
গতকাল বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন উদযাপিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবছর উদযাপনের যে কর্মসূচি ২০২০ সালে শুরু হয়েছিল তা অতিমারি করোনার কারণে বাধাগ্রস্ত হওয়ায় এর আনুষ্ঠানিকতা গতকালই শেষ হলো। এই দুই বছর সরকারি উদ্যোগে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবছর, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং বাংলাদেশ ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন ইত্যাদি রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবছর উদযাপন উপলক্ষে সরকারের নানা কর্মসূচিতে দেশি, বিদেশি সরকারপ্রধানদের উপস্থিতি ও বক্তব্য বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশকে নিয়ে আমাদের শোনার সুযোগ হয়েছে। এই সময়ে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচিত হয়েছে প্রচুর গ্রন্থ, উদ্ধার করা হয়েছে সরকারি দলিলপত্র, অডিও, ভিডিও- যা বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবন, সংগ্রাম, বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস এবং স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের পুনর্গঠনে তাঁর চিন্তার সঙ্গে পাঠকদের কিংবা তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবে। জন্মশতবছর উপলক্ষে প্রকাশিত দলিল, গ্রন্থাদি, অডিও, ভিডিও এবং দেশি-বিদেশি বরেণ্যদের লেখালেখি ও বক্তব্য গুরত্বপূর্ণ দলিল হয়ে থাকবে। তবে নিজের জন্মদিন সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু কী ভাবতেন, কী করতেন- সেটি জানা আমাদের জন্য কম গুরুত্ব বহন করবে না।
কীভাবে তাঁর জন্মদিন কাটত সেটি ১৯৬৭ সালের ঢাকার কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায় তিনি লিখেছেন। ‘কারাগারের রোজনামচা’য় ২০৯-২১১ পৃষ্ঠায় বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘এই দিনে ১৯২০ সালে পূর্ব বাংলার এক ছোট্ট পল্লীতে জন্মগ্রহণ করি। আমার জন্মবার্ষিকী আমি কখনো নিজে পালন করি নাই- বেশি হলে আমার স্ত্রী এই দিনটাতে আমাকে ছোট্ট একটি উপহার দিয়ে থাকতো। এই দিনটাতে আমি চেষ্টা করতাম বাড়িতে থাকতে। খবরের কাগজে দেখলাম ঢাকা সিটি আওয়ামী লীগ আমার জন্মবার্ষিকী পালন করছে। বোধ হয়, আমি জেলে বন্দী আছি বলেই। আমি একজন মানুষ, আর আমার আবার জন্মদিন! দেখে হাসলাম। ভোরে ঘুম থেকে উঠে দেখি নূরে আলম- আমার কাছে ২০ সেলে থাকে, কয়েকটা ফুল নিয়ে আমার ঘরে উপস্থিত। আমাকে বলল, এই আমার উপহার, আপনার জন্মদিনে। আমি ধন্যবাদের সাথে গ্রহণ করলাম। তারপর বাবু চিত্তরঞ্জন সুতার একটা রক্তগোলাপ এবং বাবু সুধাংশু বিমল দত্তও একটি শাদা গোলাপ এবং ডিপিআর বন্দি এমদাদুল্লা সাহেব একটা লাল ডালিয়া আমাকে উপহার দিলেন।’
বিকাল ৫টার সময় ঠিকই বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাশিত মানুষজন কেক ও ফুল হাতে জেলগেটে হাজির হলেন। এরা হলেন বঙ্গবন্ধুর স্ত্রী বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব ও সন্তানরা, বিশেষত কনিষ্ঠ সন্তান রাসেল। বঙ্গবন্ধু লিখলেন, ‘দেখি সিটি আওয়ামী লীগ একটা বিরাট কেক পাঠাইয়া দিয়াছে। রাসেলকে দিয়েই কাটালাম, আমিও হাত দিলাম। জেলগেটের সকলকে কিছু কিছু দেওয়া হলো।’ এরপরের জন্মদিনে বঙ্গবন্ধু ছিলেন ঢাকার সেনানিবাসে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান আসামিরূপে। সেখানে জন্মদিন পালনের কল্পনা করাও দুরাশার বিষয় ছিল। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের ফলে তিনি মুক্ত হলেন ২২ ফেব্রুয়ারি তারিখে। বাঙালির বিজয়ী নেতা হিসেবে সে বছরের জন্মদিনে তিনি ছিলেন রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে ব্যস্ত। তারপরও পরিবারের সদস্য এবং নেতাকর্মীরা তাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে ভুল করেননি। ’৭০ সালে তাঁর জন্মের ৫০ বছর পূর্তি হলেও সেটিতেও তিনি ছিলেন রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত। পারিবারিক এবং দলীয়ভাবে তাকে কেক কেটে শুভেচ্ছা জানানোর বাইরে সময় দেওয়ার সুযোগ তাঁর কমই ছিল। