রাঘববোয়ালদের ধরবে কে

এসএম আলমগীর

জাতীয়

বাজারে এমন কোনো ভোগ্যপণ্য নেই যার দাম বাড়েনি। বিশ্ব বাজারে দাম বৃদ্ধির অজুহাতে বাড়ানো হয়েছে ভোজ্য তেল, চিনি, ছোলা, ডালের

2022-03-14T12:27:15+00:00
2022-03-14T12:27:15+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬,
১ শ্রাবণ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
রাঘববোয়ালদের ধরবে কে
এসএম আলমগীর
প্রকাশ: সোমবার, ১৪ মার্চ, ২০২২, ১২:২৭ পিএম 
বাজারে এমন কোনো ভোগ্যপণ্য নেই যার দাম বাড়েনি। বিশ্ব বাজারে দাম বৃদ্ধির অজুহাতে বাড়ানো হয়েছে ভোজ্য তেল, চিনি, ছোলা, ডালের মূল্য। কিন্তু চাল, পেঁয়াজ, মুরগির মতো অনেক পণ্য আছে যেগুলো দেশীয় উৎস থেকেই মেটে চাহিদা। এসব পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ প্রচুর থাকার পরও তো দাম বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। তা ছাড়া আমদানি করা পণ্যগুলোর দাম বিশ্ব বাজারের উচ্চমূল্যের কারণে যেটুকু বৃদ্ধির কথা, বাস্তবে দাম বাড়ে তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশে ভোগ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির পেছনে প্রধান কারণ থাকে ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট। কিন্তু এই সিন্ডিকেট ভাঙবে কে এবং বাজার সিন্ডিকেটের যাবা রাঘববোয়াল তাদের ধরবে কে।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত এক-দেড় বছর ধরেই ভোগ্যপণ্যের মূল্য চরম ঊর্ধ্বমুখী। অথচ বাজারে সরকারি কোনো সংস্থার তেমন নজরদারি বা জোরালো অভিযান চোখে পড়েনি। সম্প্রতি ভোজ্য তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে আলোচনা-সমালোচনা হলে টনক নড়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। এক রকম বাজারে ঝাঁপিয়ে পড়েছে এসব প্রতিষ্ঠানের মোবাইল টিম। কিন্তু তারা অভিযানে নেমে অধিকাংশ সময়ই খচুরা বাজারে গিয়ে মুদি দোকানদারদের জরিমানা করেন। অথচ যারা বাজার সিন্ডিকেটের মূলে রয়েছে, সেই আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান, মিলমালিক এবং যারা কোটি কোটি টাকার এসও (সেলস অর্ডার) এবং ডিও (ডেলিভারি অর্ডার) নিয়ে পণ্য মজুদ ও জিম্মি করে রাখে তাদের বিরুদ্ধে সে রকম জোরালো কোনো অভিযান চোখে পড়ে না। মাঝেমধ্যে এ পর্যায়ে অভিযান চালালেও অনেক সময় অদৃশ্য ফোনকলে অভিযান রেখে ফিরে আসতে হয় আবার কখনও কোনো রকম জরিমানা ছাড়াই চলে আসতে হয় মোবাইল টিমের সদস্যদের। অথচ বাজার অভিযানে নেমে একই দিনে অসংখ্য দোকানদারকে জরিমানা করা হয় লাখ লাখ টাকা। 
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, ভোগ্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে হলে সবার আগে মূল সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে। এ বিষয়ে কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান সময়ের আলোকে বলেন, ‘বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাজার মনিটরিং টিম রয়েছে। সারাবছর এদের কোনো রকম তৎপরতা দেখা যায় না। এ কমিটিতে যারা আছে তারা সারাবছর এক রকম ঘুমিয়ে থাকে। তাদের ঘুম ভাঙে রোজার আগ দিয়ে। এ চিত্র প্রতিবছরই দেখা যায়। ভোক্তার স্বার্থ দেখার জন্য সরকার ভোক্তা অধিদফতর নামে আলাদা একটি প্রতিষ্ঠান করেছে এবং ‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন-২০০৯’ নামে একটি ভালো আইন করেছে। কিন্তু অধিদফতর যেমন বাজারে নিয়ন্ত্রণে তেমন কোনো অবদান রাখতে পারছে না, তেমনি ভোক্তা আইনের সুফলটিও ভোক্তার কাছে ঠিকমতো পৌঁছতে পারছে না।’

