ইসলামে জীবন ও জীবিকার ধারণা

মুফতি নূর মুহাম্মদ রাহমানী

ইসলামের আলো

ইসলাম সবসময় জীবনমুখী দর্শন লালন করে। জীবনমুখিতার অন্যতম প্রধান দিক হলো কাজের মাধ্যমে অর্থ সংস্থান করা, যার মাধ্যমে মানবজীবনের মৌলিক

2020-08-12T00:00:00+00:00
2020-08-12T00:00:00+00:00
 
  সোমবার, ৮ জুন ২০২৬,
২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
সোমবার, ৮ জুন ২০২৬
ইসলামের আলো
ইসলামে জীবন ও জীবিকার ধারণা
মুফতি নূর মুহাম্মদ রাহমানী
প্রকাশ: বুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২০, ১২:০০ এএম   (ভিজিট : ৯৫২)
ইসলাম সবসময় জীবনমুখী দর্শন লালন করে। জীবনমুখিতার অন্যতম প্রধান দিক হলো কাজের মাধ্যমে অর্থ সংস্থান করা, যার মাধ্যমে মানবজীবনের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করা যায়। তাই শ্রম আমাদের জীবনে এক অপরিহার্য বিষয়। ইসলামে শ্রমের গুরুত্ব খুবই বেশি। শ্রম দিলে সাহায্যের জন্য মানুষের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরতে হয় না। অনর্থক, অনৈতিক কাজ থেকেও বেঁঁচে থাকা সহজ হয়। অলস মস্তিষ্ককে শয়তান বেশি ধোঁকা দিতে পারে। শ্রমের ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে নির্দেশ দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘অতঃপর যখন নামাজ শেষ হবে তখন তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড় আর আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান কর, যাতে তোমরা সফল হতে পার।’ (সুরা জুমা : ১০)। এখানে অনুগ্রহ অনুসন্ধান করার দ্বারা অর্থনৈতিক কাজ-কর্মে লিপ্ত হতে নির্দেশ করা হয়েছে। তবে কাজকর্ম করতে গিয়ে আল্লাহকে ভুলে যাওয়া যাবে না।
অন্যদিকে অলসতার বিরোধিতা করেছে ইসলাম। পরনির্ভরতাকে চরম অপছন্দনীয় কাজ বলে ঘোষণা করেছে। স্বনির্ভরতা খুব ভালো উত্তম গুণ। নবী-রাসুলগণ সবাই শ্রমনির্ভর ছিলেন। নিজ হাতে উপার্জন করে খেতেন। কোরআন ও হাদিসে শ্রমের প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে। মহানবী (সা.) বলেন, ‘লা রাহবানিয়্যাতা ফিল ইসলাম’ ইসলামে কোনো বৈরাগ্যতা নেই। বৈরাগ্যতা মানুষকে মূলত কর্ম ও সমাজবিমুখ করে দেয়।
উপার্জন ও ব্যয় : সম্পদ উপার্জন, পরিশ্রম, জাকাত, দান-খয়রাত ইত্যাদি প্রত্যেকটিই অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। ইহকাল ও পরকালে মান-সম্মান লাভের মাধ্যম। দানের জন্য অর্থকড়ি লাগবে; তাই উপার্জন করতে হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা যা উপার্জন কর এবং আমি যা ভূমি হতে তোমাদের জন্য উৎপাদন করে দেই তন্মধ্যে যা উৎকৃষ্ট তা ব্যয় কর।’ (সুরা বাকারা : ২৬৭)। এ আয়াতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, উপার্জিত সম্পদ থেকে যেন দান-খয়রাত করা হয়, আর উপার্জনটা হারাম না হালাল সেটাও যেন পরখ করে দেখা হয়।
পেশা নির্বাচন : মদিনা মোনাওয়ারায় হিজরতের পর নবীজি (সা.) মদিনার ভূমিগুলো চাষাবাদ করার জন্য সাহাবিদের প্রতি খুব তাকিদ দিলেন। তবে তিনি মুসলমানদের শুধু নির্দিষ্ট কোনো পেশায় না থাকার নির্দেশনা দিয়েছেন। কর্মসংস্থানের পরিধি ব্যপ্ত করতে বলেছেন। যেমন নবী-রাসুলদের ভিন্ন ভিন্ন পেশা ছিল। হজরত ইউসুফ (আ.) মিসর সম্রাটের বাড়িতে সেবকের কাজ করেছেন। হজরত শুয়াইব (আ.) ও হজরত সালেহ (আ.) ব্যবসা করেছেন। আর দাউদ (আ.)-এর কর্মকার হওয়ার বিষয়টি তো খুবই প্রসিদ্ধ। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর আমি তাকে (দাউদ) তোমাদের জন্য বর্ম নির্মাণ শিক্ষা দিয়েছিলাম, যাতে এটা তোমাদের যুদ্ধে তোমাদেরকে রক্ষা করে।’ (সুরা আম্বিয়া : ৮০)। আমাদের নবী (সা.) তো অনেক পেশার কাজ করেছেন। যৌবনে তিনি খাদিজা (রা.)-এর কৃতদাস মায়সারার সঙ্গে ব্যবসা করেছেন। পবিত্র কাবা শরিফ নির্মাণের কাজে অংশগ্রহণ করেছেন। নিজে পাথর বহন করেছেন। টাকার বিনিময়ে মক্কার লোকদের বকরি ও মেষ চড়িয়েছেন।
