানীয়ভাবে দাফন করা হয়েছে ৬৩ জনের মরদেহ। ৪৭ জনের মরদেহ নিয়োগ কর্তার অর্থায়নেই প্রেরণ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য যে, ওয়েজ আনার্স কল্যাণ বোর্ড মৃতদেহ সৎকারের জন্য কেবল ৩৫ হাজার টাকা প্রদান করে থাকে স্বজনদের। এছাড়া অবস্থা বিবেচনায় কর্মী প্রতি স্বজনদের ৩ লাখ টাকা প্রদান করে থাকে।

‘আমরা লাশ নিয়া বসে থাকমু আর এজেন্সি ব্যবসা করবে!’

১৪ দিনের মাথায় লাশ হয়ে ফেরেন হাজেরা বেগম : সৌদি আরবে যাওয়ার মাত্র ১৪ দিনের মধ্যে মারা যান নরসিংদির রায়পুর উপজেলার বোয়ালমারা গ্রামের হাজেরা বেগম। প্রায় ৪ মাস দেশে ফেরে হাজেরা বেগমের মরদেহ। স্বজনদের দাবি তাকেও হত্যা করা হয়েছে। মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে নরসিংদি জেলা কর্মসংস্থান ব্যুরোতে আবেদন জানায় পরিবার। হাজেরা বেগমের স্বজন বলতে কেবল সৌদি প্রবাসী মামা হারুণ মিয়া, কয়েকদিনের ছুটিতে দেশে এসে হাজেরা বেগমের মৃত্যুর খবর পান।

যোগাযোগ করা হলে মুঠো ফোনে তিনি জানান, “সৌদি আরবে মালিকের বাসায় পৌছার ১ দিন পরেও কথা হয় হাজেরার সাথে। কিন্তু তারপর থেকে যোগাযোগ একেবারে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ফোনে খোঁজ খবর নিতে থাকি সৌদি আরবে। পরে ২৪ জুলাই সৌদি মালিককে ফোন করলে তারা জানায় আরো ৪-৫ দিন আগে মারা গেছে হাজেরা”।
হারুণ মিয়া বলেন, “বাসা মালিক জানায় হাজেরা মাথা ব্যাথার কারণে অতিরিক্ত ওষুধ খেযে মারা গেছে। আবার সৌদির কর্মী সংগ্রহকারী কোম্পানীতে ফোন দিলে তারা জানায়, ছাদে গলায় ফাঁস দিয়ে মারা গেছে হাজেরা”। ফলে হাজেরার মৃত্যু নিয়ে দুই পক্ষের দুরকম কথায় সন্দেহ বাড়ে পরিবারের।

হাজেরা বেগমের স্বামী পরিবারের ভরণপোষণ না করায়, ছোট ৩ সন্তানকে বড় করতে কাজের জন্য নিজেই সৌদি আরব যাত্রা করেন ৫ জুলাই, ২০২২। তবে পরিবারের অভিযোগ, হাজেরার মরদেহ দেশে আনতে একাধিকবার রিক্রুটিং এজেন্সি জাবির ইন্টারন্যাশনালের কাছে গেলেও আমলে নেয় নি তারা।

তবে হাজেরা বেগমের পূর্ব কোন রোগ কিংবা অসুস্থতা ছিলো কি না এমন প্রশ্নে তার মামা হারুণ মিয়া জানান, “যদি রোগ থাকতো তাহলে তো সে মেডিকেলেই আনফিট হয়ে যেতো। সে বিদেশে যেতেই পারতো না। মাত্র ১৪ দিনের ব্যবধানে তার কি করে কোন রোগ থাকবে? তাকে মেরে ফেলা হয়েছে। সৌদি কোম্পানীর লোক বলে ছাদে ডিশের লাইনের তারের সাথে ফাঁস নিয়ে মারা গেছে, এটা সম্ভব নয়। ডিশের লাইনে কখনো ঝুলে মারা যায়”!
তিনি বলেন, “আমরা চাই এজেন্সি ক্ষতিপূরণ আদায় করে দিক, হাজেরার লাশ দেশে এনে দিক। তার সাথে কি ঘটেছে, কিভাবে মারা গেলো তার পুলিশি তদন্ত হবে না? আমরা লাশ নিয়া বসে থাকমু, আর এজেন্সি ব্যবসা করবে”।