এদিকে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আসান এইচ মনসুর সময়ের আলোকে বলেন, ‘যত দিন না ভোগ্যপণ্যের বাজারের বড় বড় রাঘববোয়ালের সিন্ডিকেট না ভাঙা যাবে, ততদিন বাজার নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। ভোজ্য তেল, চিনির মতো প্রধান কয়েকটি পণ্যের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান হাতেগোনা কয়েকটি। এসব প্রতিষ্ঠানের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে বাজার কেমন থাকবে। অথচ এই পর্যায়ে সরকারের কোনো প্রতিষ্ঠান যেতেই পারে না, কালেভদ্রে গেলেও তাদের জরিমানা করতে পারে না। তাই সবার আগে এই সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে।’

ভোক্তা অধিদফতরের বাজার অভিযানে কোন ধরনের ব্যবসায়ী বা প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়, সেদিকে একটু নজর দেওয়া যাক। অধিদফতরের সর্বশেষ ১০টির মতো বাজার অভিযান বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি রোববার ২৫ জন কর্মকর্তার নেতৃত্বে ঢাকা মহানগরসহ দেশের ২৩টি জেলায় বাজার তদারকি কার্যক্রম পরিচালনা করে। এতে বিভিন্ন অপরাধে ৫৫টি প্রতিষ্ঠানকে ২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এই ৫৫টি প্রতিষ্ঠানের সবগুলোই মুদি দোকানদার এবং ছোট ব্যবসায়ী।

গত ১০ মার্চ ৪৫ জন কর্মকর্তার নেতৃত্বে ঢাকা মহানগরসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বাজার তদারকি কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। এ সময় বিভিন্ন অপরাধে ১১০টি প্রতিষ্ঠানকে ৫ লাখ ৩১ হাজার ২০০ টাকা জরিমানা করা হয়। এগুলোও ছোট ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান। গত ৩ মার্চ ৫০ জন কর্মকর্তার নেতৃত্বে ঢাকা মহানগরসহ দেশের ৪৯টি জেলায় বাজার তদারকি কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। এ অভিযানে বিভিন্ন অপরাধে ১১৩টি প্রতিষ্ঠানকে ৮ লাখ ৬৬ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এ অভিযানেও যেসব প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয় তার প্রায় সবগুলোই ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা মুদি দোকানদার। তারও আগে গত ১ মার্চ ৪৪ জন কর্মকর্তার নেতৃত্বে ঢাকা মহানগরসহ দেশের ৩৮টি জেলায় বাজার তদারকি কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। এতে বিভিন্ন অপরাধে ১১৫টি প্রতিষ্ঠানকে ৫ লাখ ৪৬ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এ অভিযানে ঢাকা মহানগরের শনির আখড়া, যাত্রাবাড়ী, বাড্ডা, চকবাজার মৌলভীবাজার ও মোহাম্মদপুর এলাকার খুচরা ব্যবসায়ীর পাশাপাশি কয়েকজন পাইকারি ব্যবসায়ীকে জরিমানা করা হয়। এ ছাড়া গত ২২ ফেব্রুয়ারি ৫৩ জন কর্মকর্তার নেতৃত্বে ঢাকা মহানগরসহ দেশের ৪৮টি জেলায় বাজার তদারকি কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। এতে বিভিন্ন অপরাধে ১৩৮টি প্রতিষ্ঠানকে ৯ লাখ ১৮ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এ অভিযানে ঢাকা মহানগরের শাহআলী সিটি করপোরেশন বাজার, সাদাপুর বনগ্রাম ও মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের জরিমানা করা হয়।

