সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে সঙ্কটে থাকা পরিবারের শিশু-কিশোরীদের পাচারের জন্য টার্গেট করছে পাচারকারীরা। এর মধ্যে ১৬ থেকে ২০ বছরের কিশোরীরা সবচেয়ে বেশি পাচারের শিকার হচ্ছে। এরপরই আছে ১১ থেকে ১৫ বছরের কিশোরীরা। ফেসবুক ও টিকটকসহ সামাজিক যোগাযোগের নানা মাধ্যম ব্যবহার করে পাচারকারীরা ভয়ানক হয়ে উঠছে।
অনেক ক্ষেত্রে চাকরি কিংবা নায়িকা বা মডেল বানানোর লোভ দেখিয়ে তাদের নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তাদের মানবপাচার চক্রের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। আর বিশ্বে পাচারের শিকার মানুষের মধ্যে ৭০ শতাংশই নারী ও কিশোরী। মানবপাচারের শিকার ব্যক্তিদের এক-তৃতীয়াংশই আবার শিশু। নিম্ন আয়ের দেশগুলো ধরলে সেখানে পাচারের শিকারের অর্ধেকই শিশু, যাদের বেশিরভাগকে জোরপূর্বক শ্রমের জন্য কিংবা যৌন শোষণের জন্য পাচার করা হয়।
বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথের সহায়তায় পরিচালিত গবেষণা প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। পাচারের শিকার ৬৭৫ জন নারীর তথ্য বিশ্লেষণ করে ব্র্যাক এ তথ্য পেয়েছে।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম জানিয়েছে, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের নারী ও শিশু পাচার দমনে কাজ করতে গিয়ে গবেষণাটি করেছেন তারা। গবেষণায় বলা হয়, নারী পাচারের বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে গতবছর ভারতে বাংলাদেশি এক তরুণীকে পৈশাচিক নির্যাতনের একটি ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর। এ ঘটনায় ভারতের পুলিশ ছয়জনকে গ্রেফতার করে। তাদের মধ্যে রয়েছে ঢাকার মগবাজারের রিফাদুল ইসলাম ওরফে টিকটক হৃদয়। অন্যদিকে ঘটনার পর পুলিশ ও র্যাব নারী পাচারে জড়িত থাকার অভিযোগে দুটি চক্রের ১২ জনকে গ্রেফতার করে। শুধু এই দুই চক্রই পাঁচ বছরে প্রায় ২ হাজার নারীকে ভারতে পাচার করেছে বলে পুলিশ ও র্যাবের দাবি। ভারতে পাচার হওয়া প্রায় ২ হাজার নারীকে গত ১০ বছরে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
পাচারের শিকারদের একজন যশোর জেলার অভয়নগর উপজেলার নওয়াপাড়া পৌরসভার ধোপাদী গ্রামের মেয়ে রূপা (ছদ্মনাম) জানান, ২০১৩ সালে এক নিকটাত্মীয়ের প্ররোচনায় ভালো জীবনযাপনের আশায় অবৈধভাবে তিনি ভারত যান। সেখানে মানবপাচারকারী চক্র তাকে মুম্বাইয়ের একটি যৌনপল্লীতে বিক্রি করে দেওয়া হয়। দীর্ঘ চার বছর প্রতিনিয়ত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে ২০১৭ সালে তিনি অনেক কষ্টে মানসিক অসুস্থতা নিয়ে দেশে ফেরত আসেন।
পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালে মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন হওয়ার পর শুধু ওই আইনেই সাড়ে ৬ হাজারেরও বেশি মামলা হয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ মামলারই কোনো নিষ্পত্তি হয়নি। এ আইনে ২০১২ থেকে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত ৬ হাজার ৫২০টি মামলা হয়েছে।
এসব মামলায় দেখা গেছে, ১৩ হাজারেরও বেশি মানুষ পাচারের শিকার হয়েছে। এতে মোট আসামির সংখ্যা ৩১ হাজারেরও বেশি। কিন্তু ৬ হাজার ৫২০টি মামলার মধ্যে গত ১০ বছরে মাত্র ৭২৮টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এর মধ্যে ৫০টি মামলায় ৯৬ জনের সাজা হয়েছে। প্রায় সাড়ে ৫ হাজার মামলা এখনও চলমান। অর্থাৎ মামলা নিষ্পত্তির হার ১১ শতাংশ। আর সাজা হয়েছে দুই শতাংশেরও কম।
মানবপাচার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের ২০২২ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানবপাচার রোধে ন্যূনতম যা করা প্রয়োজন, তা পুরোপুরি করতে পারেনি বাংলাদেশ। তবে এ লক্ষ্যে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে মানবপাচারকারীদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও শাস্তি প্রদানে সরকারের প্রচেষ্টা বেড়েছে। এ ঘটনায় একজনের সংসদ সদস্য পদ বাতিল বহাল রয়েছে। মানবপাচারের বিচারে ২০২১ সালের আগস্টে সাতটি ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম পুনরায় শুরু হয়েছে। এ ছাড়া জোরপূর্বক শ্রমে বাধ্য করার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার লক্ষ্যে সরকার আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) শ্রম কনভেনশনের প্রটোকল অনুসমর্থন করেছে। সংস্থাটি বলছে, বর্তমানে ২ কোটিরও বেশি মানুষকে জোরপূর্বক শ্রমের মাধ্যমে শোষণ করা হচ্ছে, যার মধ্যে অন্তত ৫০ লাখ মানুষ যৌন শোষণের শিকার। এসবের মাধ্যমে কয়েকশ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা চলছে।
কেবল বাংলাদেশ নয়, বিশ্বজুড়েই মানবপাচারের ঝুঁকিতে থাকা মানুষগুলোকে চিহ্নিত, নিয়ন্ত্রণ ও তাদের দুর্বলতার সুযোগ নিতে অপরাধীচক্র এখন প্রযুক্তির ব্যবহার করছে। যৌন নিপীড়ন, জোরপূর্বক বিয়ে ও অন্যান্য নিপীড়নের জন্য অনলাইন প্লাটফর্মের মাধ্যমে শিশুদের লক্ষ্যবস্তু বানানোর হারও দিনে দিনে বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ ‘ট্রাফিকিং ইন পারসনস রিপোর্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদন বলছে, আজকে বিশ্বের অন্তত আড়াই কোটি মানুষকে এই ভয়ানক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, যারা কোনো না কোনোভাবে মানবপাচারের শিকার। আর এই মানবপাচারকে ঘিরে পৃথিবীতে লাখো কোটি টাকার বাণিজ্য চলছে। আর শুধু ২০২২ সালের ছয় মাসে ১২ হাজার ৬৩৬ জন বাংলাদেশি ইউরোপে প্রবেশ করেছে। ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টায় বাংলাদেশ তালিকায় তৃতীয়। আর গত এক যুগে অনিয়মিতভাবে ইউরোপে প্রবেশ করেছে ৬৫ হাজার বাঙালি। এই পাচারের ক্ষেত্রেও সামাজিক যোগাযোগের নানা মাধ্যম ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশেষত ফেসবুকে লিবিয়া-ইতালি নামে একাধিক গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। কমবেশি কিছু উদ্যোগ নিলেও মানবপাচার রোধে ন্যূনতম যা করা প্রয়োজন, বিশ্বের বেশিরভাগ দেশই সেটি করতে পারেনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ তৌহিদুল হক সময়ের আলোকে বলেন, মানুষ এখন চটকদার বিজ্ঞাপনের মোহে পড়ছে। সামাজিক মাধ্যমে এর প্রবণতা বাড়ছে। শর্টকাট ওয়েতে সবাই প্রতিষ্ঠিত হতে চায়। আর এটা করতে গিয়েই পাচারকারীর প্রতারণার ফাঁদে পড়ছে। আবার অনেক সময় অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পারিপার্শি^কতার কারণে বাধ্য হয়ে লোভে পা দিচ্ছে।
তিনি বলেন, রাষ্ট্র যতদিন নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারবে না, ততদিন পাচার রোধ হবে না। সীমান্তে জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে। পাচারের আড়ালের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় থাকা রাঘববোয়ালদের আইনের আওতায় আনার কোনো বিকল্প নেই। শুধু দিবসে সীমাবদ্ধ থাকলেই হবে না; বিচারের দীর্ঘসূত্রতা বন্ধ করতে না পারলে আরও ভুগতে হবে।
আর ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ ইনিশিয়েটিভের প্রধান শরিফুল হাসানের মতে, বিশ্বের রাষ্ট্র বা সরকারগুলোর চেয়ে পাচারকারীরা এগিয়ে। মানবপাচার একটা সংঘবদ্ধ অপরাধ এবং পাচারকারীরা দেশে-বিদেশে সংঘবদ্ধ। কিন্তু সেই তুলনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সরকারি বা বেসরকারি সংস্থা সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা পিছিয়ে। ফলে পাচার বন্ধ হচ্ছে না।
তিনি বলেন, সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার সমন্বয় দরকার। অনলাইনে হোক কিংবা অফলাইনে, এশিয়ার কোনো দেশ কিংবা ইউরোপের মানবপাচারের মতো ঘৃণ্য অপরাধ প্রতিরোধে সমন্বিতভাবে কাজ করার কোনো বিকল্প নেই।
২০১৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে ৩০ জুলাই দিনটিকে মানবপাচার দিবস হিসেবে নির্বাচন করা হয়। সেই ধারাবাহিকতায় ৩০ জুলাই ‘প্রযুক্তির ব্যবহার ও অপব্যবহার’ প্রতিপাদ্য নিয়ে বিশ্বব্যাপী মানবপাচারবিরোধী দিবস পালিত হয়। ঢাকার একটি হোটেলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে কাউন্টার; ট্রাফিকিং ইন পারসনস টেকনিক্যাল ওয়ার্কিং গ্রুপ (সিটিআইপি-টিডব্লিউজি) অব বাংলাদেশ ইউএন নেটওয়ার্ক অন মাইগ্রেশনের (বিডিইউএনএনএম) সার্বিক সহযোগিতায় ‘প্রযুক্তির ব্যবহার এবং এর অপব্যবহারের প্রেক্ষাপটে মানবপাচার প্রতিরোধ’ বিষয়ক জাতীয় পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
/জেডও