ইসলাম নৈতিকতার ধর্ম। নৈতিকতা হলো নীতির অনুশীলন। অর্থাৎ দৈনন্দিন জীবনের চালচলন, ওঠা-বসা, আচার-ব্যবহার, লেনদেন সব কিছুই যখন প্রশংসনীয় ও গ্রহণযোগ্য হয় তখন তাকে নৈতিকতা বলা হয়। কথা ও কাজে উত্তম রীতি-নীতি, সততা, সৌজন্যমূলক আচরণ, সুন্দর স্বভাব, উন্নত ও উত্তম চরিত্র নৈতিক জীবনের মূল অনুষঙ্গ। নৈতিকতা মানবজীবনের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ, যা অর্জন করলে জীবন সুন্দর হয়। অন্যথায় মিথ্যা, প্রতারণা, ধোঁকা, পরচর্চা, অশ্লীল ও অশালীন কাজসমূহ মানুষকে পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট করে তোলে।
উন্নত ও নৈতিক জীবন গঠনে আখেরাতে বিশ^াসের গুরুত্ব অত্যন্ত ব্যাপক। দুনিয়া হলো মৃত্যু পরবর্তী অনন্তকালের জীবনের প্রস্তুতি গ্রহণের ক্ষেত্র। দুনিয়ার জীবনে মানুষ যেভাবে নিজের পরিচর্যা করবে, পরকালীন জীবনে সেরূপ ফল লাভ করবে। এ জন্য বলা হয়ে থাকেÑ ‘দুনিয়া আখেরাতের শস্যক্ষেত্র।’ (প্রবাদ)। অর্থাৎ ইহকালীন জীবনে সৎকর্ম করলে আখেরাতে শান্তিময় জীবন লাভ করবে আর মন্দ কাজ করলে শাস্তি ভোগ করবে। আখেরাত তথা পরকালীন জীবনের অনেকগুলো স্তর রয়েছে। মৃত্যু, কবর, কিয়ামত, হাশর, মিযান, সিরাত, শাফায়াত, জান্নাত ও জাহান্নামÑ এ সবই অনন্ত জীবনের একেকটি পর্যায়। মানুষের কর্মভেদে প্রতিটি পর্যায়ে রয়েছে শান্তি এবং শাস্তির চিরন্তন ব্যবস্থা। সুমহান এ ব্যবস্থাপনা মানুষকে দুনিয়ার জীবন পরিচালনায় নীতি ও আদর্শের অনুসরণ করতে বাধ্য করে।
আখেরাত জীবনের শুরু হয় মৃত্যুর মাধ্যমে। ছোট-বড়, ধনী-দরিদ্র, শাসক-শাসিত, জালিম-মজলুম, পাপী-নিষ্পাপী সবারই মৃত্যু অনিবার্য। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।’ (সুরা আলে ইমরান : ১৮৫)। দুনিয়ার কোনো প্রাণী মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পাবে না। যতই সুরক্ষিত স্থানে বসবাস করুক নির্দিষ্ট সময়ে মৃত্যু হবেই। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা যেখানেই থাক না কেন মৃত্যু তোমাদের নাগাল পাবেই, এমনকি সুউচ্চ সুদৃঢ় দুর্গে অবস্থান করলেও।’ (সুরা
নিসা : ৭৮)। পুণ্যবান মানুষের মৃত্যু হয় মহান আল্লাহর রহমতের সঙ্গে। আর পাপীদের মৃত্যু হয় অনেক কষ্টকর।
মৃত্যুর পর থেকে পুনরুত্থান পর্যন্ত কবরের জীবন। এর অন্য নাম আলমে বারযাখ। মানুষকে দাফন করার পর মুনকার-নাকির ফেরেশতা তিনটি প্রশ্ন করেন। সৎকর্মশীলগণ সঠিক উত্তর প্রদান করে শান্তিময় কবর জীবন লাভ করেন। পক্ষান্তরে যারা সঠিক উত্তর দিতে ব্যর্থ হয় তারা শাস্তির মুখে পতিত হয়।
আখেরাত জীবনের অন্যতম একটি পর্যায় হলো কিয়ামত। অর্থ মহাপ্রলয় বা সংঘটিত হওয়া। মানুষ যখন নাফরমানি এবং গোমরাহিতে লিপ্ত হবে, আল্লাহ বলার মতো কোনো মানুষ পৃথিবীতে অবশিষ্ট থাকবে না, তখন আল্লাহ তায়ালার নির্দেশে ইসরাফিল (আ.) শিঙ্গায় ফুৎকার দিলে গোটা বিশ^ ধ্বংস হয়ে যাবে। এই ধ্বংসের বহু বছর পর ইসরাফিল (আ.) আবার শিঙ্গায় ফুৎকার দিলে আল্লাহ তায়ালা পুনরায় সবাইকে জীবিত করবেন এবং সবাই হাশরের মাঠে সমবেত হবে। কিয়ামতের এ অবস্থা সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর শিঙ্গায় ফুৎকার দেওয়া হবে। ফলে আল্লাহ যাদের ইচ্ছা করেন তারা ব্যতীত আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সকলেই মূর্ছিত হয়ে পড়বে।
