ই-পেপার মঙ্গলবার ১৬ জুলাই ২০২৪
মঙ্গলবার ১৬ জুলাই ২০২৪

মাহমুদুল হকের উপন্যাসের বিষয়-আশয়
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৭ নভেম্বর, ২০২৩, ২:৫০ এএম আপডেট: ১৭.১১.২০২৩ ৭:৪০ এএম  (ভিজিট : ১০৩৭)
বাঙালি শিক্ষিত পাঠকমাত্রই বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অমর সাহিত্যকীর্তি ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসের সঙ্গে পরিচিত। নানান কারণেই এই উপন্যাসটি আজও আমাদের সমাদর পায়। বাঙালির হারিয়ে যাওয়া জীবন যেন আজও সেই উপন্যাসের মধ্যে লিপিবদ্ধ হয়ে আছে।

‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসের নায়ক শিশু-কিশোর কিন্তু এটি কোনো শিশুতোষ উপন্যাস বা কিশোর উপন্যাস নয়। বিশ শতকেই আমরা আরও একজন ঔপন্যাসিককে পাই যিনি একজন কিশোরকে কেন্দ্র করে উপন্যাস রচনা করেছেন কিন্তু সেটি কোনো মতেই কিশোর উপন্যাস নয়। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বিভূতি-উত্তর সেই লেখকের মধ্যে প্রচুর অমিল বা পুরোটাই ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও আরও একটি মিল আমরা দুই জনের মধ্যে পাই। ‘পথের পাঁচালী’ যেমন বিভূতিভূষণের প্রথম রচিত উপন্যাস, ঠিক একইভাবে বিভূতি-উত্তর লেখকের কিশোরকে কেন্দ্র করে লেখা উপন্যাসটিও প্রথম উপন্যাস। যাহোক, আর অকারণে সাসপেন্স তৈরি করে লাভ নেই। আমরা বলছি কথাসাহিত্যিক মাহমুদুল হকের কথা। মাহমুদুল হক (১৯৪১-২০০৮) প্রথম উপন্যাস ‘অনুর পাঠশালা’ রচনা করেন ১৯৬৭ সালে। উপন্যাসটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় ১৯৭৩ সালে। অবশ্য ১৯৭০ সালে এটি প্রথমে একটি পত্রিকায় মুদ্রিত হয়। গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হওয়ার সময় এটির নাম করা হয় ‘খঞ্জনা পাখী’। তবে দ্বিতীয় মুদ্রণ থেকে উপন্যাসটি ‘অনুর পাঠশালা’ নামেই প্রকাশিত হয়। 

অনু উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র। মূলত তার দৃষ্টিকোণ থেকেই উপন্যাসের কাহিনি বয়ান করা হয়েছে। অনু উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান। তার বাবা-মায়ের মধ্যে সদ্ভাব নেই। অনুর প্রতিও তাদের খেয়াল নেই। তাদের মধ্যে রয়েছে আরও নানাবিধ জটিলতা। বাবা প্রতিদিন সকালে তার কাজে চলে যায়। মা দুপুর হলেই দরজা বন্ধ করে এক ইংরেজি শিক্ষকের কাছে ইংরেজি শেখে। সেই নিঃসঙ্গ সময় অনু বেরিয়ে পড়ে। অনুদের বাড়ির পাশেই বস্তি। অনু সেখানে যায়। যদিও সেখানে যাওয়া তার জন্য নিষিদ্ধ। তারই বয়সি নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে সে মেশে। বয়সে অনুর সমান হলেও নানা বিষয়ে অনুর চেয়ে তাদের জ্ঞান বেশি। এমনকি যৌনতা সম্পর্কে তাদের অগাধ জ্ঞান। এখানে একটা বিষয় সম্পর্কে উল্লেখ করা যেতে পারে, আমাদের সাহিত্যে সাধারণত কিশোর-কিশোরী নির্মল চরিত্র হিসেবেই উঠে আসে। কিন্তু মাহমুদুল হক ‘অনুর পাঠশালা’য় কিশোর-কিশোরীদের বিশেষ করে নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েরা যে বাস্তবতার করাল গ্রাসে অনেক আগেই পরিপক্ব হয়ে ওঠে, ঔপন্যাসিক সেটি তুলে ধরেছেন। অনুর মনোজগৎকে লেখক লিপিবদ্ধ করেছেন। তাই এটিকে মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসও বলা যায়। এবং মাহমুদুল হক এই উপন্যাসটিকে এমন এক ফ্যান্টাসির জায়গায় এনে সমাপ্ত করেন যে, উপন্যাস শেষ হয়ে গেলেও পাঠকের ভাবনা নতুন করে শুরু হয়।

