প্রকাশ: বুধবার, ১৭ জুন, ২০২০, ১২:০০ এএম (ভিজিট : ১৪৪৪)
আল্লাহ তায়ালা মানুষকে সৃষ্টির সেরা বানিয়ে কিছু স্বভাবজাত সৌন্দর্য তার মধ্যে দিয়েছেন। এই গুণগুলোর মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলো লজ্জা। ইসলামে এর খুব গুরুত্ব। ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে আছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) এক আনসারির কাছ দিয়ে যাচ্ছিলেন। সে অন্য এক ব্যক্তিকে লজ্জা সম্পর্কে উপদেশ দিচ্ছিল। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘তাকে ছাড়! কেননা লজ্জা ঈমানের অংশ।’ (আল জামিউ বাইনাস সাহিহাইন, হাদিস : ১২৭৩)
হজরত যায়েদ ইবনে তালহা (রা.) থেকে বর্ণিতÑ রাসুল (সা.) বলেছেন, প্রত্যেক ধর্মের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য থাকে। ইসলামের বৈশিষ্ট্য হলো লজ্জাশীলতা। লজ্জা এবং ঈমান একটি আরেকটির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যার মধ্যে পরিপূর্ণ ঈমানের গুণ থাকবে তার মধ্যে অব্যশই লজ্জার মতো মূল্যবান গুণও থাকবে। যার মধ্যে লজ্জা থাকবে না তার মধ্যে ঈমানও থাকবে না পূর্ণাঙ্গ। নবীজি (সা.) বলেন, লজ্জা এবং ঈমান একটি অন্যটির পাশাপাশি বসবাস। যখন একটি ওঠে যায় তখন অন্যটিও উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। (মিশকাত)
লজ্জা ইসলামের প্রকৃতি : রাসুলে আকরাম (সা.) বলেন, ‘প্রতিটি ধর্মের একটি বিশেষ স্বভাব আছে। আর ইসলাম ধর্মের বিশেষ স্বভাব হলো লজ্জা।’ (মুয়াত্তা মালেক, হাদিস : ৩৩৫৯)
লজ্জা মহা নিয়ামত : লজ্জা এক নিয়ামত মহা নিয়ামত। পরম সৌন্দর্য। এর দ্বারা পৃথিবীতে শান্তি, নিরাপত্তা লাভ হয়। এ জন্য একজন লজ্জাশীল চরিত্রবান মুমিন বিপুল পরিবর্তন আনতে পারেন সমাজে। শান্তি নিরাপত্তা, কল্যাণের শোভায় শোভাশিত করতে পারেন সমাজের প্রতিটা সেক্টরে। হজরত ইমরান ইবনে হুসাই (রা.) থেকে বর্ণিতÑ নবীজি (সা.) বলেন, ‘লজ্জা শুধু কল্যাণই বয়ে আনে।’ (বুখারি, হাদিস : ৬১১৭)
লজ্জার পুরস্কার : যেকোনো বান্দা লজ্জার গুণ অর্জন করবে তার জন্য ক্ষমা এবং অনেক বড় প্রতিদানের ওয়াদা করেছেন মহান আল্লাহ। সুরা আহজাবের ৩৫নং আয়াতে লজ্জাস্থানের যারা হেফাজত করে তাদেরসহ আরও কয়েকটি গুণের অধিকারীদের আলোচনা করে বলা হয়েছে ‘আল্লাহ এদের সকলের জন্য প্রস্তুত রেখেছেন ক্ষমা ও মহা প্রতিদান।’ এ মেহনত ও কামাই বিনষ্ট হয় না মহান রবের দরবারে। রূহানী ও নৈতিক উন্নতি সাধনের অতুলনীয় উপায় মাধ্যম লজ্জাস্থানের হেফাজত। যে সকল নারী পুরুষ ব্যাভিচার থেকে নিজেদেরকে বিরত রাখে। সর্বদা মহান আল্লাহর জিকিরে কাটায় আল্লাহ পাক তাদেরকে ক্ষমা করে দেন এবং বিরাট প্রতিদানও দেন। নবীজি (সা.) কুরাইশ যুবকদের লক্ষ করে বলেছেন, হে কুরাইশ যুব জনতা! তোমরা তোমাদের লজ্জাস্থান হেফাজত কর। ব্যাভিচার থেকে বেঁচে থাক। শুনে রাখ, যে লজ্জস্থানের হেফাজত করবে তার জন্য জান্নাত।’ বোঝা গেল লজ্জার বিনিময় জান্নাত। কাজ অল্প তবে পুরস্কার কিন্তু বড়। এ নিয়ামত অর্জন করার চেষ্টা করা চাই, তবে অনেক লাভবান হওয়া যাবে।
লজ্জা গুনাহের প্রতিবন্ধক : আবু মাসউদ বদরি (রা.) থেকে বর্ণিতÑ তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই মানুষ পূর্ববর্তী নবীদের বাণী থেকে এ কথা জেনেছে যে, ‘যখন তোমার লজ্জা নেই তখন তুমি যা ইচ্ছা তাই কর।’ (বুখারি, হাদিস : ৫৭৬৯)
লজ্জা মানুষের ভ‚ষণ : আনাস (রা.) থেকে বর্ণিতÑ তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কোনো কিছুতে অশ্লীলতা তাকে শুধু কলুষিত করে আর কোনো কিছুতে লজ্জা তাকে শুধু সৌন্দর্যমÐিত করে।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ১২৬৮৯)
লজ্জা প্রতিপালকের গুণ : মহানবী (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ অত্যন্ত লজ্জাশীল ও অন্তরালকারী। তিনি লজ্জা ও অন্তরালে থাকতে পছন্দ করেন।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪০১৪)
লজ্জার গুণ অর্জনে সহায়ক পর্দা : লজ্জার মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ গুণ অর্জন করতে হলে মুসলমান নারী-পুরুষ সবার পর্দার প্রতি বিশেষভাবে যতœবান হতে হবে। শুধু নামে মাত্র পর্দা নয়। পর্দার সর্ব সেক্টরে গুরুত্ব দিতে হবে। চোখের লজ্জা ঠিক রাখতে হলে বেগানা নারীর পুরুষের সরাসরি দেখা সাক্ষাৎ করা যাবে না। খারাপ জিনিস দেখা থেকে বিরত থাকতে হবে। হাত-পায়ের লজ্জা রক্ষা করতে চাইলে খারাপ কাজ করা থেকে নিজের হাত-পায়ের হেফাজত করতে হবে। অন্তরকে লজ্জাজনক বিষয় হতে বাঁচাতে খারাপ-অশ্লীল বিষয় অন্তরে স্থান দেওয়া যাবে না। এগুলোর প্রতি খুব যতœবান হতে হবে। লজ্জার গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়গুলোর প্রতি যতœবান হলে কাল কেয়ামতের দিন পুরস্কারের মুকুট পরাবেন মহান আল্লাহ।
লজ্জার কারণে ইউসুফ নবীর পুরস্কার : নবী হজরত ইউসুফ (আ.)-এর বাদশাহি মুকুট নসিব হয়েছে। কেননা তিনি সর্বদা লাজুকতার পরিচয় দিতেন। মিসর সম্রাটের বিবি জুলাইখা তাকে গুনাহের প্রতি আহŸান করলে তিনি তার আহŸানে অস্বীকৃতি জানালেন। এমনকি আল্লাহর আশ্রয় চেয়েছেন তিনি। এ জন্য আল্লাহ পাক তাকে কতো ইজ্জত-সম্মান দিয়েছেন। বানিয়েছেন মিসর অধিপতি।
লজ্জাশীল ব্যক্তির দোয়া কবুল হয় : শুধু রাজপ্রাসাদ এবং মুকুটই নয় লজ্জাশীল ব্যক্তি আল্লাহর নিকট অনেক মাকবুল হয়ে যায়। আল্লাহ তার দোয়া ফিরিয়ে দেন না। তাকে বিপদ-মুসিবতে ফেলেন না। সর্বোপরি তাকে সব রকমের সঙ্কট থেকে বাঁচিয়ে আগলে রাখেন। এ জন্য সব নারীদের পর্দার প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। মানুষজনকে চুলসহ শরীর দেখানো থেকে বাঁচতে হবে। যখন পর্দার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হবে। তখন বাসাবাড়ি থেকে আতর-সুগন্ধি মেখে বের হবে না। যুবক ছেলেরাও তার প্রতি আর্কষণ সৃষ্টি হবে না। হাদিসে এসেছে, যে নারী সুগন্ধি লাগিয়ে ঘর থেকে বের হয়। আর তার নিয়ত যদি এই হয়, সুগন্ধি পরপুরুষকে ছুঁয়ে যাক তাহলে সে নারী ব্যাভিচার করার সমতুল্য কাজ করল। তাই যে নারী পর্দা এবং লজ্জা-শরমের প্রতি যতœবান হবে। পশ্চিমাদের অন্ধ অনুসরণে গা ভাসিয়ে দেবে না। তখন তার নিকটের কোনো পুরুষ তো দূরের কথা শয়তানও তার কাছে আসার চিন্তা করতে পারবে না।
যারা পার্থিব জীবনে লজ্জা-শরমের প্রতি গুরুত্ব দেবে এবং সব রকমের কুপ্রবৃত্তি থেকে বেঁচে থাকবে আল্লাহ পাক তাদেরকে দুনিয়া আখেরাতে অগণিত নেয়ামতে ভ‚ষিত করবেন। দুনিয়াতে দেবেন ইজ্জত সম্মান আর আখেরাতে করবেন ক্ষমা। আল্লাহ তায়ালা সবাইকে লজ্জার গুণ অর্জন করার এবং বেপর্দা থেকে বেঁচে থাকার তওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুল উলূম
বাগে জান্নাত, চাষাঢ়া, নারায়ণগঞ্জ