গত ৬ মাসে (১ জানুয়ারি-৩০ জুন) সারা দেশে ২৪১টি কর্মক্ষেত্রের দুর্ঘটনায় ৩
৩৩ জন (সীতাকুণ্ড দুর্ঘটনায় নিহত ৪৯ জনসহ) শ্রমিক নিহত হয়েছেন। ২০২১ সালে একই সময়ে সারা দেশে ২২০টি কর্মক্ষেত্র দুর্ঘটনায় ৩০৬ জন শ্রমিক নিহত হয়েছিলেন।
বেসরকারি সংস্থা সেইফটি অ্যান্ড রাইটস সোসাইটি (এসআরএস) কর্তৃক পরিচালিত এক জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে। বৃহস্পতিবার এ তথ্য প্রকাশ করা হয়।
মোট ২৬টি দৈনিক (১৫টি জাতীয় এবং ১১টি স্থানীয়) পর্যবেক্ষণ করে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। যেসব শ্রমিক কর্মক্ষেত্রের বাইরে অথবা কর্মক্ষেত্র থেকে আসা-যাওয়ার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় অথবা অন্য কোনো কারণে মারা গেছেন তাদের এই জরিপের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
জরিপে প্রাপ্ত কর্মক্ষেত্র দুর্ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি শ্রমিক নিহত হয়েছেন পরিবহন খাতে, যাদের সংখ্যা মোট ১৩৮ জন। এর পরেই রয়েছেন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে (যেমন- ওয়ার্কশপ, গ্যাস, বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি) ১০০ জন, নির্মাণ খাতে নিহত হয়েছেন ৪৮ জন, কলকারখানা ও অন্যান্য উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠানে এই সংখ্যা ২৬ জন ও কৃষি খাতে ২১ জন।
মৃত্যুর কারণ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সড়ক দুর্ঘটনায় ১৫৩ জন, আগুনে পুড়ে ৫৭ জন, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ২৫ জন, ছাদ, শক্ত বা ভারী কোনো বস্তুর দ্বারা আঘাত বা তার নিচে চাপা পড়ে ২৩ জন, মাঁচা বা ওপর থেকে পড়ে মারা গেছেন ১৯ জন, বজ্রপাতে ১৫ জন, বয়লার বিস্ফোরণে ১৫ জন, রাসায়নিক দ্রব্য বা সেপটিক ট্যাঙ্ক বা পানির ট্যাঙ্কের বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে ৯ জন, পাহাড় বা মাটি, ব্রিজ, ভবন বা ছাদ, দেয়ালধসে মারা গেছেন ৯ জন। এ ছাড়া পানিতে ডুবে ৮ জন শ্রমিক নিহত হন।
জরিপ তথ্য প্রকাশকালে এসআরএসের নির্বাহী পরিচালক সেকেন্দার আলী মিনা বলেন, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় মৃত্যু কাম্য নয়। সড়ক দুর্ঘটনায় শুধু চালক ও হেলপারের মৃত্যুর ঘটনাগুলো আমরা পর্যবেক্ষণ করেছি।
তিনি বলেন, পরিবহন খাতকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরও নজরদারি বাড়াতে হবে। তা না হলে দুর্ঘটনা বাড়তেই থাকবে। কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের নিরাপত্তা নিয়ে মালিকদের অবহেলা এবং সরকারি সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোর যথাযথ পরিদর্শনের ঘাটতি কর্মদুর্ঘটনা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। সীতাকুÐ দুর্ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবহেলা আমরা দেখতে পেয়েছি। এসব দুর্ঘটনার কারণ চিহ্নিত করে তা কীভাবে কমিয়ে আনা যায় সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ শিগগিরই ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে আশা রাখি। টেকসই উন্নয়নের জন্য শোভন কর্মপরিবেশ সৃষ্টি করা সরকারের অন্যতম দায়িত্ব এবং এ জন্য শ্রমিকের জীবনের নিরাপত্তা আগে নিশ্চিত করতে হবে।
জরিপের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, অনিয়ন্ত্রিত পরিবহন ব্যবস্থা, আইন প্রয়োগে বাধা, বেপোরোয়া যান চলাচল, অদক্ষ চালক ইত্যাদি হলো পরিবহন দুর্ঘটনার মূল কারণ। সম্প্রতি অগ্নি দুর্ঘটনায় নিহতের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে এসআরএস জানিয়েছে, কারখানায় অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা না থাকা, কেমিক্যাল সংরক্ষণে অদক্ষতা ও অবহেলা, কারখানা ভবনে জরুরি বহির্গমন পথ না থাকা, কারখানা নির্মাণে সংশ্লিষ্ট দফতর থেকে অনুমতি না নেওয়া, সেইফটি বিষয়ে শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ না দেওয়া। এ ছাড়া কোনোরকম নিরাপত্তা ব্যবস্থা না নিয়েই বৈদ্যুতিক লাইন সংযোগ দেওয়া এবং পাশাপাশি ভেজা হাতে মোটর চালু করা, মাথার ওপরে যাওয়া বিদ্যুতের লাইনের নিচে কাজ করা, ভবনের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া বৈদ্যুতিক তারের পাশ দিয়ে লোহার রড ওঠানোকে বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি। তা ছাড়া ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার না করার কারণেও কিছু দুর্ঘটনা ঘটছে।
পর্যবেক্ষণে বলা হয়, কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের জন্য ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম প্রদান, সেইফটি বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ও কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রধান দায়িত্ব মালিক পক্ষের। মালিক কর্তৃক শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা হয়েছে কি না তা পরিদর্শন করার দায়িত্ব সরকারি প্রতিষ্ঠানের। সরকার ও মালিক উভয়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা বন্ধ করা সম্ভব হবে।
/এসকে