প্রকাশ: সোমবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০২০, ১১:০৩ পিএম (ভিজিট : ১৩৪০)
নূর মুহাম্মদ রাহমানী
মৃত্যুর পর কার্যকর করতে হয় ইসলামের এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধানের নাম অসিয়ত। যেমনÑ যদি কোনো ব্যক্তি মৃত্যুর সময় বলে যায়, আমার মৃত্যুর পর আমার পরিত্যক্ত সম্পত্তি হতে এত পরিমাণ সম্পত্তি অথবা এতটুকু জমি অমুক ব্যক্তি, অমুক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, অমুক মুসাফিরখানা কিংবা অমুক এতিমখানায় যেন দিয়ে দেওয়া হয়। তা হলে এটাকে শরিয়তের পরিভাষায় ‘অসিয়ত’ বলে।
অসিয়ত একমাত্র মৃত ব্যক্তির সদিচ্ছায় হতে পারে। তাকে জবরদস্তি করার সুযোগ নেই। অসিয়ত হতে হবে ব্যক্তির পার্থিব উপার্জন থেকে। কোরআন ও হাদিসের ভাষ্যমতে অসিয়ত করা গুরুত্বপূর্ণ একটি সুন্নত। কারণ এটি বান্দাকে দ্রুত তওবার দিকে আহ্বান করে। পাপাচার না করতে উৎসাহিত করে। ইবাদত-বন্দেগিতে অন্তরে উদ্যমতা সৃষ্টি করে। আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ^াস সৃষ্টি করতে সাহায্য করে। অসিয়তের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘কোনো মুসলমানের জন্য যার কাছে অসিয়ত করার মতো কোনো বিষয় থাকে তা হলে দুই রাতও অসিয়ত লিখে সংরক্ষণ না করে অতিবাহিত করা উচিত নয়।’ (মুসলিম)
অসিয়ত করা ও না করা উভয়টা যদিও বৈধ কিন্তু কোনো কোনো সময় অসিয়ত করা উত্তম। উত্তরাধিকার নীতিমালা অনুযায়ী যেসব আত্মীয়দের নির্দিষ্ট অংশ মিলে না, অথচ তারা অভাবি, সহযোগিতার মুখাপেক্ষী হলে অসিয়তের মাধ্যমে কিছু সম্পদ তাদের ভাগ্যে জুটে। যেমন এতিম নাতি-নাতনি, পুত্রের অসহায় অভাবি বিধবা স্ত্রী, ভাই-বোন কিংবা অন্য কোনো আত্মীয় সাহায্য-সহযোগিতার মুখাপেক্ষী হয় তা হলে অসিয়তের মাধ্যমে তাদের সহায়তা করা যায়।
কোরআন ও হাদিসের আলোকে ওলামায়ে কেরাম বলেছেন, যার দায়িত্বে ঋণ থাকে, তার কাছে কারও আমানত রাখা থাকে কিংবা তার দায়িত্বে কোনো আবশ্যিক কোনো বিষয় থাকে যা সে নিজে আদায় করতে সক্ষম হবে না তখন তার জন্য অসিয়তনামায় বিস্তারিত লিখে রাখা জরুরি। আর সাধারণ মানুষের জন্য অসিয়ত লেখা জরুরি নয় তবে মুস্তাহাব।
কতটুকু সম্পদে অসিয়ত করা যায়?
অঢেল সম্পদ রয়েছে এমন ব্যক্তির জন্য পরিত্যক্ত সম্পদের এক-পঞ্চমাংশ, এক-চতুর্থাংশ কিংবা এক-তৃতীয়াংশ পরিমাণ সম্পদ অসিয়ত করার সুযোগ রয়েছে। এক-তৃতীয়াংশের অধিক পরিমাণ সম্পদ অসিয়ত করতে চাইলে ওয়ারিশদের অনুমতি লাগবে। যদি এক-তৃতীয়াংশের অধিক সম্পদ অসিয়ত করে ফেলা হয় তা হলে এক-তৃতীয়াংশ সম্পদে অসিয়ত কার্যকর করা ওয়ারিশদের ওপর ওয়াজিব। যেমন কোনো ব্যক্তির পরিত্যক্ত সম্পত্তি হতে কাফন-দাফন, অন্যান্য ওয়াজিব হকসমূহ ও ঋণ পরিশোধ করার পর ৯ লাখ টাকা অতিরিক্ত হলো, তা হলে এখানে সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত অসিয়ত কার্যকর করা ওয়ারিশদের ওপর আবশ্যক।
এক-তৃতীয়াংশ হতে অধিক সম্পত্তির ওপর অসিয়ত কার্যকর করা ও না করা ওয়ারিশদের ইচ্ছাধীন।
অসিয়তের জন্য সাক্ষী রাখা