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপহারটি তিনি পেয়েছিলেন ১৯৭১ সালের ১৭ মার্চ তারিখে। সেই উপহারটির কথা তিনি স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেননি। ঐতিহাসিক ৭ মার্চ তারিখে বঙ্গবন্ধুর রেসকোর্স ময়দানে যে কালজয়ী ভাষণটি প্রদান করেছিলেন- সেটি কীভাবে অডিও ও ভিডিওকরণ করা হয়েছিল তা অনেকেরই তখনও জানা ছিল না। জনকণ্ঠ ও দৈনিক কালের কণ্ঠ পত্রিকায় ২০১১ ও ২০১২ সালে আমার লেখা ‘যেভাবে ৭ মার্চের ভাষণের অডিও-ভিডিওকরণ করা হয়েছিলো’ তাতে এর পূর্ণাঙ্গ বিবরণ রয়েছে। ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে আবুল খায়ের এমএনএ ভাষণের অডিও ও ভিডিও রেকর্ডিংয়ের অনুলিপি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে হাজির হন। তিনি এর একটি কপি উপহার দিলে বঙ্গবন্ধু অভিভূত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুই এত বড় কাজ কীভাবে করলি?’ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তখন তরুণ আরেক এমএনএ তোফায়েল আহমেদ ছিলেন। তিনি খায়ের সাহেবকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘খায়ের ভাই, এই রেকর্ড বিক্রি করলে অনেক টাকা পাবেন, এর রয়্যালটি তো আওয়ামী লীগও পেতে পারে।’ বঙ্গবন্ধু স্বভাবসুলভ ভাষায় মজা করে বললেন, ‘গলা আমার, ভাষণ-আমার, রয়্যালটি পেলে তো আমাকেই দিতে হবে।’
১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও জাতির পিতা। সেদিন সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হলো। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর সেদিন ছুটি ভোগ করার বা জন্মদিন পালন করার সামান্যতম সুযোগ ছিল না। ১৯৭২ সালের ১৭ মার্চ ছিল বঙ্গবন্ধুর ৫৩তম জন্মদিন। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম জন্মদিন হিসেবে এটি পালিত হওয়ার কথা বেশ আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজনের মধ্য দিয়ে। কিন্তু সেটি হয়নি। সেদিন জন্মদিনের আনুষ্ঠানিকতা পালিত হয়েছে অনাড়ম্বর আয়োজনের মধ্য দিয়ে। এর কারণ দুটি- বঙ্গবন্ধু হয়তো সেটি প্রত্যাশা করেননি বা হতে দেননি। আরও একটি কারণ ছিল, স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে সেদিনই উপস্থিত হয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদানকারী দেশ ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী। ফলে দিনটি ব্যাপক ব্যস্ততার মধ্যেই কাটাতে হয়েছিল বঙ্গবন্ধুসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে। তবে সেদিন শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী ৫৫ কোটি ভারতবাসীর পক্ষ থেকে ফলমূল ও মিষ্টান্ন উপহার দিয়ে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনের আয়োজনকে দিয়েছিলেন ভিন্নমাত্রা। বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া ভারতীয় সেনাবাহিনী সেদিনই দেশে প্রত্যাবর্তন করার আয়োজনটিতেও বঙ্গবন্ধু এবং ইন্দিরা গান্ধী উপস্থিত ছিলেন। বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৫৩তম জন্মদিন উপলক্ষে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বঙ্গবন্ধুর ৫৩তম জন্মদিন পালন উপলক্ষে আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক, অর্থমন্ত্রী এবং মুক্তিযুদ্ধকালের সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ প্রদত্ত এক বিবৃতিতে লেখেন, ‘আজ ১৭ই মার্চ। মহান বাঙ্গালী জাতির পিতা শেখ মুজিবের জন্মদিন। বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষের কণ্ঠে আজ একটি মাত্র সেøাগান-জয়তু মুজিব! আর এই সেøাগানের মুহুর্মুহু ধ্বনির প্রতিধ্বনি মহান নেতার জন্মতিথিতে তাঁহাকে জানাইতেছে স্বাধীন দেশের প্রতিটি নাগরিকের হৃদয় উজাড় করা শ্রদ্ধার্ঘ্য, প্রীতি, শুভেচ্ছা, আশিস, আর ভালোবাসা। কামনা তাহাদের একটিই- মুজিব, তুমি দীর্ঘজীবী হও!’
