আবারও বিশ্বশক্তির মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছে ইউক্রেন-রাশিয়া সঙ্কট। ২০১৪ সালেও ইউক্রেনের ক্রিমিয়া নিয়ে হইচই পড়ে গিয়েছিল। সেবার রাশিয়ার পরোক্ষ সহযোগিতায় মূল ইউক্রেন থেকে বিচ্ছিন্ন হয় ক্রিমিয়া উপদ্বীপ। তবে এবার সঙ্কটের চিত্র কিছুটা ভিন্ন। একই সঙ্গে ভয়াবহও। হয়তো রাশিয়ার আগ্রাসনে বিচ্ছিন্ন হতে পারে ইউক্রেনের প্রায় অর্ধেক অঞ্চল। তবে এই আগ্রাসন ডেকে আনতে পারে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের হুমকি।
ইউক্রেনের ম্যাপের দিকে তাকালে দেখা যাবে, দেশটির উত্তরে বেলারুশ, উত্তর-পশ্চিমে পোলান্ড, পশ্চিমে রোমানিয়া, দক্ষিণে বিচ্ছিন্ন হওয়া ক্রিমিয়া ও কৃষ্ণ সাগর, দক্ষিণ-পূর্বে অ্যাজভ সাগর এবং পুরো পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ঘিরে আছে রাশিয়া। রুশ-ইউক্রেন সীমান্তের প্রায় পুরোটাজুড়েই এবার সৈন্য সমাবেশ ঘটাচ্ছেন পুতিন। পাশাপাশি সেনা পাঠিয়েছে আমেরিকাও। রাশিয়ার সীমান্তের কাছে ইউক্রেনের প্রান্তে সাড়ে আট হাজার মার্কিন সেনা পাঠিয়েছে আমেরিকা। সেনাকে স্ট্যান্ডবাই থাকতে বলা হয়েছে। আমেরিকা জানিয়েছে, যেভাবে ইউক্রেন সীমান্তে রাশিয়া ১ লাখ সেনা মোতায়েন করেছে এবং প্রতিদিন উত্তেজনা বাড়াচ্ছে তা মাথায় রেখেই এই পদক্ষেপ করা হয়েছে। পাশাপাশি ন্যাটোও পূর্ব ইউরোপে সেনা মোতায়েন করছে।
নব্বইয়ের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকে এর অন্যতম দুই অংশীদার রাশিয়া-ইউক্রেনের সম্পর্ক সবসময়ই এক ধরনের উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গেছে। একদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রধান উত্তরসূরি হিসেবে রাশিয়া সবসময় ইউক্রেন সংক্রান্ত বিষয়কে নিজেদের মনে করেছে অন্যদিকে স্বাধীন দেশ হিসেবে ইউক্রেনের পশ্চিমা ঘেঁষা নীতি। স্নায়ুযুদ্ধকালীন বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে এসে ইউক্রেন মোটামুটি দুপক্ষের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার কৌশলে এগিয়ে চললেও ২০১৪ থেকে পরিস্থিতি বদলে যেতে থাকে, কিয়েভের তৎকালীন সরকার ইউরোর সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির বদলে রাশিয়ার পাল্টা প্রস্তাবে সায় দিলে সেখানে দানা বাঁধে ইউরোময়দান আন্দোলন, ক্ষমতাচ্যুত হন রুশপন্থি রাষ্ট্রপতি ভিক্টর ইয়ানুকোভিচ।
প্রতিক্রিয়ায় রাশিয়াও ইউক্রেন থেকে দখল করে নেয় ক্রিমিয়া, যা আবার ১৯৫৪-তে নিকিতা ক্রুশ্চেভের আমলে ইউক্রেনকে উপহার দেওয়ার আগে রাশিয়ারই অংশ ছিল। লক্ষণীয় দিক হলো, ১৯৯১ সাল পর্যন্ত ইউক্রেন কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ ছিল। তখন রাশিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর পশ্চিমাদের দিকে ঝুঁকে পড়ে ইউক্রেন। ন্যাটোর সদস্যপদ পাওয়ার চেষ্টাও করে। ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া অঞ্চল হারানোর পর ন্যাটোর সদস্য হতে কোমর বেঁধে নেমেছে দেশটি। সে বছরের ২৩ ডিসেম্বর জোট নিরপেক্ষ অবস্থান আনুষ্ঠানিকভাবে ত্যাগ করে ইউক্রেন। এই সিদ্ধান্তের কড়া নিন্দা জানিয়েছিল রাশিয়া। ২০১৮ সালে ইউক্রেনকে অ্যাম্পিয়ারিং মেম্বার করে ন্যাটো। ২০২১ সালের শুরুর দিকে ন্যাটোর সেক্রেটারি জেনারেল স্টলটেনবার্গ ঘোষণা করেন, ন্যাটোর পূর্ণ সদস্য হওয়ার জন্য ইউক্রেন এখন ক্যান্ডিডেট।
এপ্রিল মাস থেকে ধীরে ধীরে ইউক্রেন সীমান্তে সেনা সমাবেশ শুরু করে রাশিয়া। কারণ ইউক্রেন যদি ন্যাটোর সদস্য হয় তাহলে তা রাশিয়ার জন্য ভবিষ্যতে বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে। কারণ, সদস্য দেশগুলোকে সবসময়ই সামরিক সহায়তা দেয় ন্যাটো। এগুলোয় সামরিক স্থাপনাও বসানো হয়। ইউক্রেনে ন্যাটোর সেনা, সামরিক স্থাপনা ও মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম বসানোর মানে হচ্ছে রাশিয়া তখন ২৪ ঘণ্টাই আতশ কাচের নিচে থাকবে। বিভিন্ন কারণে মন চাইলেই পুতিনকে হুমকি দিতে পারবে ন্যাটো, এমনকি সামরিক চাপ দিয়ে রাশিয়াকে বৈশ্বিক কর্তৃত্ব থেকে সরিয়েও দেওয়া হতে পারে।
তবে দুই দেশের সম্পর্কের এই তিক্ততা এখানেই শেষ হয়ে যায়নি। বরং কৃষ্ণ সাগর ঘেঁষা ক্রিমিয়ার ভূ-রাজনৈতিক তাৎপর্য বিবেচনায় নিয়ে রাশিয়াও যেমন এক বিন্দু ছাড় দিতে নারাজ, তেমনি সামরিক দিক দিয়ে পিছিয়ে থাকা ইউক্রেনও ক্রিমিয়া ফিরে পেতে মরিয়া। ক্রিমিয়া বাঁচাতে না পারলেও কিয়েভ প্রতিশোধ নিয়েছে অন্যভাবে। ঠিক হাতে না মেরে ভাতে মারার মতো, তারা ক্রিমিয়ার পানি ব্যবস্থার বড় উৎস যা আসে ডিনিপার নদী থেকে, সেখানেই বাঁধ দিয়ে রেখেছে। রুশ অস্ত্রের ঝংকারে ক্রিমিয়ার নিরাপত্তা বূহ্য সুরক্ষিত থাকলেও বাস্তবতা হচ্ছে পানির জন্য তার চেয়ে গভীর সঙ্কটে আছে ক্রিমিয়া। পাইপলাইন দিয়ে পানি সরবরাহ করতে ক্রেমলিনকে খরচ করতে হচ্ছে হাজার হাজার রাশিয়ান করদাতার রুবল, খরায় পড়ে থমকে আছে সেখানকার কৃষি খাত। অন্যদিকে, ২০১৪ সালের পরই কিয়েভ ন্যাটোর সদস্য হওয়ার জন্য দৌড়ঝাঁপ শুরু করে দেয়। এমনকি এ বছরের শুরুতে ন্যাটো থেকে তাদের পূর্ণ সদস্য হওয়ার ব্যাপারে সবুজ সঙ্কেতও দেওয়া হয়েছিল। যা রাশিয়ার জন্য যথেষ্ট চিন্তার বিষয় যেহেতু এতে চিরশত্রু যুক্তরাষ্ট্র অত্যাধুনিক সব মারণাস্ত্র নিয়ে তার ঘাড়ে চেপে বসার সুযোগ পাবে। এই দিকে আমেরিকা এবং ন্যাটোর এসব পদক্ষেপ স্বাভাবিকভাবেই ভালো চোখে দেখছে না রাশিয়া।
সোমবার রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এক বিবৃতিতে বলেছেন, ট্রান্স আটলান্টিক মিলিটারি লাল দাগ পার করলে রাশিয়া কড়া ভাষায় তার জবাব দেবে। অর্থাৎ ফের একবার যুদ্ধের হুমকি দিয়েছেন পুতিন। রাশিয়ার অবশ্য দাবি, সীমান্তে নিরাপত্তার খাতিরেই তারা সেনা মোতায়েন করেছে। যুদ্ধের কোনো ইচ্ছা তাদের নেই। কিন্তু ন্যাটো এবং আমেরিকা আগ্রাসন দেখালে তারাও ছেড়ে কথা বলবে না। রহস্যজনক কথা হলো, ২০০৮ সালে রোমানিয়ার বুখারেস্টে ভ্লাদিমির পুতিন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশকে এ কথা বলে চমকে দিয়েছিলেন, আপনাকে এটা বুঝতে হবে যে ইউক্রেন কোনো দেশ নয়। এটা পূর্ব ইউরোপের একটি ভূখণ্ড এবং এর বৃহত্তর অংশ আমাদের দেওয়া হয়েছে। ছয় বছর পর ক্রেমলিন যেন এটা নিশ্চিত করতে চাইছে যে পুতিনের সেদিনের কথাগুলো এখন বাস্তবে রূপ নিচ্ছে।
২০০০ সালে রাশিয়ার ক্ষমতায় বসার পর থেকেই পুতিনের মূল লক্ষ্য হচ্ছে ন্যাটো বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রভাব থেকে সাবেক সোভিয়েতভুক্ত দেশগুলোকে মুক্ত রাখা। আর এ কারণে ইউরোপীয় ইউনয়নের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি না করতে পুতিন ইউক্রেনের বিতাড়িত প্রেসিডেন্ট ইয়ানুকোভিচকে দেড় হাজার কোটি ডলার ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব করেছিলেন।
তবে বস্তুত, গত বছরের শুরু থেকেই রাশিয়া ইউক্রেনের মধ্যে ছোটখাটো সংঘাতের আশঙ্কা করা হচ্ছিল। তবে বছরের শেষ দিকে এসে জানা গেল রাশিয়া ইতোমধ্যে ইউক্রেন সীমান্তে ভারী অস্ত্রসহ ১ লাখের অধিক সেনা মোতায়েন করেছে এবং জানুয়ারি নাগাদ হামলা চালাতে পারে। সৈন্য সমাবেশের বিষয়ে মস্কো বলছে, তাদের যুদ্ধে জড়ানোর কোনো ইচ্ছা নেই, তবে রুশ সীমান্তে তারা ন্যাটো তথা যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অবস্থান বরদাস্ত করবে না। তবে রাশিয়া যে এত সহজেই দমে যাওয়ার পাত্র নয় তা অন্যরা ভালোই জানে এবং এতে করে পরিস্থিতি আরও জটিলই হবে। যুদ্ধ সঙ্কেত পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়বে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী। সম্ভাব্য আক্রমণ ঠেকাতে পুরোপুরি প্রস্তুত ইউক্রেনও। এদিকে মস্কোর বিরুদ্ধে আবারও কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে পশ্চিমা বিশ্ব। বলেছে, হামলা চালানোর কয়েক দিনের মধ্যেই রাশিয়ার ওপর সম্মিলিতভাবে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হবে। রোববার ইউরোপীয় ইউনিয়নের, ইইউ, এক সিনিয়র কর্মকর্তা এক বিবৃতিতে এই হুঁশিয়ারি দেন।
ইউক্রেনে সম্ভাব্য রুশ আগ্রাসন থামাতে গত কয়েক সপ্তাহের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা কোনো ফল দেয়নি। আলোচনায় অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। এ অচলাবস্থাই যুদ্ধের আশঙ্কাকে আরও ঘনীভূত করেছে। ইউক্রেনের সামরিক গোয়েন্দারা দাবি করেছেন, রাশিয়া ভাড়াটে যোদ্ধাও নিয়োগ দিয়েছে এবং যুদ্ধের সম্ভাব্য ক্ষেত্রে প্রস্তুতি রাখতে দোনেস্ক ও লুহানস্ক অঞ্চলে ওই ভাড়াটে বাহিনীকে জ্বালানি, ট্যাঙ্ক এবং স্ব-চালিত আর্টিলারি সরবরাহ করছে। শুধু তাই নয়, স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, অভিজাত স্পেটসনাজ বাহিনী এবং বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রসহ একটি বড় সামরিক বাহিনী রাশিয়ার পূর্ব সামরিক জেলা থেকে বেলারুশে এসে পৌঁছেছে।