এদিকে যোগাযোগ করা হলেও কথা বলতে রাজি হয় নি রিক্রুটিং এজেন্সির কেউ। প্রায় ৪ মাস পর ১১ নভেম্বর ২০২২ দেশে ফেরে মৃত হাজেরা বেগমের মরদেহ। কিন্তু সেৌদি আরবের রিয়াদের বাংলাদেশ দূতাবাসের পাঠানো অনাপত্তি পত্রে হাজেরা বেগমের পোস্ট মর্টেমের চাহিদার কথা রিপোর্টে উল্লেখ করা হলেও কোন ময়নাতদন্ত সেখানে হয়নি।
অনিশ্চয়তায় ঝুঁকি নিয়ে পা বাড়াচ্ছেন নারীরা!

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার কর্মীদের মতে, বিদেশ যাত্রা থেকে শুরু করে দেশে ফেরা পুরো প্রক্রিয়াই স্বচ্ছ মনিটরিংয়ের আওতায় থাকা জরুরি। কিন্তু, এ ধরনের সক্রিয় কোন কার্যক্রম নেই।

জাতিসংঘের মহিলা বিষয়ক নেটওয়ার্ক ইউএনওমেন এর বিগত বছরের গবেষণা প্রতিবেদন অনুসারে মুলত দারিদ্রতার কারণে, কর্মসংস্থানের সুযোগ কম থাকায়, স্বামী ছেড়ে যাওয়া সন্তানদের লালন পালন করতে বিদেশ পাড়ি দেন বাংলাদেশের অধিকাংশ নারী কর্মীরা। বেশিরভাগই কাজ নিয়ে যান মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে। এর মধ্যে রয়েছে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতারের মতো দেশগুলো। সাধারণত পারস্য উপসাগরীয় যে দেশগুলোতে বাংলাদেশের নারী কর্মীরা কাজ করে সেসব দেশে গৃহকর্মীরা শ্রম আইনের আওতায় পড়েন না। ফলে এসব দেশের নিয়োগকর্তারা প্রবাসী গৃহকর্মীদের নিয়ন্ত্রণ, নির্যাতন, বেতন ঠিক মতো না দেয়া, চলাচলে নিষেধাজ্ঞা, অর্পযাপ্ত খাবার ও এক টানা অমানবিক কাজের চাপ দিয়ে থাকে। ফলে এসব দেশে নারী গৃহ কর্মী নির্যাতনের ঘটনাও বেশি।

বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের গবেষণা বলছে, চরম দারিদ্রতা, পারিবারিক অস্থিরতা, বেকারত্ব, তালাকপ্রাপ্ত কিংবা সন্তান লালন পালন ও আথিক অবস্থার উন্নতির কথা ভেবে ৯৮ শতাংশ নারীই বিদেশ পাড়ি দেন। যারা নানাভাবে স্থানীয় দালালদের দ্বারা প্রভাবিত হোন। বেশিরভাগেরই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তেমন না থাকায় কোন রকম যাচাই বাছাই ছাড়াই দালালদের প্রতারণার ফাঁদে পড়ে বিদেশ নির্যাতনের শিকার হোন।

বাংলাদেশ জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) এর হিসেবে- প্রতিবছর গড়ে ১ লক্ষ নারী কর্মী কাজ নিয়ে বিদেশে যান। এর মধ্যে ২০১৭ সালে সবচেয়ে বেশি নারী কর্মী বিদেশ গেছে- ১ লাখ ২১ হাজার। ২০২২ সালের সেপ্টম্বর পর্যন্ত গেছে ৮৫ হাজার ৭ শ নারী কর্মী। এর মধ্যে শুধু সৌদি আরবে গেছে ৫৫ হাজারের বেশি। যাদের বেশিরভাগই গৃহকর্মী হিসেবে গেছেন। ১৯৯১ সাল থেকে এ পর্যন্ত মোট নারী গৃহকর্মী গেছেন ১০ লক্ষেরও বেশি। (তথ্য সূত্র: বিএমইটি)

