মন্দ বিষয় গোপন রাখা মুমিনের গুণ

মোহাম্মদ নিজামুল ইসলাম নিজাম

ইসলামের আলো

সামাজিকতা, চক্ষুলজ্জা ও অপমানের ভয় অনেক সময় মানুষকে অনেক খারাপ কাজ করা থেকে বিরত রাখে। হতে পারে এই ভয়টাই এক

2020-10-02T22:45:00+00:00
2020-10-02T22:45:00+00:00
 
  বুধবার, ১০ জুন ২০২৬,
২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
ইসলামের আলো
মন্দ বিষয় গোপন রাখা মুমিনের গুণ
মোহাম্মদ নিজামুল ইসলাম নিজাম
প্রকাশ: শুক্রবার, ২ অক্টোবর, ২০২০, ১০:৪৫ পিএম   (ভিজিট : ১৩৫৩)
সামাজিকতা, চক্ষুলজ্জা ও অপমানের ভয় অনেক সময় মানুষকে অনেক খারাপ কাজ করা থেকে বিরত রাখে। হতে পারে এই ভয়টাই এক দিন তাকে আল্লাহ‌র দিকে নিয়ে যাবে, যখন সে তার ভুল বুঝতে পারবে এবং তার কৃত অপরাধের জন্য আল্লাহ‌র কাছে ক্ষমা চাইবে। কিন্তু যখন তার অপরাধ জনসমক্ষে প্রকাশ করে দেওয়া হয় তখন সেই ভয় বা চক্ষুলজ্জা আর তার মাঝে কাজ করে না। সে তখন ভাবতে থাকে, কী হবে আর ভালো থেকে, ক্ষতি যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে, লোকজন তো জেনেই গেছে ইতোমধ্যে, তখন সে প্রকাশ্যে পাপ কাজে লিপ্ত হতে থাকে। তা ছাড়া বারবার পাপের কথা বলতে থাকলে মানুষের অন্তর থেকে পাপের ভয় দূর হয়ে যায়। তখন পাপকে আর পাপ বলে মনেই হয় না। যে পাপের কথা বলে বেড়াতে লজ্জাবোধ করে না, একই পাপে লিপ্ত হওয়া তার জন্য অসম্ভব কিছু নয়। আর এভাবেই সমাজে পাপ ছড়িয়ে পড়তে থাকে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘আল্লাহ কোনো মন্দ বিষয় প্রকাশ করা পছন্দ করেন না। তবে কারও প্রতি জুলুম হয়ে থাকলে সে কথা আলাদা। আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্ব বিষয়ে জ্ঞাত।’ (সুরা নিসা : ১৪৮)
কেউই চায় না যে, তার গোপনীয় বিষয়গুলো অন্য কেউ খুঁজে বের করে মানুষের কাছে তা প্রকাশ করুক। বরং সবাই চায় যে, তার গোপনীয় বিষয়গুলো যেন প্রকাশ না পায়। তাই অন্যের দোষত্রæটি খুঁজে বেড়ানো মানুষের কাছে একটি নিন্দনীয় স্বভাব। শুধু তাই নয়, এমন স্বভাব মহান আল্লাহর নিকটও অপছন্দনীয়। এ জন্য পরের দোষ খুঁজে বেড়ানো ইসলামে সম্পূর্ণরূপে নিষেধ করা হয়েছে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা একে অন্যের গোপনীয় বিষয় সন্ধান কর না।’ (সুরা হুজরাত : ১২)
আলোচ্য আয়াতের ওপর নির্ভর করে আমরা যদি সোনালি যুগের সোনালি মানুষ সাহাবিদের দিকে তাকাই, তাহলে আমরা এ ব্যাপারে তাদের জীবনের বাস্তব আমল সম্পর্কে জানতে পারব। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর (রা.) এক দিন কোনো কাজে এক রাতে বাইরে বের হলেন। তার সঙ্গে ইবনে মাসউদ (রা.) ছিলেন। এক জায়গায় তারা আগুনের আলো দেখতে পেলেন। বিষয়টা তদন্ত করতে উভয়ই সেদিকে চলতে লাগলেন। একসময় তারা আগুনের উৎস স্থান খুঁজে পেয়ে এক ঘরের সামনে উপনীত হলেন। ইবনে মাসউদকে (রা.) বাইরে রেখে ওমর (রা.) ভেতরে প্রবেশ করলেন। তখন গভীর রাত। ভেতরে গিয়ে দেখলেন, ঘরে প্রদীপ জ্বলছে। সেখানে এক বৃদ্ধ বসে আছে। তার সামনে পান করার মতো কিছু একটা রাখা আছে। আর এক দাসী তাকে গান শোনাচ্ছে। বৃদ্ধ লোকটি তাদের প্রবেশের বিষয়টি টের পায়নি। যখন টের পেল ততক্ষণে ওমর (রা.) তার একেবারে কাছে পৌঁছে গেছেন। ওমর (রা.) বললেন, ‘আজ রাতের মতো এমন খারাপ দৃশ্য আমি আর কখনও দেখিনি। একজন বৃদ্ধ মানুষ; যে বলতে গেলে মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, সে এমন মন্দ কাজে লিপ্ত!’ বৃদ্ধ লোকটি মাথা তুলে বলল, ‘আপনি যা বলেছেন, সেটা সঠিক। কিন্তু আপনি নিজে যা করেছেন তা এর চেয়েও জঘন্য। আপনি অন্যের ঘরে ঢুকে দোষ সন্ধান করেছেন। অথচ আল্লাহ তায়ালা এ ধরনের দোষ খুঁজে বেড়াতে নিষেধ করেছেন। তা ছাড়া আপনি অনুমতি ছাড়াই ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়েছেন।’ ওমর (রা.) নিজের ভুল বুঝতে পারলেন এবং চোখ থেকে অনুতাপের অশ্রæ ঝরল। ওমর (রা.) সেখান থেকে চলে গেলেন। দীর্ঘদিন পরে দেখা গেল ওই বৃদ্ধ লোকটি ওমর (রা.)-এর দরবারে এসে মজলিসের শেষ প্রান্তে কিছুটা আড়াল হয়ে বসে পড়ল। হযরত ওমর (রা.) তাকে দেখে ফেললেন এবং বললেন, ‘বৃদ্ধ লোকটিকে আমার কাছে নিয়ে এসো। এদিকে বৃদ্ধ লোকটি ধরে নিল যে, সেদিন ওমর (রা.) নিজের চোখে যা দেখেছেন, তার জন্য আজ শাস্তি অবধারিত। বৃদ্ধ লোকটিকে তার কাছে নিয়ে আসা হলে ওমর (রা.) তার একেবারে বাহু সংলগ্ন করে তার কানের কাছে মুখ নিয়ে বললেন, ‘ভালো করে শুনে রাখ, আল্লাহর শপথ করে বলছি, সে রাতে আমি তোমাকে যা করতে দেখেছি তা অদ্যাবধি কাউকে বলিনি। তোমার দোষ গোপন করে রেখেছি। এমনকি ইবনে মাসউদ আমার সঙ্গে ছিল, তাকেও না।’ বৃদ্ধ লোকটি ওমর (রা.)-এর কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, সেই সত্তার শপথ, যিনি মুহাম্মদকে (সা.) সত্যসহ রাসুল করে পাঠিয়েছেন, আমিও সেই কাজ আর কখনও করিনি। তখন ওমর (রা.) জোর আওয়াজে আল্লাহু আকবার বলে উঠলেন। কিন্তু আশপাশের কারও জানা ছিল না যে কেন হঠাৎ তিনি তাকবির ধ্বনি দিলেন। (হায়াতুস সাহাবা : ২/৫৩৮৮)
উপরোক্ত ঘটনায় আমাদের জন্য দুটি শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে।
এক. অন্যের দোষত্রæটি খুঁজে বেড়ানো যাবে না। যদিও সে শাসক হয়। আর অনিচ্ছা সত্তে¡ও যদি অন্যের দোষ চোখে পড়ে, তাহলে সেটা গোপন করে রাখতে হবে।
দুই. অন্যের ঘরে প্রবেশ করার আগে অবশ্যই তার অনুমতি গ্রহণ করতে হবে। আমরা যদি নিজেরাই নিজেদের আমল সম্পর্কে একটু চিন্তা-ভাবনা করি, তাহলে দেখা যাবে আমরা প্রত্যেকেই রাতের আঁধারে অথবা একা নিরালায় শয়তানের খপ্পরে পড়ে কমবেশি অনেক বড় বড় অপরাধ করে ফেলেছি, যে অপরাধের কথা একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কেউই জানে না। তাই তো বলা হয়, পিতা-মাতার গোপনীয় অপরাধের কথা যদি সন্তান জানত, তাহলে কোনো সন্তানই পিতা-মাতাকে ঘৃণায় সম্মান করত না। আবার সন্তানের গোপনীয় অপরাধের কথা যদি কোনো পিতা-মাতা জানত, তাহলে পিতা-মাতা কখনও তাকে সন্তান বলে পরিচয় দিত না। সুতরাং কেউ যদি চায় যে, তার দোষগুলো যেন আল্লাহ তায়ালা গোপন করে রাখে, তাহলে সে যেন অন্য মুসলমান ভাইয়ের দোষগুলো গোপন করে রাখে। এই সম্পর্কে রাসুল (সা.) স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের দোষ গোপন করে রাখবে, মহান আল্লাহ তায়ালা দুনিয়া ও পরকালে তার দোষ গোপন করে রাখবেন।’ (মুসলিম : ৬৪৭২)
