মসলিনেরও জিআই চেয়েছে ভারতঢাকাই মসলিন শাড়িরও নিজেদের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি চেয়েছে ভারত। পশ্চিমবঙ্গ সরকার গত বছর আবেদন করেছে বলে জানিয়েছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। বাংলাদেশের টাঙ্গাইলের শাড়িকে ভারতের জিআই পণ্য ঘোষণার শোরগোলের মধ্যেই এমন তথ্য জানাল সিপিডি। শনিবার রাজধানীর ধানমন্ডির কার্যালয়ে ‘টাঙ্গাইল শাড়িকে পশ্চিমবঙ্গের জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি : প্রক্রিয়া, পরিস্থিতি ও বাংলাদেশের করণীয়’ শীর্ষক সভায় এ তথ্য জানান তিনি।
মূল বক্তব্যে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য জানান, ২০২৩ সালের ৩১ অক্টোবর ‘বেঙ্গল মসলিন’ শিরোনামে-এ আবেদন করেছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সরকার। তিনি বলেন, শুধু মসলিনই নয়। ইতিমধ্যে বাংলাদেশের পণ্য ফজলি আম, লক্ষ্মণভোগ, ক্ষীরসাপাতি আম, নকশিকাঁথা, রসগোল্লা, জামদানি শাড়ি, সুন্দরবনের মধুর স্বত্ব তারা নিজেদের করে নিয়েছে। টাঙ্গাইল শাড়ির ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যের প্রেক্ষাপটে ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনকে দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে মেধাস্বত্বের সব বিষয় দেশের ভেতরে ও বাইরে মোকাবিলার জন্য একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছে সিপিডি।
অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ভারতে অর্ধসত্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের আশ্রয় নিয়ে টাঙ্গাইল শাড়িকে নিজেদের ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। টাঙ্গাইল শাড়ি কখনোই ভারতের জিআই পণ্য হতে পারে না। তিনি বলেন, এখনও আমাদের হাতে সময় রয়েছে। প্রথম কাজ যেটি করতে হবে তা হলো ভারতীয় আইনে বাংলাদেশ হাইকমিশনকে মামলা করতে হবে। একই সঙ্গে এই মামলা লড়ার জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ আইনজীবী নিয়োগ দিতে হবে।
ভারতে টাঙ্গাইল শাড়ির জিআই আবেদনের নানা অসঙ্গতি তুলে ধরে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সেখানে বলা হয়েছে, দেশভাগের সময় টাঙ্গাইল থেকে হিন্দুদের তন্তুবায় সম্প্রদায় দেশত্যাগ করে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় যায়। তারাই এই শাড়ি বানানোর সঙ্গে জড়িত। বাস্তবে টাঙ্গাইল অঞ্চলে দীর্ঘসময় ধরে শুধু হিন্দু নয়, মুসলিম সম্প্রদায়ের অনেকে এই শাড়ি বানায়। আর বাস্তবে হিন্দুদের চেয়ে এই শাড়ি উৎপাদনের সঙ্গে মুসলিমরাই বেশি জড়িত।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য আরও বলেন, কোনো পণ্যের জিআই স্বীকৃতির জন্য তার ভৌগোলিক উৎস, মান এবং সুরক্ষার বিষয় জড়িত। টাঙ্গাইল শাড়ি তৈরির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের অনেকেই দেশ বিভাগের সময় পশ্চিমবঙ্গ চলে গেছেন। কিন্তু এই শাড়ির ভৌগোলিক পরিচয় তো তাতে পাল্টে যেতে পারে না। ভারতে এই শাড়িকে জিআই করতে গিয়ে প্রতারণামূলক তথ্যের ওপর আশ্রয় নেওয়া হয়েছে।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ভারতের জিআই আইন অনুযায়ী তিন মাসের মধ্যে আপত্তি থাকলে তা করতে হবে। এখন বাংলাদেশের উচিত ভারতের আদালতে গিয়ে মামলা করা এবং সেটি তিন মাসের মধ্যে করতে হবে। ভারত যেসব যুক্তিতে টাঙ্গাইল শাড়িকে জিআই করেছে, সেগুলো তথ্যনির্ভর নয়। সেগুলো ধোপে টিকবে না। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পাল্লাই ভারী। কিন্তু সেটিকে কাজে লাগাতে হবে। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন।
অনুষ্ঠানে সিপিডির আরেক সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, শুধু প্রক্রিয়াগত ত্রুটির কারণে মেধাস্বত্ব-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সালিশে হারজিত নির্ধারিত হয়। তাই আমাদের সাবধানে এবং দক্ষতার সঙ্গে এগোতে হবে।
সম্প্রতি বাংলাদেশের বিখ্যাত টাঙ্গাইল শাড়িকে নিজস্ব জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয় ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়। এ নিয়ে বাংলাদেশের নেটিজেনদের মধ্যে ক্ষোভ ও প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। পরে গত বুধবার জিআই পণ্য হিসেবে ‘টাঙ্গাইল শাড়ি’কে স্বীকৃতি দেয় শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদফতর (ডিপিডিটি)।
সময়ের আলো/আরএস/