অতপর আবার শিঙ্গায় ফুৎকার দেওয়া হবে, তখনই তারা দণ্ডায়মান হয়ে তাকাতে
থাকবে।’ (সুরা যুমার : ৬৮)
তারপর হাশরের ময়দান কায়েম হবে। হাশর হলো হিসাব-নিকাশের দিন। এদিন আল্লাহই একমাত্র বিচারক। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তিনি বিচার দিবসের মালিক।’ (সুরা ফাতিহা : ৩)। সেদিন সকল মানুষের কাজকর্মের হিসাব নেওয়া হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘কেউ অণু পরিমাণ সৎকর্ম করলেও সে তা দেখতে পাবে। আর কেউ অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করলে তাও সে দেখতে পাবে।’ (সুরা যিলযাল : ৭-৮)। সেদিন সূর্য একেবারে মানুষের মাথার নিকটে থাকবে এবং আল্লাহর আরশের ছায়া ব্যতীত কোনো ছায়া থাকবে না। প্রচণ্ড তাপে মানুষ ঘামতে থাকবে, সেখানে পানীয় জলের কোনো ব্যবস্থা থাকবে না। পাপীরা নিদারুণ কষ্ট ভোগ করবে। পক্ষান্তরে পুণ্যবানগণ নানাবিধ সুবিধা লাভে ধন্য হবেন।
হাশরের ময়দানে মানুষের আমলসমূহ ওজন করার জন্য পাল্লা স্থাপন করা হবে। যেটাকে মিযান বলা হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর আমি কিয়ামতের দিন ন্যায়বিচারের মানদণ্ড স্থাপন করব।’ (সুরা আম্বিয়া : ৪৭)। যার পুণ্যের পাল্লা ভারি হবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যার পাপের পাল্লা ভারী হবে সে হবে জাহান্নামি।
আখেরাতে সকল মানুষকে সিরাত অতিক্রম করতে হবে। জাহান্নামের উপর স্থাপিত অন্ধকার পথ। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘এবং তোমাদের প্রত্যেকেই তা অতিক্রম করবে, এটা তোমার প্রতিপালকের অনিবার্য সিদ্ধান্ত।’ (সুরা মারইয়াম : ৭১)। নেককারদের জন্য তাদের আমল অনুসারে সিরাত প্রশস্ত হবে। নেক আমলকারীগণ নিজ নিজ আমল অনুযায়ী সিরাত অতিক্রম করে জান্নাতে প্রবেশ করবেন এবং পাপীরা জাহান্নামে পতিত হবে।
আখেরাতের চূড়ান্ত দুটি স্তর হলো জান্নাত ও জাহান্নাম। আল্লাহর প্রতি বিশ^াস ও সৎকর্ম ব্যতীত জান্নাত লাভ সম্ভব নয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত যার তলদেশে ঝরনাধারা প্রবাহিত। এটাই মহাসাফল্য।’ (সুরা বুরুজ : ১১)। বস্তুত জান্নাতের সুখ-শান্তি অফুরন্ত। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমি আমার নেক বান্দাদের জন্য (জান্নাতে) এমন সব নিয়ামত প্রস্তুত করে রেখেছি যা কোনো চোখ দেখেনি, কোনো কান কোনোদিন তা শুনেনি এবং কোনো মানব মন কখনও কল্পনাও করতে পারেনি।’ (বুখারি)। আর যারা পাপ ও অন্যায় কাজ করে তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের শাস্তি।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘অনন্তর যে সীমালঙ্ঘন করে এবং পার্থিব জীবনকে অগ্রাধিকার দেয় জাহান্নামই হবে তার আবাস।’ (সুরা নাযিআত : ৩৭-৩৯)। সুতরাং বলা যায় যে, আখিরাতের প্রত্যেকটি পর্যায়ে আল্লাহর নিয়ামত প্রাপ্তির আশা দুনিয়ার জীবনে সৎকর্ম করতে উৎসাহ জোগায়। শাস্তির ভয় ও শান্তি লাভের প্রত্যাশা মানুষকে ছোট-বড়, প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সব ধরনের অন্যায় থেকে বিরত রাখে এবং পাপমুক্ত ও নৈতিক জীবনযাপনে উদ্বুদ্ধ করে।
লেখক : শিক্ষক, ইসলাম, কেসি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, উত্তরা, ঢাকা