বান্দার যেসব দোষত্রæটি আল্লাহ তায়ালা গোপন করে রেখেছেন, সেসব দোষত্রæটি অন্যের নিকট প্রকাশ করে দেওয়া আল্লাহ অপছন্দ করেন। যারা অন্যের দোষ খুঁজে বের করে মানুষের নিকট প্রকাশ করে দেয়, তাদের দোষ আল্লাহ তায়ালা প্রকাশ করে দেন। এ সম্পর্কে হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি অন্যের দোষ খুঁজে ফেরে, আল্লাহ তায়ালা তার দোষ উন্মোচন করে দেন। আর শুনে রাখ, আল্লাহ তায়ালা কারও দোষ উন্মোচন করলে, সে যেখানেই থাকুক তার নিস্তার নেই, অবশ্যই সে লাঞ্ছিত হবে।’ (আবু দাউদ : ৪৮৮০)। এ সম্পর্কে ইমাম নববী (রহ.) লিখেছেন, ‘একমাত্র দুর্বল ঈমানদার ও মুনাফেকরাই মানুষের দোষ খুঁজে বেড়ায় এবং অন্যের নিকট প্রকাশ করে দেয়।’ তাই নিজের দোষ গোপন করতে আমরা কখনও অন্যের দোষ প্রকাশ করব না।
আল্লাহ তায়ালা নিজে দয়াপরশ হয়ে বান্দার অনেক অপরাধ গোপন করে রাখেন। কিন্তু দুর্ভাগা অনেক মানুষই চায় না যে, তার গোপন অপরাধগুলো গোপন থাক। তাই তো, অনেক মানুষই রাতের আঁধারে তাদের কৃত অপরাধগুলো দিনের আলোতে অন্যের নিকট নির্লজ্জাতার সঙ্গে প্রকাশ করে দেয়, যা আল্লাহর বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। যে নিজের গোপনীয় বিষয় নিজেই অন্যের নিকট প্রকাশ করে, আল্লাহ তায়ালা তার গোপনীয় অপরাধগুলো কখনও ক্ষমা করেন না। এ সম্পর্কে হাদিসে বর্ণিত আছেÑ রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আমার উম্মতের সবার গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে। কিন্তু নিজেরা নিজেদের দোষত্রæটি জাহিরকারীদের পাপ ক্ষমা করা হবে না। (কিছু কিছু মানুষ আছে) তারা নিজেদের দোষত্রæটি এমনভাবে প্রকাশ করে, যেমন কোনো ব্যক্তি রজনীতে কোনো অপকর্ম করে। এরপর প্রভাত হয়। মহান আল্লাহ পাক তার কর্মফলগুলো গোপন করে রেখেছেন। এরপর সে সকালবেলা বলে, হে অমুক! আমি গতরাতে এমন এমন কাজ করেছি। অথচ সে রাত যাপন করেছিল এমন অবস্থায় যে, মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁর অপরাধসমূহ গোপন করে রেখেছিলেন আর ভোরবেলা সে মহান আল্লাহর গোপনীয়তাকে প্রকাশ করে দেয়।’ (বুখারি : ৬০৬৯)। তাই উপরোক্ত হাদিস থেকে আমাদের শিক্ষা হচ্ছে, আমরা কখনও আমাদের কৃত অপরাধসমূহ অন্যের নিকট অযাচিতভাবে প্রকাশ করব না। অন্যের কোনো দোষ-দুর্বলতাও মানুষের সামনে প্রকাশ করব না। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সমস্ত গোপনীয় অপরাধমূলক কাজ থেকে বিরত থাকার তওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : আলেম ও প্রাবন্ধিক




Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: