একটি দুর্ঘটনা সারা জীবনের কান্না। সেই কান্না অনেক সময় ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে সমগ্র জাতিকে শোকাহত করে। কোনো কোনো দুর্ঘটনা সমগ্র জাতিকে স্তব্ধ করে দেয়। আগুনে পুড়ে ভস্মীভূত হওয়া, পানিতে ডুবে সলিল সমাধি হওয়া, গাড়ি দুর্ঘটনায় দেহ ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হওয়া, বহুতল ভবনের নিচে চাপা পড়ে জীবন্ত সমাধিতে পরিণত হওয়া, এবং ক্ষেত্রবিশেষ লাশ শনাক্ত করতে না পেরে গণকবরে সমাহিত হওয়া এ যেন এ নিত্যনৈমিত্তিক নিয়তি।
‘সেভ দ্য রোড’ ২৪ ডিসেম্বর জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে জানায়, এ বছর জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায় ৫ হাজার ৩৭০ জন। মোট আহত হয়েছে ৭০ হাজার ২২২ জন। এই দুর্ঘটনার ৪৪ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষ, ৩০ শতাংশ পথচারীকে গাড়ি চাপা দেওয়ার ঘটনা, ২০ শতাংশ সড়কপথের বেহালের কারণে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ার ঘটনা ও ৬ শতাংশ অন্যান্য অজ্ঞাত কারণে দুর্ঘটনা সংগঠিত হয়েছে।
এ ছাড়া ফিটনেসবিহীন গাড়ি, রুটপারমিট না থাকা এবং ড্রাইভারের লাইসেন্স না থাকার মতো সাধারণ সমস্যা তো রয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনার বিরুদ্ধে মাঝে মাঝে জেগে ওঠা নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে আমাদের ত্রুটিগুলো। ট্রাফিক ব্যবস্থার অব্যবস্থাপনাও দুর্ঘটনার জন্য অনেকাংশে দায়ী যা আমাদের ছাত্রদের আন্দোলনের সময় দৃষ্টিগোচর হয়েছে।
নৌপথে ও মাঝে মাঝে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে বিশেষ করে লঞ্চডুবি তার মধ্যে অন্যতম। ২০২১ সালে নৌপথে দুর্ঘটনা ঘটেছে ৭১২টি মোট নিহত ২৩০ জন আহত ৪৪৬ জন । সর্বশেষ ২৩ ডিসেম্বর ৪০০ যাত্রী নিয়ে এমভি অভিযান-১০ সদরঘাট থেকে ছেড়ে যায় চাঁদপুর ও বরিশাল টার্মিনালে থামে এবং যাত্রী ওঠানামা করে ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে পৌঁছলে রাত ৩টার সময় আগুন ধরে যায়। ভয়াবহ এই অগ্নিকাণ্ডে ৪১ জন যাত্রীর মৃত্যু হয়। এ ছাড়া ৮০ জনেরও বেশি দগ্ধ হয়েছেন। দুর্ঘটনার সময় অনেক যাত্রী আগুনের ভয়ে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে বেঁচে গেলেও এখনও নিখোঁজ রয়েছেন শতাধিক যাত্রী। দুর্ঘটনার পর জানা যায়, লঞ্চটি নদীতে বেপরোয়াভাবে চলছিল, ভাড়ার জন্য নিরাপত্তাহীন, অতিরিক্ত বোঝাইকৃত লঞ্চ জলপথে লোক বহন করে। অগ্নি বা দাহ্য বস্তু সম্পর্কে ত্রুটি রেখে অবহেলা এবং বেপরোয়া যান চালায়। লঞ্চটির ইঞ্জিনে ত্রুটি ছিল এবং সেখানে আগুন নেভানোর কোনো যন্ত্রপাতি ছিল না। দুর্ঘটনা ঘটার পরে সেটি জানা গেল।
২০২১ সালে রেলপথ দুর্ঘটনায় নিহত হয় ১৩৮ জন এবং আহত হয় ৩৭৮ জন। ক্রসিংয়ে রেল দুর্ঘটনা বেশি ঘটে। বগি বা লাইনচ্যুত একটি স্বাভাবিক ঘটনা। শিল্পকারখানায় আগুনে পুড়ে কয়লা হওয়া শ্রমিকদের নিয়তি। কারখানাতে কাজের পরিবেশ না থাকা, অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা না থাকা, বের হওয়ার সিঁড়ি না থাকা এক কথায় মালিকপক্ষের অতিরিক্ত মুনাফার লোভে সব নিয়ম ভঙ্গ করায় এসব দুর্ঘটনা ঘটে। ২০১২ সালে তাজরীন ফ্যাশনে আগুন এবং পরের বছর সাভারের রানাপ্লাজা ধসের কারণে বিশ্বব্যাপী শোকের ছায়া নেমে আসে। শোকাহত হয় পুরো বিশ্ববাসী। নড়েচড়ে ওঠে পোশাকের বিশ্ব বিখ্যাত ক্রেতাদের সংগঠন। সর্বশেষ নারায়ণগঞ্জে হাসেম ফুডস কারখানায় আগুনে পুড়ে ৫২ জনের মৃত্যু হয়।
বেসরকারি সংস্থা সেইফটি অ্যান্ড রাইটসের হিসেবে গত ১০ বছরে পোশাক খাতের বাইরে শিল্প কারখানায় ৪৫৩টি অগ্নিকাণ্ড এবং দুর্ঘটনায় ৬৯৭ জন শ্রমিক মারা গেছেন। প্রতিটি ক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ঘটলেই কেঁপে ওঠে দেশ, শুরু হয় বিভিন্ন দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের দায় এড়ানোর প্রতিযোগিতা, মিডিয়াতে ব্যাপক আলোচনা, বিশেষজ্ঞদের জ্ঞানগর্ভ আলোচনা, গভীর জমজমাট টকশো, দ্রুত মালিককে গ্রেফতার, বাস বা লঞ্চের বিভিন্ন ত্রুটি খুঁজে বের করা এবং তড়িঘড়ি করে তদন্ত কমিটি গঠন এবং সাত দিনের মধ্যে সুপারিশ কিন্তু দেখা যায় সাত বছরেও সেই সুপারিশ বাস্তবায়িত না হওয়া। নতুন করে ঘটে আরেকটি দুর্ঘটনা আর নতুন শোকে পুরাতন শোক ভুলে যায় সবাই এভাবেই চলছে বছরের পর বছর যুগের পর যুগ। দুর্ঘটনা ঘটার আগে যদি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হতো তাহলে শ্রমিককে আগুনে পুড়ে ভস্মীভূত হতে হতো না। যাত্রীদের পানিতে ডুবে সলিল সমাধি অথবা রাস্তায় দেহ ছিন্নবিচ্ছিন্ন হতো না। গণকবরে সমাহিত হতে হতো না।
লেখক: উপাধ্যক্ষ (শিক্ষা) পরমাণু শক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠান কলেজ, সাভার