নিজ হাতের উপার্জন : নবীজি (সা.) বলেন, ‘উত্তম উপার্জন হলো নেক ব্যবসা এবং স্বহস্তে উপার্জন।’ (বুখারি : ২০৭২)। হাদিসটিতে দুটি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, একটি হচ্ছে উত্তম উপার্জন হলো যা মানুষ নিজে উপার্জন করে এবং নিজ হাতে উপার্জন করে। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, কাজে-কর্মে ধোঁকা-প্রতারণা এবং আত্মসাতের আশ্রয় যেন না নেওয়া হয়।
নবীদের সুন্নত : পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম মানুষ নবী ও রাসুলরা। তারাও কোনো না কোনো পেশা অবলম্বন করেছেন, শ্রম দিয়েছেন। আদিপিতা আদম (আ.)
কৃষক ছিলেন। হজরত নূহ (আ.) কাঠমিস্ত্রি ছিলেন। হজরত দাউদ (আ.) কর্মকার ছিলেন। হজরত ইদ্রিস (আ.) দর্জি ছিলেন। হজরত ইবরাহিম (আ.) রাজমিস্ত্রি ছিলেন। হজরত ইসমাঈল (আ.) রাজমিস্ত্রির জোগালি ছিলেন। আমাদের প্রিয় নবী (সা.) ছাগল চরিয়েছেন। হজরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিতÑ তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কারও পক্ষে এক বোঝা জ্বালানি সংগ্রহ করে পিঠে বহন করে নিয়ে আসা কারও কাছে সুওয়াল করার চেয়ে উত্তম। কেননা অনেক সময় সুওয়াল করলে সে দিতেও পারে, আবার নাও দিতে পারে।’ (বুখারি : ২০৭৪)। হাদিসটির নির্দেশনা হলো, কাজ-কর্ম ও শ্রম মানুষকে অন্যের কাছে হাত পাতা থেকে রক্ষা করে। নিজেকে অপদস্থ থেকে বাঁচিয়ে রাখে। বৈধ কাজ বা পেশা যে ধরনের হোক না কেন সেটি অবশ্যই নবীদের সুন্নত।
সাহাবিদের কর্মপন্থা : সাহাবায়ে কেরামও নবীজি (সা.)-এর পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন। হজরত আবু বকর (রা.) ব্যবসা করেছেন। পরবর্তীতে রাষ্ট্র সংক্রান্ত কাজের জন্য বাধ্য হয়ে ব্যবসা ছেড়েছেন। হজরত ওমর (রা.)ও ব্যবসা করেছেন। তিনি মুসলমানদেরকে হালাল রিজিক অনুসন্ধানের জন্য কাজ করতে খুব উৎসাহ দিতেন। হজরত ওসমান (রা.) তিনি জাহেলিয়াত ও ইসলাম উভয় সময়কালে কাপড়ের ব্যবসা করেছেন। আলী (রা.) তো বিনিময় হিসেবে কিছু খেজুর পাওয়ার জন্য কূপ থেকে পানি ওঠানোর কাজ করতেন। খাব্বাব (রা.) কর্মকার ছিলেন; এটা অনেকেই জানেন। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) মেষ-বকরি চরাতেন। সাহাবায়ে কেরাম মূলত বিভিন্ন পেশার ছিলেন। আনসাররা সাধারণত কৃষিকাজ করতেন। আর মুহাজিররা সাধারণত ব্যবসা-বাণিজ্য করতেন। নবীজি (সা.) সব কাজই সমানভাবে উৎসাহিত করতেন।
উত্তম খাদ্য : হজরত মিকদাদ (রা.) থেকে বর্ণিতÑ রাসুল (সা.) বলেন, ‘এর চেয়ে উত্তম খাদ্য আর নেই, যা মানুষ স্বহস্তে উপার্জনের মাধ্যমে করে। নবী দাউদ (আ.) নিজ হাতে উপার্জন করে জীবিকা নির্বাহ করতেন।’ (বুখারি : ২০৭২)। যেকোনো পেশা অবলম্বন করা হোক, তা যেন হালাল পন্থায় হয় সেদিকে সর্বোচ্চ দৃষ্টি দিতে হবে। কাজে ও চাকরিতে সততা ও স্বচ্ছতার পরিচয় দিতে হবে। হালাল খাবার মহান আল্লাহর ভালোবাসা এবং জান্নাত লাভের রাস্তা। দোয়া কবুলের হাতিয়ার। বয়সে বরকত হয় এবং ধনসম্পদ বৃদ্ধি পায় এতে। দুনিয়ার সৌভাগ্য এবং আখেরাতে জান্নাত লাভে সহায়ক হয়। কথায় মিষ্টতা আনে। আমল করার আগ্রহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। হালাল উপার্জনে বংশের মধ্যে বরকত হয়। পক্ষান্তরে অবৈধ এবং হারাম ধনসম্পদ বিপদ-মুসিবত ডেকে আনে। ডেকে আনে পতন। মহানবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘ওই গোশত (দেহ) জান্নাতে যাবে না, যা হারাম (খাবার) থেকে উৎপন্ন। জাহান্নামই এর উপযোগী।’ (তিরমিজি : ৬১৪)। হারাম সম্পদ কম আর বেশি নয়, এর থেকে বিরত থাকতে হবে। কেননা একমাত্র হালাল খাবার দ্বারাই সমাজজীবন ঠিক থাকে। দোয়া কবুল হয়। সব কিছুতে বরকত হয়। আল্লাহ আমাদেরকে হারাম থেকে বাঁচার এবং হালালের কদর করার তওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : সিনিয়র শিক্ষক, জামিয়া আরাবিয়া দারুল উলূম বাগে জান্নাত, নারায়ণগঞ্জ




Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: