শিক্ষক মানেই শ্রদ্ধার পাত্র, গুরুজন, অভিভাবক। মানুষ গড়ার কারিগর। বড় কথা তিনি একজন আদর্শবান মানুষ। বাবা-মা সন্তান জন্ম দিতে পারেন। কিন্তু ছেলেমেয়েকে মানুষের মতো মানুষ করে গড়ে তোলেন একজন শিক্ষক। বাবা-মায়ের চেয়ে শিক্ষকের গুরুত্ব কোনো অংশেই কম নয়। আমরা যখন ছাত্র ছিলাম,তখন একজন শিক্ষকের প্রতি আমাদের এতই শ্রদ্ধাবোধ ছিল যে, কোনো শিক্ষককে যদি রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসতে দেখতাম, তাহলে আমরা অন্য রাস্তা দিয়ে ঘুরে আসতাম।
শিক্ষক আমাদের কী জাদু করেছেন জানি না, আর কী শিক্ষা দিয়েছেন তাও বলে বোঝাতে পারব না, তবে এতটুকু বলতে পারি যে, শিক্ষকের সামনে মুখ তুলে কথা বলার মতো কোনো সাহস আমরা পেতাম না। আর শিক্ষক কেমন ছিলেন, তাদের গুণের কথা ব্যাখ্যা করার ক্ষমতাও আমার নেই। একজন শিক্ষক ছাত্রকে যে স্নেহ, আদর, ভালোবাসা দিতেন তা বাবা-মায়ের চেয়ে কম নয়। শিক্ষকের শাসনের মধ্যে ছিল আদর ভরা আর স্নেহ মাখা। শিক্ষক একবার শাসন করলে বারবার আদর করতেন। যে আদর পেয়ে শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা বেড়ে যেত। পড়াশোনায় বেশি মনোযোগী হতাম। মনে পড়ে এক বাল্যবন্ধুর কথা। তারা গরিব ছিল। তার বাবা কৃষিকাজ করতেন।
সেই বন্ধু ছয় মাস স্কুলের বেতন দিতে না পেরে লজ্জায় স্কুলে যাওয়াই বন্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু শিক্ষক যখন জানতে পারলেন এই বিষয়টি তখন তাকে ডেকে এনে তার বেতন ফ্রি করে দিলেন এবং নিয়মিত ক্লাস করতে বললেন। শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়তে গেলে ছাত্রের বাবার পারিবারিক অবস্থা বুঝে টিউশন ফি নিতেন। আর অবস্থা খারাপ থাকলে বিনা টাকায় প্রাইভেট পড়াতেন। বই কেনার সামর্থ্য না থাকলে শিক্ষক অন্য কোনো ছাত্রের পুরনো বই সংগ্রহ করে দিতেন। অনেক সময় স্কুলে সরকারি ফি কোনো ছাত্র দিতে না পারলে শিক্ষক তার পকেট থেকে সরকারি ফি পরিশোধ করতেন। প্রতিটি ছাত্রের পারিবারিক খোঁজ রাখতেন শিক্ষক। প্রকৃতপক্ষে তারাই ছিলেন আদর্শবান শিক্ষক। তাদেরকে মন থেকে শ্রদ্ধাই করতে ইচ্ছে করে। এত বছর পরেও তাদের কথা ভুলতে পারি না। তাদের কথা মনে হলে এখনও মাথা আপন মনে নুইয়ে পড়ে। সে সময়ের ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক কত মধুর ছিল তা বলে বোঝানো যাবে না।
কিন্তু এখন আর সেই অবস্থা নাই। কয়েক মাস আগের কথাই ধরুন, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক ১৪ জন ছাত্রের মাথার চুল সে নিজে হাতে কাঁচি দিয়ে কেটে দিয়েছেন। এ বিষয়ে একজন ছাত্র লজ্জায়, ক্ষোভে আত্মহত্যা করতে গেছে। এর প্রেক্ষিতে ছাত্ররা আন্দোলন শুরু করলে আন্দোলন থামাতে কর্তৃপক্ষ বিশ্ববিদ্যালয়টি বন্ধ ঘোষণা করেন। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে থামিয়ে দেওয়া হলো ছাত্র আন্দোলন। সাধারণ ছাত্ররা কোনো বিচার পেল না।
ছাত্রদের চুল কেটে অপমান করা হলো। আবার ছাত্রদের ওপর এর দায় চাপানো হলো। আবার আরেকটি ঘটনার সূত্রপাত হলো শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। হঠাৎ করেই ক্যাম্পাস উত্তপ্ত হয়ে গেল। গত ২৩ জানুয়ারি আমাদের প্রিয় শিক্ষক মুহম্মদ জাফর ইকবাল একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় লিখেছেন যে, প্রথম ধাপে যখন হলের মেয়েরা তাদের দাবি-দাওয়া নিয়ে ভাইস চ্যান্সেলরের কাছে গেছে তখন সেটি সেখানেই শেষ হয়ে যেতে পারত। কিন্তু তাদের কথা আন্তরিকভাবে শোনা হয়নি এবং সমাধানের নিশ্চয়তাও দেওয়া হয়নি। এর ফলে তারা আন্দোলন করতে বাধ্য হয়েছে। আর সেই শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ছাত্রছাত্রীকে পুলিশ দিয়ে পেটানো হয়েছে। শটগান দিয়ে ছাত্রদের ওপর গুলি পর্যন্ত করানো হয়েছে। ছাত্রদের বিরুদ্ধে আমানবিক এবং নিষ্ঠুর আচরণ করা হয়েছে। শিক্ষক যদি বাবাই হতেন, তবে এমন আচরণ কখনও করতে পারতেন না।
শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনের বিস্তারিত বিষয় বলতে চাই না। তবে এতটুকু বলা যায় এখানে ছাত্র শিক্ষকের ভালো সম্পর্ক নেই। শিক্ষকদের প্রতি বিনীত অনুরোধ, আপনারা ছাত্রদের প্রতি আন্তরিক হোন। ছাত্রদের সন্তান হিসেবে ভাবুন। তাদের ভালোবাসুন। আদর করুন। তাদের সমস্যা নিয়ে ভাবুন। ছাত্রদের ওপর দোষ না চাপিয়ে আপনাদের হৃদয়টা প্রসারিত করে ওদের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করুন। তাহলে অনেক সমস্যাই সমাধান হবে।
সোনারগাঁ, নারায়ণগঞ্জ