পিছিয়ে নেই ইউক্রেনও। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় দেশগুলো ইউক্রেনের জন্য সামরিক সহায়তা বাড়িয়েছে। গত সপ্তাহেই ব্রিটেন ২ হাজারের বেশি পরবর্তী প্রজন্মের হালকা অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক লঞ্চার পাঠিয়েছে এবং প্রশিক্ষক হিসেবে একটি নতুন রেঞ্জার রেজিমেন্ট থেকে প্রায় আড়াই ডজন সেনা পাঠিয়েছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার বিষয় হলো, স্নায়ুযুদ্ধের পর থেকে রাশিয়া ক্রমান্বয়ে বিশ্বরাজনীতিতে তার প্রভাব হারিয়েছে, সামনে উঠে এসেছে চীনের মতো দেশগুলো। যুক্তরাষ্ট্রও ট্রাম্পের আমল থেকে চীনকে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মোকাবিলা করছিল, ভূ-রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে পরাশক্তিদের আগ্রহের কেন্দ্রে ছিল প্যাসিফিক অঞ্চল এমন অবস্থাকে রাশিয়া তাদের জন্য দেখছে সুযোগ হিসেবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ঘুম কিছুটা হয়তো ভেঙেছে। তারা আবার মনোযোগ দিচ্ছে পূর্ব ইউরোপের দিকে, প্রতিশ্রুত অস্ত্র ও লজিস্টিক সাপোর্ট কয়েক ধাপে পৌঁছেছে। ইউক্রেনের সঙ্গে আছে তাদের স্যাংশন ডিপ্লোম্যাসি। এমনিতেই অর্থনৈতিক দিক দিয়ে ভালো অবস্থায় নেই রাশিয়া, ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ালেই তাদের জন্য অপেক্ষা করবে যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইউরোপীয় মিত্রদের নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা। তবে ইউরোপের অনেক দেশই প্রথাগত সম্পর্কের বাইরে গিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখার চেষ্টা চালাচ্ছে। জার্মানি তাদের মধ্যে অন্যতম। সংঘাত বাঁধলে ইউরোপের জ্বালানির ভবিষ্যৎ উৎস রাশিয়াকে ইইউ জোটের সদস্যরা পাবে কিনা সেই প্রশ্নও থেকে যায়।
অন্যদিকে ইউক্রেন ইস্যুতে সাম্প্রতিক সময়ে পুতিন কথা বলেছেন চীনের শি জিনপিং এর সঙ্গেও এবং কৌশলগত কারণেই চীন রাশিয়াকেই সমর্থন দেবে বলা যায়। সেই হিসাবে দুই অর্থনৈতিক-সামরিক পরাশক্তি চীন-রাশিয়াকে একসঙ্গে মোকাবিলা করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
বিশ্ব আবারও অস্থিতিশীল হবে। বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এর ক্ষতির প্রভাব পড়বে। অথচ বিশ্বরাজনৈতিক নেতাদের সহায়তায় আলোচনার মাধ্যমে এর সমাধান আসা সম্ভাবনা থাকলেও কেউ তাদের শক্তির প্রমাণ দিতে গিয়ে আলোচনার টেবিল কে বাদ দিয়ে সংঘাতের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে। যা পুরো বিশ্বের ওপর প্রভাব পড়ে।
-শিক্ষার্থী, ব্যবস্থাপনা বিভাগ
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়