প্রকাশ: সোমবার, ২৯ জুন, ২০২০, ১২:০০ এএম (ভিজিট : ৫৬০৭)
ইসলাম পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। আল্লাহর বান্দাদের মাঝে মহব্বত ও বন্ধন দৃঢ় করার নির্দেশনা প্রদান করে ইসলাম। সমস্ত ইসলামী শিক্ষা এবং খোদায়ি বিধানের প্রকাশ নবী আকরামের (সা.) সুন্নত। নবীর সব সুন্নতেই রয়েছে সৌন্দর্য আর উপকারিতা। সৌন্দর্যময় সুন্নতের একটি হচ্ছে হাদিয়া-উপহার দেওয়া।
হাদিয়া দেওয়ার ফজিলত সম্পর্কে পবিত্র কোরআনুল কারিমে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যারা তাদের সম্পদ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ব্যয় করে, অতঃপর খোঁটা বা তুলনা দিয়ে এবং কষ্ট দিয়ে তার অনুগমন করে না। তাদের জন্য রবের কাছে রয়েছে তাদের বিনিময়, তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৬২)। হাদিয়া গ্রহণ করতে কোনো অসুবিধা নেই। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তারা যদি খুশি হয়ে তোমাদেরকে দিয়ে দেয়, তাহলে তোমরা তা স্বাচ্ছন্দ্যে ভোগ করো।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ৪)। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য (কাউকে কিছু) দেয়, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই দেওয়া থেকে বিরত থাকে; আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই যে ভালোবাসে আর আল্লাহর জন্যই যে ঘৃণা করে, সে তার ঈমান পূর্ণ করল।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৫২১)
হাদিয়ার মাধ্যমে মহব্বত বৃদ্ধি পায়
হাদিয়া-উপহার আদান-প্রদানের মাধ্যমে পারস্পরিক মহব্বত তৈরি হয়। সুন্দর একটি বন্ধন তৈরি হয়। নবীজি (সা.) অধিকাংশ সাহাবীকে হাদিয়া-উপহার দিতেন। সাহাবায়ে কেরামও নবীজিকে (সা.) উপহার দিতেন। তারা নিজেরাও পারস্পরিক উপহার আদান-প্রদান করতেন। পারস্পরিক বন্ধন মজবুত করার জন্য উপহার আদান-প্রদান খুবই উত্তম কার্যকর পন্থা। অনেক সময় উপহার আদান-প্রদানের কারণে প্রিয়জন ও আত্মীয়স্বজনদের অসন্তুষ্টি কষ্ট খতম হয়ে যায়। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত হাদিসে নবীজি (সা.) বলেন, ‘পরস্পর হাদিয়া দাও, মহব্বত বৃদ্ধি পাবে।’ (আল আদাবুল মুফরাদ, হাদিস : ৫৯৪)। রাসুল (সা.) আরও ইরশাদ করেছেন, ‘হাদিয়া দেওয়ার মাধ্যমে মহব্বত তৈরি হয় এবং ভ্রাতৃত্ব বজায় থাকে।’ (বিহারুল আনওয়ার : ৭৪/১৬৬)। হাদিসটিতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানা গেল। একটি হচ্ছে হাদিয়া প্রদানের মাধ্যমে পারস্পরিক মহব্বত তৈরি হয়। আর অপরটি হচ্ছে বন্ধুত্ব মজবুত ও দৃঢ় হয়।
অন্তরের হিংসা দূর করে হাদিয়া
বর্তমান সমাজে বড় একটি ব্যাধি পারস্পরিক হিংসা। কখনও কখনও এই হিংসা বড় ধরনের শত্রæতার সৃষ্টি করে। হিংসা দূর করার কার্যকর চিকিৎসা হচ্ছে পারস্পরিক হাদিয়া আদান-প্রদান। এ মর্মে রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমরা পরস্পরে হাদিয়া বিনিময় করো, এর দ্বারা অন্তরের সঙ্কীর্ণতা ও হিংসা দূর হয়ে যায়।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ৯২৫০)
হাদিয়া অল্প হলেও তুচ্ছ জ্ঞান না করা
উপহারের মূল্যের চেয়ে উপহার প্রদানকারীর অন্তর এবং নিয়তের একনিষ্ঠতাই মুখ্য বিষয়। হাদিস শরিফে এসেছে, নবীজি (সা.) বলেন, ‘হে মুসলিম রমণীগণ! তোমাদের প্রতিবেশীর জন্য সামান্য উপহার বা হাদিয়াও তুচ্ছ জ্ঞান করো না। যদিও তা বকরির পায়ের খুর হয়।’ (বোখারি, হাদিস : ২৪২৭)। আরেকটি হাদিসে নবীজি (সা.) স্পষ্টই বলেছেন, ‘আমাকে যদি (বকরির পায়ের) মাংসবিহীন চিকন হাড় খেতেও দাওয়াত করা হয়; তবু আমি সে দাওয়াত রক্ষা করব।’ (সহিহ বোখারি, হাদিস : ৫১৭৮)। নবীজির এ কথার দ্বারা বোঝা গেল ছোট থেকে ছোট কোনো বস্তুও কেউ আন্তরিকতা নিয়ে উপহার করলে তা খুশিমনে গ্রহণ করা উচিত। বিনিময়ে উপহার প্রদানকারীকেও একটা কিছু উপহার দেওয়ার চেষ্টা করা। যেহেতু সে মহব্বত করেই উপহার নিয়ে এসেছে। মহব্বতের বদলা তো মহব্বতের মাধ্যমেই দিতে হয়। নবীজি (সা.) এ বিষয়টি খুব খেয়াল রাখতেন।
হাদিয়ার দোষ না খোঁজা
নবীজির (সা.) খেদমতে কেউ ফল হাদিয়া নিয়ে আসলে তিনি নিজেও খেতেন। উপস্থিত সাহাবিদেরকেও দিতেন। একবার এক সাহাবি নবীজির খেদমতে ফল নিয়ে আসল। নবীজি (সা.) খেয়ে দেখলেন ফলটি বেশ তিতা। তাই নবীজি (সা.) সব সময়ের মতো সাহাবিদেরকে আর দিলেন না। সাহাবিরা পেরেশান হয়ে গেল। এমন তো হওয়ার কথা নয়, নবীজির কাছে হাদিয়া আসবে, আর আমাদেরকে দেবে না! হাদিয়াদাতা সাহাবি চলে যাওয়ার পর এক সাহাবির জিজ্ঞাসার জবাবে নবীজি (সা.) তাদের আত্মশুদ্ধির জন্য বললেন, হাদিয়ার ফলটি বেশ তিতা ছিল। আমি চাইনি, তোমাদেরকে ফলটি দেওয়ার মাধ্যমে হাদিয়াদাতা লজ্জায় পড়–ক। সুবহানাল্লাহ! নবীজির কর্মপন্থাটি কেমন শিক্ষণীয় ছিল! এটাই মুসলিম সমাজকে নবীজি শিখিয়ে গেছেন।
হাদিয়ার জন্য আকাক্সিক্ষত না থাকা
মনে মনে আকাক্সিক্ষত থাকার পর যে হাদিয়া আসে এটাকে বলে ইশরাফে নফস। এটা নিষেধ। যেমন মনে মনে আশায় থাকা যে, অমুক আত্মীয় সাধারণত আমার জন্য হাদিয়া নিয়ে আসে। অমুক তারিখে উনি হজ থেকে আসছেন। আমার জন্য অবশ্যই হাদিয়া নিয়ে আসবেন। তো যে হাদিয়ায় এ ধরনের নিয়ত থাকবে সে হাদিয়া গ্রহণ করা ঠিক না। এতে বরকত থাকে না।’ (বোখারি, হাদিস : ১৪৭২)
ঋণের বিনিময়ে হাদিয়া গ্রহণ না করা
হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যখন কাউকে ঋণ (কর্জ) দেয়, আর গ্রহীতা যদি তাকে কোনো তোহফা দেয় কিংবা যানবাহনে আরোহণ করতে বলে, তখন সে যেন তার তোহফা কবুল না করে এবং তার সওয়ারিতেও আরোহণ না করে। অবশ্য আগে থেকে যদি উভয়ের মধ্যে এরূপ লেনদেনের ধারা চলে আসে, তবে তা ভিন্ন কথা।’ (ইবনে মাজাহ)
নবীজির (সা.) সব সুন্নতের পেছনে কোনো না কোনো উপকারিতা এবং সৌন্দর্য আছেই। এতে কোনোরকম সন্দেহ নেই। যে সুন্নতগুলোর প্রতি গুরুত্ব দিলে পারস্পরিক বন্ধন দৃঢ় হবে। আল্লাহপাক আমাদেরকে নবীজির সুন্নত অনুযায়ী চলার তাওফিক দান
করুন। আমিন।
লেখক : মুহাদ্দিস জামিয়া আরাবিয়া দারুল উলুম বাগে জান্নাত, চাষাঢ়া, নারায়ণগঞ্জ