মরদেহ দেশে আনার ক্ষেত্রে জটিলতা কেন, দায় কার?
বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইন ২০১৩ অনুসারে, শ্রমকল্যাণ উইংয়ের দায়িত্ব হলো, মারা যাওয়া কর্মীদের তালিকা তৈরী, মৃত্যুর কারণ ও দাফন সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ ও নিয়োগ কর্তার থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের বিষয়গুলো দেখভালের।

আইনটির সপ্তম অধ্যায়ের ২৯ ধারার (৩) উপধারায় বলা হয়েছে – “কোন রিক্রুটি এজেন্টের অবহেলা বা বেআইনি কার্যক্রমের কারণে কোন অভিবাসী কর্মী বিপদগ্রস্ত হইয়া থাকিলে সরকার সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্টকে উক্ত অভিবাসী কর্মীকে দেশে ফিরাইয়া আনিবার খরচ বহন করিবার নির্দেশ প্রদান করিতে পারিবে।”

এ বিষয়ে এডভোকেট ও মানবাধিকার কর্মী নিগার সুলতানা জানান, নিয়োগ কর্তা খরচ বহন না করলে এ ধরনের সমস্যাগুলোর ক্ষেত্রে মরদেহ কাদের খরচে, কিভাবে দেশে আনা হবে তা অভিবাসন আইনে স্পষ্ট করা হয় নি। তবে, যেহেতু প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কল্যাণ বোর্ড আছে, তারা এই কাজটি করার কথা। সাধারণত মরদেহগুলো তারাই দেশে এনে থাকে। বলেন, এসব ক্ষেত্রে সরকারের দায়বদ্ধতা থাকে। যদি আইনে উল্লেখ নাও থাকে তবুও সরকারের দায় বদ্ধতা আছে দেশের নাগরিককে ফিরিয়ে আনা। সেক্ষেত্রে সেদেশের দূতাবাসের শ্রম উইংগুলো কর্মীদের অভিযোগগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করলে এসব সমস্যা অনেকটা কমে যেতো বলে মত তার।

বিদেশে বাংলাদেশের শ্রম উইংগুলো ঠিকমতো কাজ করে না বলেও অভিযোগ তোলেন এই মানবাধিকার কমী । এ ধরনের ঘটনা বা যে কোন নির্যাতনের ঘটনায় দূতাবাসের সেইফ হোম থাকলেও মামলা কিংবা ক্ষতিপূরণ আদায়ের আইনি প্রক্রিয়াগুলোতে দুতাবাসের কার্যক্রম তেমন একটা দেখা যায় না। কিন্তু এশিয়ার অন্য দেশগুলোর মধ্যে ফিলিপিাইন, নেপাল, ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলো এসব ঘটনাকে গুরুত্ব সহকারে দেখে, সে দেশের সরকারকে চাপ দেয় কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে তা হয় না।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য নমিতা হালদার জানান, “নারী পুরুষ যত কর্মীই বিদেশ যাক তাদের লাশ আনার দায়িত্ব সরকারের। সেই লাশ সরকার নিজ খরচেই ওয়েজ আনার্স কল্যাণ বোর্ডের মাধ্যমে দেশে আনে। দূতাবাস যখন মন্ত্রণালয়কে জানায় তারা তখন উদযোগটা নেয়।’

এই কাজের গাফিলতি ততটা হয় না বলেই মত তার। কিছু প্রক্রিয়াগত সমস্যার কারণেও দেরি হয় বলে জানান তিনি। নমিতা হালদার বলেন- “যে ঘটনা লুকানো হয় তা লুকানোই থেকে যায়, যা প্রকাশ্যে আসে তা বৈধভাবেই দেশে আনা হয়”।

