দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষে গঠিত নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যরা ১১ জানুয়ারি শপথ নেওয়ার পর ১৪ জানুয়ারি থেকে দায়িত্ব পালন শুরু করেন।
রোববার (২১ জানুয়ারি) নতুন মন্ত্রিসভার এক সপ্তাহ পূর্ণ হয়েছে। এই সময়ে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার পাশাপাশি কর্মকর্তা কর্মচারিদের সঙ্গে পরিচিত হওয়া, বিশিষ্ট ব্যক্তি ও বিভিন্ন সংগঠনের কাছ থেকে সংবর্ধনা গ্রহণ এবং কর্মপরিকল্পনা তৈরিতেই ব্যস্ত ছিলেন বলে মন্ত্রণালয়ের সংস্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
দায়িত্ব গ্রহণের দিন নতুন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা মন্ত্রণালয়ের অধিনস্থ সংস্থা ও দপ্তর প্রধানদের সঙ্গে বৈঠক করে মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জেনেছেন। পরের দিন সোমবার মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে অংশ নেন তারা। তবে করোনা পজেটিভ হওয়ায় প্রথম বৈঠকে অংশ নিতে পারেননি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী র আ ম ওবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী। বর্তমানে তিনি করোনা নেগেটিভ হয়েছেন বলে জানা গেছে।
মন্ত্রিসভার পরে মঙ্গল ও বুধবারও সচিবালয়ে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের দপ্তরে ফুল নিয়ে বিভিন্ন সংগঠন ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের শুভেচ্ছা জানাতে ভীড় লক্ষ্য করা গেছে। বৃহস্পতিবার অধিকাংশ মন্ত্রীই নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন।
বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, প্রথম সপ্তাহে মন্ত্রীরা ব্যস্ত ছিলেন আগামী একশ’ দিনের কর্মপরিকল্পনা তৈরির কাজ নিয়ে। দায়িত্ব গ্রহণের পর সিন্ডিকেট ভেঙ্গে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য তৎপর হতে দেখা গেছে বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী আহসানুল ইসলাম টিটুকে। কয়েক দিন ধরেই তিনি দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছেন। নির্বাচনের পর চালের বাজারে ঊর্ধ্বগতিতে উদ্বিগ্ন দেখা গেছে খাদ্য মন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদারকে।
তিনিও চালের দাম কমাতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেছেন। সর্বশেষ রোববার বিকেলে দেশের খোলা বাজারে নিত্যপণ্যের সরবরাহ বাড়ানোর কৌশল নির্ধারণ, মজুতদার ও সিন্ডিকেটের কারসাজি রোধ এবং প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির মাধ্যমে দ্রুত সময়ে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের উপায় বের করতে আন্তঃমন্ত্রণালয় জরুরি সভা করেছেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীরা।
অর্থমন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে বিকেল সোয়া ৫টার দিকে অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর সভাপতিত্বে বৈঠকে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার, কৃষিমন্ত্রী আব্দুস শহীদ, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মো. আব্দুর রহমান, বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী আহসানুল ইসলাম টিটু, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার, এনবিআর চেয়ারম্যানসহ রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
জানা গেছে, সভায় বিভিন্ন পণ্যের উৎপাদন ও আমদানি পরিস্থিতির সঙ্গে চাহিদা বিশ্লেষণ করে ঘাটতি চিহ্নিত করা এবং রমজানের আগে ঘাটতি মেটাতে পণ্য আমদানি এবং চাল, আটা, তেল, চিনি, আলু, পেঁয়াজ, গরুর মাংস, ডিম ও পোলট্রি পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করা কারসাজির হোতাদের চিহ্নিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী আহসানুল ইসলাম টিটু সাংবাদিকদের জানান, এতদিন বাজার ব্যবস্থাপনার বিষয়টি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এককভাবে সামলেছে। তবে এখন থেকে তাদের সঙ্গে অর্থ, কৃষি, মৎস্য ও প্রাণী, শিল্প ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যৌথভাবে কাজ করবে। বাজারে পণ্য সরবরাহ বাড়াতে এ সমন্বয়েই সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হবে।
গত এক সপ্তাহে ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশের কুটনীতিকদের সঙ্গেও নিজ দপ্তরে বৈঠক করেছেন মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রীরা। দায়িত্ব নেওয়ার পরের দিন সোমবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাত করেন ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার পর হাছান মাহমুদের সঙ্গে এটিই প্রথম কোনো বিদেশি রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাত ছিল। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ঐ বৈঠকে মন্ত্রী দুই নিকটতম প্রতিবেশীর মধ্যে বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিষয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং আগামী দিনগুলোতে আরো ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
এরপরে ১৭ জানুয়ারি নবনিযুক্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদের সাথে সাক্ষাৎ করতে আসেন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ককে আরও ঘনিষ্ঠ করার লক্ষ্যে বাণিজ্য বিস্তৃতি, জঙ্গি-দমন, 'ফ্যানাটিজম' মোকাবিলাসহ সকল ক্ষেত্রে একসাথে কাজ করার বিষয়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনার কথা জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
বিদেশি কুটনীতিকরা সড়ক পরিবহন মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, কৃষি মন্ত্রী মো. আবদুস শহীদ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, আইন মন্ত্রী আনিসুল হকসহ অন্য মন্ত্রীদের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন। গত বুধবার দুপুরে সচিবালয়ে কৃষিমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ঢাকায় নিযুক্ত জার্মানির রাষ্ট্রদূত আচিম ট্রোস্টার। রোববার সচিবালয়ে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক এর সঙ্গে বৈঠক করেন মার্কিন দূতাবাসের লেবার অ্যাটাসে লিনা খান ও প্রথম সচিব (রাজনৈতিক) ম্যাথিউ বেহ। শ্রম শিল্পে 'থ্রেস হোল্ড' (ট্রেড ইউনিয়ন গঠনে শ্রমিকদের স্বাক্ষরের হার) কমানোর বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র পার্টনার হিসেবে কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করে।
সংস্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দায়িত্ব নেওয়ার পর পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, স্বাস্থ্য মন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন, বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ, বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী আহসানুল ইসলাম টিটুসহ বেশ কয়েকজন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীকে এক সপ্তাহ ধরে বেশি তৎপর দেখা গেছে। বিশেষ করে গ্যাস সংকট শুরু হওয়ায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানী প্রতিমন্ত্রীকে কয়েক দিন ধরেই ব্যস্ত সময় কাটাতে হচ্ছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী অবৈধ হাসপাতাল ও ক্লিনিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি ইতিমধ্যে বিভিন্ন জেলায় হাসপাতাল পরিদর্শন শুরু করেছেন।
দেশে কৃষিপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে মধ্যসত্ত্বভোগীদের ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুস শহীদ। তিনি বলেছেন, যে পদ্ধতি অনুসরণ করলে মধ্যসত্ত্বভোগীদের ধ্বংস করে দেওয়া যাবে আমরা সেই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে চাই। আমরা ভোক্তাদের জন্য মার্কেট স্টাডি করতে চাই। মার্কেট মনোপলি না ওলিগপলি সেটি দেখে ব্যবস্থা নিতে হবে। বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য যতগুলো সেক্টর আছে সবাই একত্রিত হয়ে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন কৃষি মন্ত্রী।
দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরীর তৎপরতাও লক্ষ্য করা গেছে। মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন অগ্রাধিকার মূলক কর্মাকাণ্ড অন্তর্ভুক্ত করে ১০০ দিনের কর্মপরিকল্পনা করছেন তিনি। বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, পানিদূষণ, প্লাস্টিক-পলিথিন দূষণ এবং পাহাড় কর্তন রোধে স্টেকহোল্ডারদের পরামর্শ গ্রহণ করে সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার এবং মুজিব ক্লাইমেট প্রসপারিটি প্ল্যান অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা হবে। টেকসই উন্নয়ন, বন দখল রোধে আইনের যথাযথ প্রয়োগ করা হবে। আন্তর্জাতিক অর্থছাড়ের চেষ্টা করা হবে। পরিবেশ, বন, জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়কে পারফর্মেন্সের দিক দিয়ে ১ নম্বরে নেয়ার চেষ্টা করা হবে।
শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী দায়িত্ব গ্রহণের পর শিক্ষামন্ত্রণালয়ের অধিনস্থ সকল অধিদপ্তর ও দপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোর শিক্ষার মান বাড়ানোর জন্য পদক্ষেপ গ্রহণের কথা জানান। মাদ্রাসাগুলোতে আধুনিক শিক্ষা বিস্তারে মাদ্রাসা শিক্ষকদের সহযোগিতা চেয়েছেন।
সময়ের আলো/এম