কখনও সহপাঠী, কখনও সহকর্মী দ্বারা যৌন নিপীড়ন ও হেনস্থার ঘটনা ঘটেই চলছে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। মেয়ে শিক্ষার্থী কিংবা নারী শিক্ষক প্রতিষ্ঠানে নানাভাবে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। অনেকে ভয়ে প্রকাশ করছেন না। আবার অনেক ঘটনায় প্রতিবাদ হচ্ছে সমস্বরে। দোষীদের শাস্তি ও বিচারের আশ্বাস পেয়ে তা থেমে যাচ্ছে। তবে থামছে না শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন নির্যাতনের ঘটনা। গত রোববার এক ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক ছাত্রী শাটল ও বাসে ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছেন। কিন্তু এবার একেবারে ক্যাম্পাসের ভেতরেই এক ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের শিকার হলো। এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তির পেছনে শিক্ষাবিদ ও আইনজীবীরা দুষছেন বিচারহীনতা, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দুর্বল পদক্ষেপ ও ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার প্রবণতাকে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই ছাত্রী মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। পরে হাটহাজারী থানায় মামলা করা হয়। ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বুধবার বৈঠক করে ছাত্রীদের রাত ১০টার মধ্যে হলে প্রবেশের নির্দেশনা দিলে ক্ষোভ আরও বাড়ে। এ ঘটনায় বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ‘ভিসি যেখানে নারী, সেখানে অনিরাপদ কেন আমি?’, ‘সুবোধ তুই পালিয়ে যা, তোর ভাগ্যে নিরাপত্তা নাই’, ‘নিরাপদ ক্যাম্পাস চাই’, ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’, ‘নাম অবশ্যই প্রশাসনের জানা, তবে মামলা কেন অজ্ঞাতনামা’ এসব স্লোগান দিচ্ছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান যৌন নিপীড়ন বিরোধী সেল অকার্যকর। সেলের কাছে এখন পর্যন্ত জমা হওয়া অনেক অভিযোগের সুষ্ঠু বিচার করা হয়নি।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার সময়ের আলোকে বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দলীয় রাজনীতি বন্ধ, ছাত্র সংসদ কার্যকরের বিকল্প নেই। সব দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা আছে। নেই শুধু আমাদের। যৌন নির্যাতন সেল আছে ঠিকই কিন্তু তা নষ্ট হয়ে গেছে। দোষীরা ক্ষমতার দম্ভে পার পেয়ে যাচ্ছে। যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সুবর্ণা মজুমদার বলেন, অনেকদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের সঙ্গে যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনো দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে পারেনি। এর কারণ হচ্ছে এসব ঘটনায় একটি সুনির্দিষ্ট ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা জড়িত।
এমন ঘটনাই শেষ নয়। এর আগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রীকে দোকানের শাটার লাগিয়ে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় সাভারের নিউ মার্কেটের মেস্ট্রো নামে এক দোকানের দুই কর্মচারীকে গ্রেফতার করা হয়। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ছোটন দেবনাথের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ এনেছিলেন এক সহকর্মী। ২০২১ সালের ২৬ আগস্ট ওই নারী শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন প্রতিরোধ কেন্দ্রে অভিযোগ দেন। এতে বলা হয়, ওই নারী শিক্ষক ছোটন দেবনাথের বাসায় গিয়ে যৌন নির্যাতনের শিকার হন। এ ঘটনায় ছোটন দেবনাথকে বরখাস্ত করা হলেও কয়েকদিন আগে আদেশ প্রত্যাহার করা হয়। এই বছর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন বিভাগের এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তুলেছেন এক ছাত্রী।
এ ঘটনায় সুষ্ঠু বিচারের দাবিতে ওই ছাত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে একাই প্ল্যাকার্ড নিয়ে প্রতিকার দাবি করেন। ২০১৬ সালের ৪ অক্টোবর গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় ষষ্ঠ শ্রেণির এক ছাত্রীকে ধর্ষণ করেন সুন্দরগঞ্জ মহিলা ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক অশোক কুমার সরকার। ওই দিনই ছাত্রীর মা থানায় মামলা করেন। ওই শিক্ষকের বিচার হয়নি। ২০১৮ সালের আগস্টে ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার সফরাবাদ গ্রামে মাদ্রাসার তিন শিক্ষার্থীকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে ওই মাদ্রাসার মোহতামিম মাওলানা আবদুল ফাত্তাহ বিন আমিনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল। চাঞ্চল্যকর ওই মামলার বিচার শুরু হয় বহু দেরিতে। এভাবে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির মামলার বিচার হয় না বললেই চলে। প্রকৃত হিসাব কেউ না রাখলেও গত দশ বছরে শিক্ষাঙ্গনে প্রায় তিন হাজার যৌন হয়রানির ঘটনা প্রকাশিত হয়েছে সংবাদমাধ্যমে। যদিও ছাত্রীদের ওপর যৌন নির্যাতন বা ধর্ষণের অনেক ঘটনাই প্রকাশ পায় না সামাজিক কারণে। প্রকাশিত সব ঘটনায়ও আবার মামলা হয় না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানির বেশিরভাগ অভিযোগ শুধু তদন্তেই সীমাবদ্ধ থাকে।