মাহমুদুল হকের দ্বিতীয় উপন্যাস ‘নিরাপদ তন্দ্রা’ প্রকাশিত হয় ১৯৭২ সালে। উপন্যাসটি তিনি রচনা করেন ১৯৬৮ সালে। এই উপন্যাসেও লেখক মানুষের জীবনে আলো-আঁধারির খেলা, যে রহস্যময় জগৎ-তা তুলে ধরেছেন। 

মাহমুদুল হকের তৃতীয় উপন্যাস ‘জীবন আমার বোন’। উপন্যাসের রচনাকাল ১৯৭২। গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় ১৯৭৬ সালে। বহুল আলোচিত উপন্যাস এটি। ১৯৭৩ সালে ‘বিচিত্রা’র ঈদ সংখ্যায় প্রকাশিত হওয়ার পরই বিপুল সাড়া ফেলে। বিশ্বজিৎ ঘোষ এই উপন্যাস সম্পর্কে বলেছেন, ‘নাগরিক মধ্যবিত্ত জীবনযন্ত্রণারই শব্দরূপ।’

এই উপন্যাসের পটভূমি ১৯৭১ সালের ১ মার্চ থেকে ২৭ মার্চের ঢাকা শহর। উপন্যাসে অনেকগুলো চরিত্র থাকলেও কেন্দ্রীয় চরিত্র খোকা। যে কি না রাজনীতিসচেতন হয়েও, রাজনীতিতে সক্রিয় নয়। মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসে এক ভিন্ন আলোকে ঔপন্যাসিক খোকাকে আমাদের সামনে উপস্থাপন করেছেন। 

প্রসঙ্গত বলা যায়, ‘জীবন আমার বোন’ নামে আবদুল মান্নান সৈয়দের একটি কবিতা আছে। মান্নান সৈয়দ কিছুটা অনুযোগ করেছেন, মাহমুদুল হক তার কবিতা থেকে নামটি গ্রহণ করলেও কোথাও সেই ঋণ স্বীকার করেননি। তবে মাহমুদুল হক এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তিনি নামটি বরিস পাস্তেরনাকের কবিতা ‘মাই সিস্টার, লাইফ’ থেকে গ্রহণ করেছেন। 

‘চিক্কোর কাবুক’ মাহমুদুল হকের কিশোর উপন্যাস। প্রকাশিত হয় ১৯৭৯ সালে। ছোট্ট এবং ভিন্ন স্বাদের একটি উপন্যাস। অ্যাডভেঞ্চারধর্মী এই উপন্যাসের ভাষা ভীষণ মায়াময়। বর্ণনার চমৎকারিত্ব, ভাষার মাধুর্য এই কিশোর উপন্যাসটিকে সব বয়সিদের পাঠোপযোগী করে তুলেছেন। 

‘খেলাঘর’ উপন্যাসটি মাহমুদুল হকের আরেকটি মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে রচিত উপন্যাস। এটি প্রকাশিত হয় ১৯৮৮ সালে। একটি যুদ্ধের ফলে আমরা তিন শ্রেণির মানুষকে দেখতে পাই-এক. ভিকটিম, দুই. প্রতিবাদী, প্রতিরোধকারী, তিন. দ্বিধাগ্রস্ত মানুষ।

উপন্যাসে রেহানা ভিকটিম। স্কুল মাস্টার মুকুল প্রতিবাদী, প্রতিরোধকারী। অন্যদিকে কলেজ শিক্ষক ইয়াকুব দ্বিধান্বিত। উপন্যাসটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এক নিপুণ কৌশলে টেনে নিয়ে গেছেন। পাঠক একের পর এক অমীমাংসিত প্রশ্নের মুখোমুখি হতে থাকে। উপন্যাসের শেষে এসে লেখক সব প্রশ্নের সমাধান দেন। 

‘কালো বরফ’ ১৯৯২ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। দেশভাগের যন্ত্রণাই এই উপন্যাসের মূল উপজীব্য। সেই সঙ্গে রয়েছে শিকড় হারানো মানুষের মর্মবেদনা। শৈশব এবং কৈশোরের স্মৃতিকাতর আবদুল খালেক এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র। মফস্বলের কলেজশিক্ষক এবং তার অন্তর্গত পোকা নিয়েই এই উপন্যাস গড়ে উঠেছে।

মাহমুদুল হক খুব বেশিদিন লেখালেখি করেননি। নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন লেখালেখি থেকে। তবে তিনি যে সাহিত্যকীর্তি গড়ে গেছেন, তা সত্যিই আমাদের বিস্মিত করে। কেননা তার এক উপন্যাস থেকে অন্য উপন্যাসের ভাষা, আঙ্গিক সম্পূর্ণ ভিন্ন। আলাদা। এই ভিন্নতাই তাকে স্বাতান্ত্রিকতা দান করেছে। উপন্যাসকে পাঠকের কাছে আদরণীয় করে তুলেছে। 

সময়ের আলো/আরএস/ 




https://www.shomoyeralo.com/ad/1698385080Google-News-Update.jpg

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫ | ই-মেইল : shomoyeralo@gmail.com
close