অসিয়ত দুজন ন্যায়-নিষ্ঠাবান সাক্ষীর উপস্থতিতে লিখিয়ে নেওয়া জরুরি যাতে পরবর্তীতে অসিয়তকারীর মৃত্যুর পর কোনো মতবিরোধ সৃষ্টি না হয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের মধ্যে যখন কারও মৃত্যু উপস্থিত হয়, তখন অসিয়ত করার সময় তোমাদের মধ্য থেকে ধর্মপরায়ণ দুজনকে সাক্ষী রেখ। তোমরা সফরে থাকলে এবং সে অবস্থায় তোমাদের মৃত্যু উপস্থিত হলে তোমরা তোমাদের ছাড়াও দুই ব্যক্তিকে সাক্ষী রেখ।’ (সুরা মায়িদা : ১০৬)। আয়াতটিতে বলা হয়েছে, সফরে আর বাড়িতে সব জায়গায় অসিয়ত করা যায়। তবে অসিয়ত করার সময় আমানতদার দুজন ব্যক্তিকে সাক্ষী রাখা উচিত যাতে পরবর্তীতে কোনো রকমের মতবিরোধ সৃষ্টি না হয়। তবে জীবদ্দশায় কল্যাণ মনে করলে অসিয়তকারীর জন্য অসিয়তে পরিবর্তন করার সুযোগ আছে।
কাউকে বঞ্চিত না করা
কাউকে ঠকানোর জন্য কখনও অসিয়ত করা যাবে না। ওয়ারিশদের হক কম দেওয়ার জন্য, তাদের বঞ্চিত করার জন্য অসিয়ত করা চরম অন্যায়। কবিরা গুনাহ। যা জুলুমের শামিল। নবীজি (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো ওয়ারিশকে সম্পত্তি হতে বঞ্চিত করল আল্লাহ তায়ালা কেয়ামতের দিন তাকে জান্নাত থেকে বঞ্চিত করে দেবেন।’ (ইবনে মাজাহ)
ওয়ারিশদের অসিয়ত করা যাবে না
ইসলাম সূচনাকালে যখন ওয়ারিশের অংশ নির্ধারিত ছিল না, তখন ওয়ারিশদের অংশ অসিয়তের মাধ্যমে নির্ধারিত হতো, যাতে মৃত্যুর পর তার বংশে ঝগড়া না হয়, কোনো হকদারের হক নষ্ট না হয়। কিন্তু পরবর্তীতে উত্তরাধিকার সম্পদ বণ্টনের জন্য আল্লাহ তায়ালা কিছু নীতিমালা দিয়ে দিলেন, তখন অসিয়তের অপরিহার্যতা শেষ হলো। এ ব্যাপারে সুরা নিসায় আলোচনা করা হয়েছে।
অবশ্য দুটি মৌলিক শর্তের ভিত্তিতে অসিয়ত করা মুস্তাহাব হিসেবে অবশিষ্ট থাকল। ১. যে ব্যক্তি পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে নির্দিষ্ট অংশ পাচ্ছে, তার জন্য অসিয়ত করার সুযোগ নেই। যেমন মা-বাবা, স্ত্রী, স্বামী ও সন্তান-সন্ততি এদের জন্য অসিয়ত করা যায় না। নবীজি (সা.) বিদায় হজের সময় আনুমানিক দেড় লাখ সাহাবির সমাবেশে বলেছেন, ‘আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক ওয়ারিশের অংশ নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন, তাই এখন কোনো ওয়ারিশের জন্য অসিয়ত করা বৈধ নয়।’ (তিরমিজি)। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর হাদিসে আরও স্পষ্টভাবে এসেছে। উত্তরাধিকার বিধান ওই লোকদের অসিয়তকে রহিত করে দিয়েছে যাদের অংশ নির্ধারিত আছে। অন্যান্য আত্মীয় যাদের নিয়মানুসারে অংশ নেই, এদের জন্য অসিয়তের বিধান এখনও বলবৎ আছে। ২. বেশির চেয়ে বেশি এক-তৃতীয়াংশ পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে অসিয়ত কার্যকর হতে পারে। অবশ্য সব ওয়ারিশরা রাজি থাকলে এক-
তৃতীয়াংশের অধিক সম্পত্তিতেও অসিয়ত কার্যকর হতে পারে।
অসিয়তের হেকমত
অসিয়তের একাধিক হেকমতের মধ্য থেকে একটি হেকমত এটাও যে, মানুষের মৃত্যুর পর আত্মীয়তার নৈকট্যের ভিত্তিতে উত্তরাধিকার বণ্টন হয়। প্রয়োজন অনুপাতে নয়।
মৃতের যে যত কাছের আত্মীয় হবে তার অংশ তত বেশি হবে, চাই অন্য আত্মীয় অসহায়-ই হোক না কেন! তবে ইসলাম মানুষকে এ বিষয়ের প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছে যে, যদি কোনো ব্যক্তি নিজের আত্মীয়ের মধ্যে কাউকে সাহায্য করার খুব উপযুক্ত মনে করে এবং পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে তার কোনো অংশ না থাকে তা হলে তার জন্য
এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত সম্পদ অসিয়ত করা যায়। যেমন কারও কোনো পুত্র সন্তান মারা গেল, আর নাতি-নাতনি জীবিত থাকল তা হলে নাতি-নাতনির জন্য সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত অসিয়ত করা যেতে পারে।