কর্মস্থল ও শিক্ষাঙ্গনে যৌন হয়রানির প্রতিকার পাওয়ার জন্য ২০০৯ সালে বাংলাদেশের হাইকোর্ট একটি নির্দেশনা দিয়েছিল। সেখানে বলা আছে, কোনো প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠলে সেটি তদন্ত এবং প্রতিকার পাওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে। আন্তর্জাতিক সংস্থা অ্যাকশন এইড পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, শিক্ষার্থীদের মধ্যেও প্রায় ৮০ শতাংশ হাইকোর্টের এই নির্দেশনা সম্পর্কে অবগত নয়। সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী সারা হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, হাইকোর্টের রায় অনুযায়ী প্রত্যেকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একটি কমিটি থাকার কথা, সেখানে নারী সদস্য সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকবে। সে কমিটির যেকোনো সদস্যের কাছে অভিযোগ করা যাবে। হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুসারে যিনি অভিযোগ করছেন এবং যার বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে- উভয়ের নাম গোপন রাখতে হবে। কমিটি উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনবে। কেউ যদি মনে করে যে তিনি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ন্যায়বিচার পাননি তা হলে সে সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যেকোনো পক্ষ আদালতের দ্বারস্থ হতে পারে। কিন্তু তা অনেক জায়গায় হচ্ছে না। সহজে পার পেয়ে যাওয়া ও জবাবদিহিতা না থাকায় এসব ঘটনার রাস টানা যাচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে ইউজিসি বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশের যেসব প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি সংক্রান্ত তদন্ত সেল রয়েছে সেগুলোর মধ্যে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়য় অন্যতম। এই যৌন নিপীড়ন সেলের একজন সদস্য অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন বলেন, যৌন নিপীড়ন সেলের সামনে নানা ধরনের অভিযোগ আসে। তিনি বলেন, অনেকে তার কাছে মৌখিকভাবে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ করেন। কিন্তু তাদের অনেকে অভিযোগ লিখিত আকারে উত্থাপন করতে চায় না বলে উল্লেখ করেন তিনি। এই অধ্যাপক বলেন, অনেকে মনে করে যে অভিযোগ উত্থাপন করলে শিক্ষাজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হবে কিংবা পরবর্তীতে চাকরি পেতে সমস্যা হবে।
এদিকে গত রোববার সরকারি-বেসরকারি তিন বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন হয়রানির ঘটনার বিচার চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনে (ইউজিসি) স্মারকলিপি দিয়েছে মহিলা পরিষদ। স্মারকলিপিতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের একজন শিক্ষক, আশা ইউনিভার্সিটির রেজিস্ট্রার এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের একজন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে তোলা অভিযোগের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। সংগঠনের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম সময়ের আলোকে বলেন, ‘উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হাইকোর্টের বেঁধে দেওয়া যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন নিরোধ নীতিমালা, ২০০৮’ মানা হয় না। দ্রুত বিচার হয় না। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয় না। এভাবেই প্রকৃত আসামিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। কাজেই এমন ‘না’-এর সংস্কৃতিতে হয়রানি কমবে কীভাবে?
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. স্বদেশ চন্দ্র সামন্ত বলেন, দেশের ৫২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৪২টি এবং ১০৮টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৭০টিতে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি রয়েছে। ইউজিসি মঞ্জুরী কমিশনের উপপরিচালক মৌলী আজাদের মতে, অনেক সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটির নাম যখন ইউজিসিতে প্রেরণ করা হয়, তখন দেখা যায় এমন অনেকে কমিটিতে থাকেন যাদের কমিটিতে আসলে প্রয়োজন নেই। ৫ সদস্যবিশিষ্ট কমিটিতে নারী সদস্যের আধিক্যের পাশাপাশি বাইরে থেকে যে দুজন সদস্য রাখার কথা বলা হয়েছে, সেখানে জেন্ডার বিষয়ক দক্ষ ব্যক্তিকে রাখতে হবে।
/আরএ