এভাবে ভোক্তা অধিদফতরের প্রায় প্রতিটি অভিযানেই হয় মুদি দোকানদার অথবা বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ীদের জরিমানা করা হয়। কিন্তু মিল পর্যায়ে বা আমদানিকারক পর্যায়ে এভাবে জরিমানা করতে দেখা যায় না। ভোজ্য তেল নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হওয়ার পর চলতি মাসে তিনটি মিলে অভিযান চালায় ভোক্তা অধিদফতর ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের টিম। রোববার চট্টগ্রামের এস আলম গ্রুপের ভোজ্য তেল রিফাইনারি মিলে অভিযান চালায় ভোক্তা অধিদফতর। অভিযানে দেখা যায় এই চরম সঙ্কটকালেও প্রতিষ্ঠানটি বোতলজাত সয়াবিন উৎপাদন বন্ধ রেখেছে। তা ছাড়া প্রতিষ্ঠানটির কারখানায় শোধনকৃত ৫ লিটারের বোতলজাত সয়াবিনের বোতলের গায়ে খুচরা মূল্য ৮৩৫ টাকা লেখা ছিল। অথচ সরকার নির্ধারিত ৫ লিটারের মূল্য ৭৯৫ টাকা। অর্থাৎ সরকারি মূল্যের চেয়ে এক বোতলে ৪০ টাকা বেশি মূল্য সম্বলিত তেল উৎপাদন করে বাজারে ছাড়ছে প্রতিষ্ঠানটি। এ অপরাধ সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটিকে কোনো জরিমানা করতে পারেনি ভোক্তা অধিদফতর, কিন্তু একই রকম অর্থাৎ মূল্য বেশি রাখার অপরাধে অনেক মুদি দোকানদারকে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা করতে দেখা গেছে।

এ অভিযানের বিষয়ে ভোক্তা অধিদফতর চট্টগ্রাম অফিসের সহকারী পরিচালক মো. দিদার হোসেনের কাছে জানতে চাইলে সময়ের আলোকে তিনি বলেন, ‘এ অভিযানে আমরা এস আলম গ্রুপের মিল দুটি বড় অসঙ্গতি পায়। একটি হলো বোতলজাত সয়াবিন তেল শোধান অংশের ৫টি উইং বন্ধ রাখা হয়েছে। আর তাদের উৎপাদিত ৫ লিটারের বোতলজাত সয়াবিনে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে মিল কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে চাওয়া হলে তারা বলেন, যান্ত্রিক সমস্যার কাছে মিল বন্ধ রাখা হয়েছে। আর বেশি মূল্যের বোতলজাত সয়াবিন উৎপাদন করা হলেও সেগুলো নাকি তারা বাজারে ছাড়েনি।’ এসব অপরাধে তাদের কত টাকা জরিমানা করলেন, জানতে চাইলে দিদার হোসেন বলেন, ‘কোনো জরিমানা করা হয়নি। বিষয়টি আমি আমাদের প্রধান কার্যালয়ে জানালে আমাকে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক করে বিষয়টি সুরাহা করা হবে এবং বন্ধ মেশিনগুলো দ্রুত চালু করার কথা বলা হবে।’

এস আলম গ্রুপের মিলে অভিযানের আগে সপ্তাহখানেক আগে ভোক্তা অধিদফতর অভিযান চালায় তীর ব্র্যান্ডের সয়াবিন তেল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সিটি গ্রুপের কারখানায় এবং পুষ্টি ব্র্যান্ডের টিকে গ্রুপের কারখানায়। সয়াবিন তেলের বাজার অস্থিরতার জন্য খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি দোষারোপ করেন সিটি গ্রুপকে। অথচ এখানে ভোক্তা অধিদফতরের টিম কোনো রকম অসঙ্গতিই পায়নি। অবশ্য টিকে গ্রুপের করখানায় বেশি দামে পাম অয়েল বিক্রির অপরাধে প্রতিষ্ঠানটিকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

এদিকে এ বিষয়ে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন সময়ের আলোকে বলেন, ভোগ্যপণ্যের বাজারে রাঘববোয়ালদের ধরতে আমরাও তৎপর হচ্ছি এবং কাজ শুরু করছি। আমাদের গোয়েন্দারা এটি নিয়ে কাজ করছেন। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে আমরা অভিযান চালাব।



Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: