খালি চোখে দেখলে ইজিবাইক পরিবেশসম্মত। কিন্তু এ দেখাটা ভুল। এই বাইকগুলোতে ব্যবহার করা ব্যাটারি মাটি, পানি, বায়ু ও মানবদেহের ক্ষতি করে। তবে ইজিবাইকগুলো দেশের লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করলেও টেকসই গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বাধা দিচ্ছে। এগুলোকে নীতিমালার মধ্যে নিয়ে এলে নেতিবাচক দিকগুলো থেকে রেহাই পাওয়া যাবে।
সম্প্রতি সারা দেশে ব্যাটারিচালিত ৪০ লাখ ইজিবাইক বন্ধ করার নির্দেশনা দিয়েছে হাইকোর্ট। সঙ্গে আমদানি ও ক্রয়-বিক্রয়ের ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। যার অন্যতম কারণ হলো অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার; পরিবেশ ও মানবদেহের ক্ষতি; রুট পারমিট না থাকা ও সড়কে দুর্ঘটনা সৃষ্টি করা।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইজিবাইকগুলো সরাসরি নয়, পরোক্ষভাবে পরিবেশের ক্ষতি করছে। এই বাইকগুলোতে যে ব্যাটারি ব্যবহার করা হয়, সেগুলো সাধারণ পুরনো। আগে একবার ব্যবহার করা হয়েছে এমন। ওই ব্যাটারিগুলো মেরামত করে আবার ব্যবহারের উপযোগী করা হয়। ফলে নতুন ব্যাটারির চেয়ে এগুলোর মেয়াদ কম হয়। ৮-৯ মাস বা এক বছর পর আবার মেরামত করতে হয়। মূলত এই মেরামত করার সময়ই পরিবেশ ক্ষতির সম্মুখীন হয়। কারণ ব্যাটারির ভেতর যে অ্যাসিড থাকে সেগুলো ফেলে দেওয়া হয়। যা সরাসরি মাটি ও পানিতে চলে যায়। অন্যদিকে যখন ব্যাটারিগুলো ভেঙে পোড়ানো হয় তখন ব্যাটারিতে থাকা সিসা ও নাইট্রাস অক্সাইড বাতাসে চলে যায়। ফলে বাতাস দূষিত হয়ে পড়ে। ওই দূষণ ৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে। ওই এলাকার মধ্যে যারা নিশ্বাস নেন তাদের শরীরে ক্ষতিকর নাইট্রাস অক্সাইড ও সিসার গ্যাস প্রবেশ করে।
এ বিষয়ে পরিবেশ দূষণ নিয়ে কাজ করা এনভায়রমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (এসডো) মহাসচিব ড. শাহরিয়ার হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, ব্যাটারির অ্যাসিড ও সিসা পানিতেও চলে যায়। সিসা পানিতে যখন যায় তখন, সেখান থেকে মাছের শরীরের যায়। সেখান থেকে আমাদের শরীরে আসবে। ওই পানিতে যদি শাকসবজি ধোঁয়া হয় তা হলে সেটার মাধ্যমেও শরীরে সিসা আসবে। আবার মাটিতে যখন যাবে তখন ফসলের মাধ্যমেও শরীরে আসবে। ব্যাটারি থেকে সিসা যদি পরিবেশে যায় তা হলে আমরা হয়তো আপাতদৃষ্টিতে জানতে পারি না, কিন্তু এটা প্রকৃতপক্ষে আমাদের খাদ্যচক্রে চলে আসে। শরীরে সিসা গ্রহণের মাত্রা শূন্য। কিন্তু যদি খাবারের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত শরীরে গ্রহণ করেন তা হলে চোখের সমস্যা হবে, শ্রবণশক্তি কমে যবে, কিডনি ও নার্ভ সিস্টেমে প্রভাব ফেলবে। নিশ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণের ফলে ফুসফুসের ক্ষতি হতে পারে। এমনকি ক্যানসারও হতে পারে। মাল্টিপল অর্গান ফেইলরের কারণ হবে।
দেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য এ রকম সব ধরনের ছোট যান চলাচল নিরুৎসাহিত করা উচিত বলে মনে করেন নগর পরিকল্পনাবিদ ও পরিবহন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে নগরে পর্যাপ্ত রাস্তা নেই।
অন্যদিকে এই যানবাহনগুলোর গতি ধীর হওয়ার কারণে জ্যামের সৃষ্টি হয়। একই সঙ্গে ছোট সড়ক থেকে যখন প্রধান সড়কে চলে আসে তখন দুর্ঘটনা সৃষ্টি হয়।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল হক মনে করেন, টেকসই পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করছে সব ধরনের ছোট ছোট গাড়ি। যেগুলো বড় গাড়ির জায়গা নিয়ে নেয়। এতে শহরের টেকসই উন্নয়ন হয় না।
তিনি বলেন, ছোট গাড়ি মানেই অনিয়ন্ত্রিত। সে শুধু শহরের মধ্যেই থাকে না, প্রধান সড়কেও চলে যায়। আবার চালক যিনি আছেন তিনি কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রশিক্ষিত না। ইজিবাইক কেন এত জনপ্রিয় হলো? খোঁজ নিলে দেখা যাবে এটা তৈরি করতেই মূল খরচ। কিন্তু জ্বালানি খরচ খুবই কম। বাসায় হুক লাগিয়েও চার্জ করা যায়। সে জন্য দ্রুত এটা প্রসার লাভ করেছে। শুধু ইজিবাইক নয়, সিএনজিসহ যত ছোট গাড়ি আছে, এদের যতই গুণাগুণ থাকুক না কেন টেকসই উন্নয়নের জন্য এরা অভিশাপ। আমাদের দেশে যেহেতু পেশাদার অর্গানাইজেশন নেই, তাই রাস্তায় এগুলো যেনতেনভাবে চলছে। শুধু ইজিবাইক না, অন্য ছোট গাড়ি নিরুৎসাহিত করার সঙ্গে সঙ্গে বিকল্প বাসেরও ব্যবস্থা করতে হবে।
লাখো মানুষের কর্মসংস্থানের বিষয়টি মাথায় রেখে একটা নীতিমালার মধ্যে ইজিবাইকগুলোকে নিয়ে আসা উচিত বলে মনে করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) শিক্ষক ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। তিনি সময়ের আলোকে বলেন, ‘ব্যাটারি চার্জ করতে যে বিদ্যুৎ লাগে সেটা খুবই কম। বিদেশ থেকে কিছু ইজিবাইক নিয়ে আসার পর এখন দেশেই তৈরি হচ্ছে। দেশের বেকারত্ব সমস্যর মধ্যে এখানে অনেকের কর্মসংস্থান হয়েছে। আর কঠিন পরিশ্রমের মাধ্যমে চালকরা যে রিকশা চালান ব্যাটারি লাগানোর ফলে সেটা সহজ হয়েছে। এ দুটো ইতিবাচক দিক। নেতিবাচক দিকের মধ্যে রয়েছে এগুলো চালানোর ক্ষেত্রে। তো সেগুলো কোন কোন জায়গায় চালাতে হবে, কীভাবে লাইসেন্স দেওয়া হবে তার একটা নীতিমালা প্রয়োজন। যদি নীতিমালার মধ্যে আনা যায় তা হলে আমার মনে হয় এগুলোর ইতিবাচক দিকই বেশি।
/আরএ