১৯৭৫ সালের ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ৫৫তম জন্মবার্ষিকী। সেটিই তাঁর দেখে যাওয়া শেষ জন্মদিন। এই দিন সম্পর্কে ১৮ মার্চ তারিখে ইত্তেফাকে প্রকাশিত খবর ছিল নিম্নরূপ- “জন্মদিনে নেতাকে শুভেচ্ছা জানানোর জন্য তাঁহার বাসভবন অভিমুখে ছিল জনতার স্রোত। বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে কমপক্ষে ৫০ হাজার লোকের সমাগম হয়। নেতা ও জনতার সম্মিলনে কোনো বাধা ছিল না। ভোর সাড়ে ছয়টা হইতে ৩২নং রোডস্থ বাসভবনে নেতার সাক্ষাৎপ্রার্থীদের ভিড় শুরু হয়। কেহ ফুলের মালা, পুষ্পস্তবক, কেহবা জন্মদিনের কেক, মিষ্টিসহ বিভিন্ন উপহার সামগ্রী লইয়া জাতির জনকের বাসভবনে উপস্থিত হন, শুভেচ্ছা জানান, মঙ্গল কামনা করেন। বঙ্গবন্ধু প্রফুল্লচিত্তে আগতদের সকলকেই সাক্ষাৎদান করেন ও শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। সকাল ৭টা হইতে সোয়া ১১টা পর্যন্ত ৪ ঘণ্টাধিককাল ধরিয়া তিনি শুভার্থীদের সাক্ষাৎদান করেন। বাকশাল, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়নসহ বিভিন্ন সংস্থা আসিয়াছিল মিছিলসহকারে, দলবদ্ধভাবে।... বঙ্গবন্ধু পুষ্পমাল্যগুলি পাঠাইয়া দেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরে বাংলা, মরহুম তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক ও ভাষা আন্দোলনের শহীদানের মাজারে, শহীদ মিনারে এবং সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে। বঙ্গবন্ধু আগত সকলকেই দেশ গঠনে কঠোর পরিশ্রম করার উপদেশ দেন। সকাল ১১টার দিকে বঙ্গবন্ধু সমবেত সকলের উদ্দেশে বলেন, ‘আমার জন্মদিনে আমি ছুটি ঘোষণা করি নাই। তাই আজ আমি অফিসে যাইব, অল্পক্ষণের জন্য হইলেও অফিসের কাজ করিব।’ উপস্থিত সকলকে তিনি নিজ নিজ অফিসে যাওয়ার নির্দেশ দেন। সকাল প্রায় সোয়া ১১টার সময় বঙ্গবন্ধু গণভবনের উদ্দেশ্যে বাসভবন ত্যাগ করেন।”
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৫ আগস্ট সপরিবারে নিহত হলেন। তাঁর জন্মদিন এবং ১৫ আগস্ট ১৯৭৫-৯৫ সাল পর্যন্ত ২০ বছর পালন করার কোনো অনুকূল সুযোগ ছিল না। জিয়াউর রহমান, এরশাদ এবং বিএনপির খালেদা জিয়ার শাসনকালে এই দিবসগুলো পালনে ছিল নানা ধরনের সরকারি বাধা। অথচ বঙ্গবন্ধু ছিলেন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা। কিন্তু তাঁর জন্মদিন পালনই শুধু নয়, তাঁর নাম উচ্চারণেও বাধানিষেধ জারি করে রাখা হয়েছিল। আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গসংগঠনগুলো বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন এবং ১৫ আগস্ট পালন উপলক্ষে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ, কাঙালিভোজের আয়োজনে হামলা, ভাঙচুর এবং লেলিয়ে দেওয়া হতো গুন্ডাবাহিনীকে।
পাঠ্যপুস্তক থেকে বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে ফেলা হয়েছিল। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ২৩ জুন তারিখে সরকার গঠিত হওয়ার পর বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ বেতার ও টেলিভিশনে সম্প্রচারিত হয়। বাংলাদেশের তরুণ সমাজ এই প্রথম বঙ্গবন্ধুর ভাষণের দৃশ্য ভিডিওতে অবলোকন করার সুযোগ পেল। এতদিন তাদেরকে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে অনেক মিথ্যে, বানোয়াট গল্প রাজনীতির মঞ্চ ও অপপ্রচারের মাঠে শোনানো হয়েছে। অনেকে তা বিশ্বাসও করেছে। একটি প্রজন্ম সেই মিথ্যাচারে বিশ্বাস করে বেড়ে উঠেছে, কিন্তু বঙ্গবন্ধু যে কত বড় নেতা ছিলেন, তিনি না থাকলে বাংলাদেশ যে স্বাধীন হতো না, আমরাও নিজেদের স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে পরিচয় দিতে পারতাম না, আজকের বড় বড় অবস্থানে যাওয়ার সুযোগও পেতাম না- এই সত্যটি ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু ’৯৬-পরবর্তী সময় থেকে ধীরে ধীরে বঙ্গবন্ধু স্বমহিমায় আমাদের জীবনে আবার ফিরে এলেন।
বঙ্গবন্ধুর লেখা তিনটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে, অসংখ্য অডিও, ভিডিও ও দলিলপত্রও প্রকাশিত হয়েছে, আরও হওয়ার অপেক্ষায় আছে। শত বছরে মুজিব আমাদের জাতীয় জীবনে নতুনভাবে পুনর্জাগরণের স্পন্দন যেন এনে দিলেন। ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ তাকে ঘিরেই স্বপ্ন দেখবে সোনার বাংলা হয়ে ওঠার।
লেখক: ইতিহাসবিদ