দেশে ময়নাতদন্তের বিধান নেই; দীর্ঘসূত্রিতা ও আইনি ঝামেলা এড়াতে চায় পরিবারও
মুলত অর্থ সংকট ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোন বিবেচনায় দেশেও ময়নাতদন্তের বিষয়ে আগ্রহ দেখায় না পরিবারগুলো। এছাড়া আইনি প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ সূত্রিতার, কারণে আগ্রহ দেখান না তারা। আবার তাদের বেশিরভাগই অশিক্ষিত হ্ওয়ায় কোন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যেতে হবে, তার পথও খুঁজে পান না। ফলে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কিংবা রিক্রুটিং এজেন্সিতে আবেদন ও অভিযোগ জানিয়েই শেষ হয় তাদের বিচার পাওয়ার আশা। ফলে আত্মহত্যায় মারা যাওয়া প্রবাসী কর্মীদের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এভাবেই অজানা থেকে যায়।

এ বিষয়ে রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট (রামরু) এর পরিচালক, মেরিনা সুলতানা বলেন,”অন্য কারণে হয়তো মৃত্যু হয়েছে কিন্তু আত্মহত্যার মধ্যে ফেলা হয়েছে। সুতরাং আমরা কেবল ঐ পাশের রিপোর্টের উপরই ভরসা করছি, কিন্তু এখানেও (দেশে) আসলে বড় কাজ আমাদের করার থাকে।” এ ধরনের মৃত্যুর ক্ষেত্রে দেশেও ময়না তদন্তের তাগিদ দেন এই অভিবাসন বিশষজ্ঞ।

আত্মহত্যা কিংবা দূর্ঘটনায় মারা যা্ওয়া কর্মীদের দেশে ময়নাতদন্ত করা প্রয়োজন কি না এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমদ বলেন, “এখানে ময়নাতদন্ত করা হলেও, অপরাধ ধরা পরলেও, সেই মামলা চালাবে কে? এখানে মামলা গ্রহণযোগ্য হবে কিনা সেটাও আইনের ব্যাপার, পুলিশ বলতে পারবে। তবে পরিস্তিতির উপর নির্ভর করছে বিষয়টি। সরকারের পক্ষে বিদেশে গিয়ে সুরক্ষা দেয়া সম্ভব না, ওখানে দূতাবাসের পক্ষেও সেই সুরক্ষা দেয়া সম্ভব না এটা করতে হবে সে দেশের আইন শৃংখলা বাহিনীকেই “

সৌদিআরবে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশি গৃহকর্মী হত্যার বিচার

২০১৯ সালের ২৪ মার্চে নিজ গৃহকর্তার বাসায় হত্যা করা হয় আবিরন বেগমকে। মৃত্যুর ৫১ দিন পর তার পরিবার আবিরনের খবর জানতে পায়। শুরুতে তার পরিবারকেও বলা হয় দূর্ঘটনায় মারা গেছেন আবিরণ। এজেন্সি ও দূতাবাস মাধ্যমে এই কথা জানানো হয়। তখনও স্বজনরা জানান, তার নিয়োগকর্তা আবিরণের ওপর নির্মম নির্যাতন চালায় এমনকি দুই বছরে কোন বেতনও দেয়নি।

পরে সৌদি আরবে মামলা হলে জানা যায়, হত্যা করা হয় আবিরণকে। হত্যা মামলার বিচার শুরু হলে সৌদি আরবের ক্রিমিনাল কোর্ট- ২০২১ সালের ১৪ ফেব্রয়ারি আবিরণকে হত্যার দায়ে নিয়োগকর্তার মৃত্যু‌দন্ডের রায় ঘোষণা করেন। সাজা পান সহযোগি আসামীরাও। মাত্র ২ বছরের মাথায় নির্যাতন ও হত্যার শিকার হোন আবিরণ।

২০১৯ সালে আবিরণ হত্যার ঘটনার সময় বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সদস্য ছিলেন প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব নমিতা হালদার। আবিরণ হত্যা মামলার বিষয়টি আলোচিত হলে তার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন তিনি।

ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরে নমিতা হালদার বলেন- “আবিরণকে অত্যাচার করা হলে এক পর্যায়ে তিনি মৃত্যু বরণ করেন। কোন না কোনভাবে বিষয়টি সৌদি আরবে রেড ক্রিসেন্ট জানতে পারলে এক পর্যায়ে তারা আবিরণকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। তখনই সব ঘটনা বের হয়ে আসে। আবিরণকে গরম পানিতে চুবিয়ে রাখা হয়েছিলো। উদ্ধার করা হয় বাথরুমের গরম পানির ট্যাবের নিচ থেকে। পরবর্তীতে যখন বিচার কাজ শুরু হয় তখন নিয়োগকর্তা বলে যে, তারা মনে করেছিল যে ওকে গরম পানি দিলে সুস্থ হয়ে যাবে।”

তিনি বলেন- রেড ক্রিসেন্ট মরদেহ নিয়ে যাওয়ার পর আমরা পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট দেখেছি যে তাকে অত্যাচার করেই মারা হয়েছে। এটা কিন্তু আমাদের দূতাবাস পরে জানলো। নিযোগ কর্তার বাড়িতে থাকা অবস্থায় কোনভাবেই তাকে সাহায্য করা হয় নি। বরং এটা লুকানোর সবোর্চ্চ চেষ্টা করা হয়েছে। পরবর্তীতে মামলা হলে পরে দূতাবাস প্রচন্ড তৎপর হয়ে যায় এবং মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভুমিকা নেয়।

কিভাবে আলোচিত হলো আবিরণের হত্যার ঘটনা? আবিরণের মৃত্যুর খবর পেয়ে স্বজনরা মরদেহ আনতে বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডে আবেদন জানাতে গেলে সেখান থেকেই খবর পেয়ে যোগাযোগ করে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক এর অভিবাসন কর্মসূচীর সাথে। পরে, ব্র্যাকের অভিবাসন বিষয়ক প্রোগ্রামের প্রধান শরিফুল হাসান ও ম্যানেজার আল আমিন নয়ন ঘটনাটি ফলো করতে থাকেন। ওই বছরই আবিরণের মরদেহ দেশে ফিরলে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আবিরণের পরিবারের বক্তব্য ও পুরো ঘটনা একটি জাতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।

পরে সেই সংবাদ আমলে নিয়ে ঘটনা তদন্তের কাজ শুরু করে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। তখন তার তদন্ত ভার পড়ে নমিতা হালদারের উপর। কিভাবে সে গেল, দালাল চক্র কিভাবে নিয়ে গেলো, কিভাবে দুই বারই এয়ারপোর্টে গিয়ে ফেরত এলো আবিরণ, দুই দফায় বিএমইটি স্মার্ট কার্ড তেরীতে বিএমইটির ইমগ্রেশন দপ্তরের গাফিলতি ও সম্পৃক্ততার বিষয়টিও ওঠে আসে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের রিপোর্টে।

“আত্মহত্যায় ময়নাতদন্ত ছাড়াই দেশে ফেরে মরদেহ”

মানিকগঞ্জের ফাতেমা আক্তারের মরদেহ দেশে ফেরে ময়নাতদন্ত ছাড়াই। যদিও তার প্রাথমিক রিপোর্টে পোস্টমর্টেম করার কথা উল্লেখ রয়েছে। একইভাবে হাজেরা বেগমের অনাপত্তি পত্রে পোস্টমর্টেম করার কথা উল্লেখ থাকলেও সে বিষয়ে কিছুই জানেন না পরিবার। এ বিষয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য নমিতা হালদার বলেন, “বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যারা আত্মহত্যা কিংবা অন্য কোন ঘটনায় মারা যান সেসব বিষয় জানানোই হয় না। শুধু বাড়িআলারা (নিয়োগকর্তারা) খবর দিয়ে দেয় সে মারা গেছে, মরদেহ দেশে পাঠাতে হবে। পুলিশের হস্তক্ষেপই পড়ে না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই জানাজানিটা কম হয় বলেই মামলা হয় না”। তার মতে, বিভিন্নভাবে ঘটনাগুলো ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করা হয়, যাতে কেউ জানতে না পারে।

“সৌদিতে বিচার হলেও দেশে চার্জশিটই হয় না’ আবিরণ হত্যাকান্ডের ঘটনায় সৌদি নিয়োগকর্তা সরাসরি দায়ী থাকলেও অনিয়ম ও আইন বিরুদ্ধভাবে বিদেশ পাঠানো হয় তাকে। দালাল চক্ররা নানাভাবে প্রতারিত করে আবিরণকে বিদেশে পাঠায়। এমনকি তাকে বর্হিগমন প্রশিক্ষণের নামে অনৈতিক পন্থায় বিদেশ পাঠানো হয়। মুলত প্রতারণার কার্যক্রম শুরু হয় দেশ থেকেই স্থানীয় দালাল ও রিক্রুটিঙ এজেন্সির মাধ্যমে। এছাড়া আবিরণের বিদেশ যাওয়ার ক্ষেত্রে দুটি রিক্রুটিং এজেন্সির সম্পৃক্ততা, বিএমইটির এক কর্মচারীর সম্পৃক্ততাসহ নানা অনিয়মের ঘটনা ওঠে আসে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ওই তদন্ত রিপোর্টে।

এ বিষয়ে নমিতা হালদার বলেন, প্রথম বার এয়ার পোর্ট থেকে ফেরত পাঠানো হয়, তার বিএমইটি স্মার্ট কার্ড হয় নি। পরে দুইবার স্মার্ট কার্ড হলো। বিএমইটি কার্ডের ইমিগ্রেশন এটাতে জড়িত ছিলো। তারা অহরহই জড়িত থাকে।’

সে সময় মানবপাচারের অভিযোগে একাধিক রিক্রুটিং এজেন্সি, এজেন্টসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন-২০১২ এর ৭ ও ৮ ধারায় মামলা দায়ের করা হয় খুলনার পাইকগাছা থানায়। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে এ মামলা দায়ের করা হলেও আজ পর্যন্ত মামলার কোন অগ্রগতি নেই। ফলে দেশে বিচার না পাওয়ায় হতাশা ব্যক্ত করে আবিরণের পরিবার।

নমিতা হালদার বলেন, “দু:খজনক হলো, সেই দালালরা এখনও ঘুরে বেড়াচ্ছে। বাবা ছিলেন মামলার বাদী। কিন্তু তার বাবা মা মারা দু জনেই এখন মৃত। এতো আলোচিত একটা ঘটনা, সৌদি আরবে বিচার হয়ে গেলো কিন্তু বাংলাদেশে দালালরা ঘুরে বেড়ায়। তাদের বিচার হয় না। এখানে থানারও অবহেলা আছে, শুরুতে থানা মামলা নিতে রাজি হয় না, তদন্ত করে না, আসামী ধরে না, তখন পরিবার অভিযোগ করলে মামলা পরে সিআইডিতে যায়।“

আবিরণের পরিবার জানায়- ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে মামলা হলেও চার্জশিট দেয়া হয় ২০২২ সালের মার্চে। এখন পর্যন্ত আসামী গ্রেফতার না হওয়ায় দু:খ প্রকাশ করেন আবিরণের ভাই আইয়ুব আলী। বলেন পুলিশের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন সময় সমঝোতা করার প্রস্তাব দেয়া হয়।

আবিরণ হত্যা মামলার অগ্রগতি জানতে যোগাযোগ করা হলে খুলনা সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম জানান, ২৯ মার্চ ২০২২ তারিখে আবিরণ হত্যা মামলার চার্জশিট আদালতে জমা দেন। ফলে মামলাটি এখন খুলনার আদালতে বিচারাধীন আছে। তবে, চার্জশিট জমা দিতে ২ বছরের বেশি সময় লাগার বিষয়ে তিনি বলেন, প্লেস অব অকারেন্স দেশের বাইরে হওয়ায়, সাক্ষ্য প্রমাণ যোগাড় করতে গিয়ে এতোটা সময় লেগে গেছে।

মামলার অগ্রগতি নিয়ে হতাশ আবিরণের পরিবার। আক্ষেপের সুরে আইয়ুব আলী জানান- বাবা মামলার বাদী ছিলেন, এখন তিনি মৃত। তিনি বিচারের জন্য হাহাকার করেছেন। কিন্তু বিচার দেখে যেতে পারলেন না। যেখানে সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ হলো সেখানে বাংলাদেশে অপরাধীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মামলার চালিয়ে নিতে আইনি সহায়তা দেয়ার কথাও জানান তিনি।

লেখক : সাবিনা পুঁথি, মিডিয়া ফেলো


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: